প্রায়ই বন্যপ্রাণীর আক্রমণে আহত হওয়ার খবর দেখা যায় শিরোনামে। কখনো কখনো মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়। মানুষ আর বন্যপ্রাণীর এই মুখোমুখির অর্থ এমন নয়, প্রাণীটি মানুষের মাংস খাওয়ার স্বাদ পেয়েছে বলে এত আক্রমণ করছে। তবে এভাবে মুখোমুখি হওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন- আত্মরক্ষা বা বাচ্চা রক্ষা, এলাকা সুরক্ষা রাখা কিংবা কোনো ধরনের হুমকি মনে হলে প্রতিক্রিয়া দেখাতে আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে বন্যপ্রাণীরা।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ তথ্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন বন্যপ্রাণী ফটোগ্রাফার ও পরিবেশবিদ ইন্দ্রজিৎ গোরপাড়। তিনি বলেন, মানুষকে আক্রমণ করা প্রাণী এবং প্রকৃত নরখাদকের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। তার মতে―দ্বিতীয় বিষয়টি এমন প্রাণীকে বোঝায়, যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং আচরণের অংশ হিসেবে প্রাণীটি বারবার মানুষকে আক্রমণ বা শিকার করে।
কেন প্রাণীকে নরখাদক বা মানুষখেকো বলা হয়:
পরিবেশবিদ ইন্দ্রজিৎ বলেন, মানুষখেকো প্রাণী হচ্ছে এমন সব প্রাণী, যারা তাদের আচরণের অংশ হিসেবে মানুষকে আক্রমণ বা শিকার করে থাকে। এই ধরনের অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। আঘাত বা অসুস্থতা, প্র্রাকৃতিক শিকারের অভাব এবং মানব বসতির সঙ্গে ক্রমশ সংস্পর্শ―এসব নরখাদক হতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ঐতিহাসিক একটি উদাহরণ হচ্ছে চম্পাবতের বাঘ, যেটি শিকারি ও প্রকৃতিপ্রেমী জিম করবেটের ফাঁদে ও গুলিতে নিহত হওয়ার আগে কয়েক শতাধিক মানুষ হত্যা করেছিল। পরিবেশবিদ ইন্দ্রজিৎ বলেন, বাঘটির ওপরের ও নিচের ছেদন দাঁত ভাঙা পাওয়া গিয়েছিল, এ কারণে তার স্বাভাবিক শিকার করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে স্বাভাবিক শিকার ধরতে না পেরে এবং খাদ্যের জন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে মানুষ হত্যা করে এমন সব প্রাণীকে মানুষখেকো বা নরখাদক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা ঠিক নয়।
আক্রমণ করলেই প্রাণী মানুষখেকো হয় না:
পরিবেশবিদ ইন্দ্রজিৎ উল্লেখ করেছেন, মানুষের মরদেহ ভক্ষণ, বিচ্ছিন্ন হামলা ও আত্মরক্ষামূলক ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নরখাদক আচরণ হিসেবে আখ্যা করা উচিত নয়। তাদের ভুলভাবে মানুষখেকো হিসেবে চিহ্নিত করার নানা কারণ রয়েছে। যেমন- মানুষ ও বন্যপ্রাণী সংঘাত, মানুষ অধ্যুষিত ভূখণ্ড, শিকারের অভাব, অসুস্থতা বা আঘাতজনিত কারণ।
পার্থক্যটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, বন্যপ্রাণীরা খাবারের জন্য শিকার করার অভ্যাস গড়ে না তুলেও মানুষের ওপর আক্রমণ করতে পারে। একটি চিতাবাঘের নিজেকে বা বাচ্চাদের আত্মরক্ষায় আক্রমণ, হঠাৎ ভাল্লুকের মুখোমুখি হলে ভয় পেলে বা আত্মরক্ষায় আক্রমণ বা নদীর তীরের কাছে কুমিরের আক্রমণ, সবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি হতে পারে। কিন্তু এসব এমনটা বোঝায় না যে, প্রাণীটি মানুষ শিকারে অভ্যস্ত।
কোনো প্রাণী হুমকির কারণ হলে করণীয়:
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর প্রতিটি সংঘাতে একক কোনো সমাধান নেই। পরিবেশবিদ ইন্দ্রজিৎ বলেন, এ ধরনের ঘটনাগুলো আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এগুলো পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদাভাবে সামলাতে হবে। আর একদম শেষ উপায় হচ্ছে হত্যা করা। যেখানে কোনো প্রাণী বারবার মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং মানুষ ও জনবসতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন। তবে এমন পদক্ষেপ নেয়ার আগে জানা জরুরি, ওই প্রাণীটি অভ্যাসগত মানুষখেকো আচরণ করছে কিনা।
বিপজ্জনক প্রাণীর উপস্থিতি এমন নয় যে, বন্যপ্রাণীটি ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে তার লক্ষ্যবস্তু করছে। আক্রমণটি কেন করা হলো, তা আত্মরক্ষামূলক ছিল নাকি শিকারের উদ্দেশ্যে এবং এর কোনো পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন রয়েছে কিনা, তা বুঝতে পারলে প্রকৃত মানুষখেকো প্রাণী এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে ক্রমশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য করা সহজ হবে।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস




























