স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের এক ম্যাচে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তেনেরিফে ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগুয়েল। মর্মান্তিক এই মৃত্যুর ঘটনায় স্প্যানিশ পুলিশ সম্ভাব্য অনিচ্ছাকৃত হত্যার (ইনভলান্টারি ম্যানস্লটার) অভিযোগে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।
মাত্র ৩০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন এই ফুটবলার।
গত সোমবার রাতে ম্যাচের যোগ করা সময়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। মাঝমাঠের কাছাকাছি একটি দীর্ঘ পাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন তেনেরিফে ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগুয়েল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিপদমুক্ত করতে নিজেদের ডি-বক্স ছেড়ে অনেক দূর মাঝমাঠে ছুটে আসেন এফসি অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক হেসুস ওওনো।
দুজনের সেই তীব্র ও আকস্মিক সংঘর্ষে সরাসরি দে মিগুয়েলের বুকে আঘাত লাগে। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই সরাসরি লাল কার্ড দেখেন অ্যান্ডোরার গোলরক্ষক ওওনো।
মাঠেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বুকে হাত দিয়ে কিছুটা সময় কুঁকড়ে ছিলেন দে মিগুয়েল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পিঠের ভরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তার হাত দুটি নিস্তেজ হয়ে পাশে ঝুলে পড়ে।
মাঠেই প্রাথমিক চিকিৎসার পর দ্রুত তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পরদিন মঙ্গলবার ক্লাবটির পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। ২-২ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচটি ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের ক্লাব তেনেরিফে এক শোকবার্তায় জানিয়েছে, পুরো ক্লাব পরিবার এই আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ক্লাবের প্রধান শেয়ারহোল্ডার রায়কো গার্সিয়া জানান, পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী দে মিগুয়েলের মরদেহ তোলেদোর নাভাহেরমোসা শহরে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।
সেখানে তার সতীর্থ ও ক্লাব কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে শেষ বিদায় জানাবেন। এছাড়া আগামী শনিবার ঘরের মাঠে ভক্ত-সমর্থকদের নিয়ে এক বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করবে ক্লাবটি।
খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে তেনেরিফে আগামী শনিবার গ্রানাডার বিপক্ষে তাদের লিগ ম্যাচটি স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। ক্লাবটির সভাপতি ফেলিপ মিনামব্রেস বলেন, ‘এই শোক কাটিয়ে উঠতে আমাদের খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারগুলোর পেশাদার মানসিক সহায়তা এবং ভক্তদের ভালোবাসা ও সমর্থন প্রয়োজন হবে।’
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে মঙ্গলবার স্পেনের ন্যাশনাল পুলিশ জানিয়েছে যে, তারা তদন্ত শুরু করেছে। স্প্যানিশ আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনা বা স্বাভাবিক নয় এমন যেকোনো মৃত্যুর ঘটনায় বিচারিক তদন্তের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সান্তা ক্রুজ দে তেনেরিফের প্রধান প্রসিকিউটর জোসে লুইস সানচেজ-জাউরেগি স্প্যানিশ বার্তা সংস্থা ইএফই-কে জানিয়েছেন যে, যেহেতু সংঘর্ষটি খেলার সাধারণ গতিপ্রকৃতির মধ্যেই ঘটেছে, তাই এ ঘটনায় দেওয়ানি বা ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
ঘটনার পর অ্যান্ডোরা গোলরক্ষক ওওনোর প্রায় ৩০ হাজার ফলোয়ারের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। এমনকি একই পদবি হওয়ায় অন্য এক ৬ষ্ঠ ডিভিশনের গোলরক্ষক মিশেল ওওনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, তাকে অ্যান্ডোরার সেই গোলরক্ষক ভেবে একদল উগ্র সমর্থক বর্ণবাদী ও আপত্তিকর আক্রমণের শিকার বানাচ্ছে।
মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া দে মিগুয়েল ২০১৫ সালে লেগানেস বি দলের হয়ে সিনিয়র ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। স্পেনের বিভিন্ন নিম্নবোর্ডের ক্লাবে খেলার পর গত বছর তিনি তেনেরিফে ক্লাবে যোগ দেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে জানা গেছে, দে মিগুয়েলের আগে থেকে বড় কোনো জটিল স্বাস্থ্যগত বা শারীরিক সমস্যা ছিল না। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। মৃত্যুর সময় তিনি রেখে গেছেন তার স্ত্রী ও ছোট্ট কন্যাসন্তানকে।
ফুটবল বিশ্বের এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীর শোক নেমে এসেছে। সাবেক বার্সা তারকা জেরার্ড পিকের মালিকানাধীন ক্লাব অ্যান্ডোরা, স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ) এবং লা লিগা কর্তৃপক্ষও এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। জেরার্ড পিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আমি গভীর হৃদয়বিদারক ব্যথায় আচ্ছন্ন। শান্তিতে ঘুমাও, হেসুস।’
মঙ্গলবার ইউরোপজুড়ে অনুষ্ঠিত উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচগুলোতেও দে মিগুয়েলের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। স্পেনের মাটিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে—বিশেষ করে বার্সেলোনা, অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ এবং ভিয়ারিয়ালের ঘরের মাঠে ম্যাচের আগে চ্যাম্পিয়নস লিগের চিরাচরিত সংগীত বাজানো থেকে বিরত থাকে ক্লাবগুলো। ওল্ড ট্রাফোর্ডসহ ইউরোপের অন্যান্য স্টেডিয়ামেও ম্যাচ শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং বড় স্ক্রিনে প্রয়াত এই ফরোয়ার্ডের ছবি প্রদর্শন করা হয়।
রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়রা অনুশীলনের সময় এক মিনিট নীরবতা পালন করে হেসুসকে স্মরণ করেন। ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এই শোক সহ্য করার ক্ষমতা তার পরিবারকে যেন ঈশ্বর দেন।’
শোকের আবহ হিসেবে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবারের সব কোপা দেল রে ও কোপা দে লা রেইনা ম্যাচ স্থগিত করেছে। উয়েফাও ঘোষণা দিয়েছে যে, চলতি সপ্তাহে তাদের আয়োজিত প্রতিটি ম্যাচে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে।
ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের এমন মারাত্মক সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এর আগে স্পজেনে গত বছর পঞ্চম ডিভিশনের এক ম্যাচে সংঘর্ষে মাথায় আঘাত পেয়ে ১৯ বছর বয়সী এক গোলরক্ষক মারা গিয়েছিলেন। ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ২০০১ সালে ইউক্রেনীয় গোলরক্ষক সেরহি পেরখুন এবং ১৯৮৭ সালে মালাগার গোলরক্ষক হোসে আন্তোনিও গালার্দো ম্যাচের মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























