প্রায় ১৫০ বছর আগে ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন ধারণা করেছিলেন, স্যাক্সিফ্রাগা গোত্রের কিছু উদ্ভিদ হয়তো পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে তখন নিজের ধারণার পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি। দেড় শতাব্দীর বেশি সময় পর বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, ডারউইনের সেই সন্দেহই সত্য ছিল।
স্যাক্সিফ্রাগা রোটানডিফোলিয়া ও স্যাক্সিফ্রাগা আমব্রোসার আঠালো লোম দেখে ১৮৭৫ সালে ডারউইন ধারণা করেছিলেন, এগুলো পতঙ্গ খেকো হতে পারে। উদ্ভিদগুলোর লোমসদৃশ গঠনকে বলা হয় গ্রন্থিযুক্ত ট্রাইকোম। এগুলো আঠালো পদার্থ নিঃসরণ করে।
তবে কোনো উদ্ভিদকে পতঙ্গ খেকো বলতে হলে শুধু পোকামাকড় আটকে রাখলেই হয় না। তাকে পোকামাকড় আকৃষ্ট করা, ফাঁদে ধরা এবং সেগুলো হজম করার সক্ষমতাও থাকতে হয়। ডারউইন তখন এসব শর্ত নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি।
সম্প্রতি ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম নামের ফুলগাছ নিয়ে ডারউইনের ধারণা পরীক্ষা করেন। উচ্চভূমিতে জন্মানো এই উদ্ভিদ চীনের দক্ষিণাঞ্চলের চিংহাই-তিব্বত মালভূমি এবং ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশের হেংডুয়ান পর্বতমালায় দেখা যায়।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উদ্ভিদটি আকর্ষণীয় গন্ধ ব্যবহার করে ছোট মশার মতো পোকামাকড়কে কাছে টানে। এরপর আটকে পড়া শিকারকে ফসফাটেজ নামের একটি এনজাইম ব্যবহার করে হজম করে। আইসোটোপ চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা পোকামাকড়ের শরীর থেকে নাইট্রোজেন-১৫ উদ্ভিদের দেহে স্থানান্তরও শনাক্ত করেন। এতে পোকা আটকে পড়া থেকে হজম হওয়া পর্যন্ত পুষ্টি সরাসরি উদ্ভিদের দেহে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
জিনগত বিশ্লেষণেও দেখা যায়, স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রামের সঙ্গে অন্যান্য আঠালো পতঙ্গ খেকো উদ্ভিদের সম্পর্ক রয়েছে। শিকার আকর্ষণ, হজম ও পুষ্টি শোষণের মতো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যুক্ত কিছু জিনও তাদের মধ্যে অভিন্ন।
গবেষকেরা মাঠপর্যায়ে ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উদ্ভিদ এবং আটকে পড়া পোকামাকড় পর্যবেক্ষণ করেন। অধিকাংশ পূর্ণবয়স্ক উদ্ভিদে কয়েক ডজন পোকামাকড় আটকে যায়। কোনো কোনো গাছে ৭০টি পর্যন্ত ছোট মশার মতো পোকা জমে থাকতে দেখা গেছে। ফুলের গন্ধও শিকারকে আকৃষ্ট করে। তবে ফুলের পরাগায়নকারী বড় মাছিগুলো এসব লোমে আটকে পড়েনি। এতে ধারণা করা হয়, কার্যকর পরাগায়নকারী নয়- এমন পোকামাকড়ই মূলত ফাঁদে পড়ে।
গবেষকরা জানান, লোমে পোকামাকড় আটকে গেলেই যে উদ্ভিদটি সেগুলো হজম করছে, এমন নয়। উদ্ভিদখেকো প্রাণীর হাত থেকে সুরক্ষার জন্যও এসব লোম প্রতিরক্ষামূলক গঠন হিসেবে কাজ করতে পারে।
পোকামাকড়ের শরীরে প্রচুর নাইট্রোজেন থাকে। অনেক ধরনের পতঙ্গ খেকো উদ্ভিদের বিবর্তনের পেছনে এমন পরিবেশে টিকে থাকার প্রয়োজনে এই নাইট্রোজন কাজ করেছে। কারণ, এই জায়গাগুলোতে নাইট্রেটের পরিমাণ কম। স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার মিটার উচ্চতায় পাথুরে, শুষ্ক ও পুষ্টি-স্বল্প মাটিতে জন্মায়। পতঙ্গ খেকো উদ্ভিদের জন্য এমন পর্বতীয় আবাসস্থল একটি নতুন বিষয়। কারণ, বেশিরভাগ উদ্ভিদ জলাভূমির মাটিতে জন্মায়।
বিশ্বে ফুলধারী উদ্ভিদের প্রজাতি রয়েছে অন্তত ৩ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে ৭৫০টির বেশি প্রজাতিকে পতঙ্গ খেকো হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ১৪টি উদ্ভিদে স্বাধীনভাবে বিভিন্ন ধরনের কীটভুক বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন ঘটেছে, যাকে বলা হয় অভিসারী বিবর্তন। প্রত্যন্ত ও উচ্চভূমির পরিবেশে থাকার কারণে বর্তমানে স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মুখে নেই।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস



























