আজ ২৯ আগস্ট। পপ দুনিয়ার রাজ সিংহাসন খালি করে যিনি চলে গেছেন অনন্তের পানে, সেই মাইকেল জ্যাকসনের শুভ জন্মদিন। কেবল একটি সুরের নাম নয়, মাইকেল জ্যাকসন এক মহাকাব্যের নাম—যার ছত্রে ছত্রে লেখা আছে অপার খ্যাতি, চরম পাওয়া, আর তীব্র একাকীত্বের গোপন হাহাকার।
জ্যাকসন ফাইভ
ইন্ডিয়ানার গ্যারি শহরের এক সাধারণ কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমজীবী পরিবারে যে আলোর প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল, তার শৈশবটাই হারিয়ে গিয়েছিল কঠোর নিয়মানুবর্তিতার খাঁচায়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে যে হাতে খেলনা থাকার কথা ছিল, সেই হাত আঁকড়ে ধরেছিল মাইক্রোফোন। বাবা জোসেফ জ্যাকসনের কঠোর শাসনের মুখে ‘জ্যাকসন ফাইভ’-এর হয়ে গান গাইতে গাইতে বালক মাইকেল বিশ্বকে চিনলেও, বিশ্ব তাকে তার শৈশবটা ফিরিয়ে দিতে পারেনি। হয়তো এই না-পাওয়াটাই সারাজীবন তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
মুনওয়াকের আলোয় বিশ্বজয়
একক ক্যারিয়ারে পা রাখার পর ইতিহাস নতুন করে লেখা শুরু হয়। ১৯৭৯-এর ‘অফ দ্য ওয়াল’ যদি সূচনা হয়ে থাকে, তবে ১৯৮২-র ‘থ্রিলার’ ছিল ঝড়ের মতো। পুরো বিশ্ব থমকে গিয়েছিল এই অ্যালবামের তালে। আর ১৯৮৩ সালে ‘বিলি জিন’ গানের সাথে যখন তিনি প্রথম মঞ্চে ‘মুনওয়াক’ করলেন—মনে হয়েছিল মহাকর্ষের সব নিয়ম পদদলিত করে কোনো এক নক্ষত্র মানুষ হেঁটে যাচ্ছে পৃথিবীর ধূলিকণায়। ‘স্মুথ ক্রিমিনাল’-এর ৪৫ ডিগ্রির শূন্যে ঝুঁকে পড়া কিংবা ‘বিট ইট’-এর ছন্দ—জ্যাকসন শুধু গান গাননি, তিনি পপ সংস্কৃতিকে এক নতুন ভিজ্যুয়াল রূপ দিয়েছিলেন।
পর্দার পেছনের অন্ধকার
কিন্তু আলোর তীব্রতা যত বেশি হয়, তার পেছনে ছায়াও তত গভীর হয়। খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেও মাইকেল ছিলেন বড্ড একা। নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ফিরে পেতেই হয়তো গড়ে তুলেছিলেন ‘নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চ’—যেখানে ছিল বিনোদন পার্ক আর রূপকথার রাজ্য। কিন্তু এই রূপকথাই একসময় বিষাদে রূপ নেয়।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাকে তাড়া করে ফেরে অগণিত আইনি জটিলতা, বিতর্ক আর কুৎসিত স্ক্যান্ডাল। চর্মরোগ, প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে গণমাধ্যমের নির্মম ব্যবচ্ছেদ এবং অর্থ সংকটের টানাপোড়েন তাকে মানসিকভাবে ছারখার করে দেয়। যে মানুষটি ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’ গেয়ে বিশ্বজুড়ে হাজারো মানুষের ক্ষুধা ও কান্না মুছেছেন, ৩৯টি দাতব্য সংস্থাকে ভালোবেসে দান করেছেন—তিনি নিজেই শেষ বয়সে ভালোবাসা আর বিশ্বাসের তীব্র সংকটে ভুগেছেন।
এক বিয়োগান্তক মহাপ্রয়াণ
২৫ জুন, ২০০৯। মাত্র ৫০ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের এক নীরব কক্ষে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় সেই স্পন্দন। অতিরিক্ত ওষুধ আর বিষক্রিয়ায় হৃদয় বন্ধ হয়ে বিদায় নেন এই সঙ্গীত ঈশ্বর।
মাইকেল জ্যাকসন কেবল রাজাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন খ্যাতির নির্মমতার শিকার হওয়া এক ট্র্যাজিক নায়ক। আজ তার জন্মদিনে পৃথিবীর অলিতে-গলিতে হয়তো আবার বাজবে ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’। আলো-আঁধারির সেই আয়নায় স্পষ্ট ভেসে উঠবে এক অমর শিল্পীর মুখ—যে বিশ্বকে নাচিয়েছে, কিন্তু নিজে কেঁদেছে আড়ালে।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি


























