ঢাকা ১১:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনের শেষ প্রহর, যার মৃত্যু স্তব্ধ করে দেয় পুরো বিশ্বকে

১৯৯৭ সালের ৩০ আগস্ট। প্যারিসের আলোঝলমলে রাত তখনও শুরু হয়নি। ভূমধ্যসাগরে এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে ব্যক্তিগত জেটে প্যারিসের লে বুর্জে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা ও তার সঙ্গী ডডি আল ফায়েদ। পরিকল্পনা ছিল প্যারিসে কিছুটা একান্ত সময় কাটানোর। কিন্তু বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই তাদের পিছু নিতে শুরু করে পাপারাজ্জিরা। কয়েক ঘণ্টা পর সেই পিছু ধাওয়া গিয়ে থামে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় ডায়ানার জীবন।

রাত ১০টা — রিটজ হোটেলে একান্ত সময়

পাপারাজ্জিদের নজর এড়াতে ডায়ানা ও ডডি আল ফায়েদ আশ্রয় নেন প্যারিসের বিখ্যাত রিটজ হোটেলে। হোটেলটির মালিক ছিলেন ডডির বাবা মোহাম্মদ আল ফায়েদ।

প্রথমে তারা বাইরে একটি ফরাসি রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বাইরে সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ভিড় দেখে পরিকল্পনা বদলে ফেলেন তারা। রিটজ হোটেলের ইম্পেরিয়াল স্যুটেই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

সেই সময় স্যুটের ভেতরের পরিবেশ ছিল বেশ শান্ত। ডায়ানা খাবার হিসেবে মাশরুম ও অ্যাসপারাগাসের একটি স্টার্টার এবং সামুদ্রিক মাছ অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু হোটেলের বাইরে তখনও ক্যামেরা হাতে অপেক্ষা করছিলেন বেশ কয়েকজন পাপারাজ্জি।

রাত ১২টা — হোটেল ছাড়ার প্রস্তুতি

নৈশভোজ শেষে ডডি আল ফায়েদ সিদ্ধান্ত নেন, হোটেলের মূল প্রবেশপথ দিয়ে বের হলে পাপারাজ্জিরা তাদের অনুসরণ করতে পারে। তাই পেছনের রাস্তা দিয়ে বের হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করতে হোটেলের মূল ফটক দিয়ে একটি ভুয়া গাড়িও বের করে দেওয়া হয়। এরপর রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে রিটজ হোটেলের পেছনের রু ক্যাম্বন প্রবেশপথ দিয়ে একটি কালো মার্সিডিজ-বেঞ্জ এস২৮০ গাড়িতে ওঠেন ডায়ানা ও ডডি।

গাড়িটি চালাচ্ছিলেন হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক অঁরি পল। তার পাশে ছিলেন দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স। পেছনের আসনে ছিলেন ডায়ানা ও ডডি।

রাত ১২টা ২৩ মিনিট — শুরু হয় পিছু ধাওয়া

হোটেল থেকে গাড়িটি বের হওয়ার পর পাপারাজ্জিরা দ্রুত বুঝতে পারেন, ডায়ানা ও ডডি অন্য গাড়িতে করে বের হয়েছেন। এরপর মোটরসাইকেলসহ কয়েকটি গাড়ি তাদের পিছু নেয়।

আইফেল টাওয়ারের পাশ দিয়ে সিন নদীর তীর ধরে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল কালো মার্সিডিজটি। পাপারাজ্জিদের ক্যামেরা এড়াতে গাড়িটি দ্রুত চালানো হচ্ছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটি পন্ট দ্য লা আলমা আন্ডারপাসের দিকে এগিয়ে যায়। দুর্ঘটনা তদন্তে পরে গাড়িটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ১০৫ কিলোমিটার ছিল বলে উঠে আসে, যেখানে ওই এলাকায় নির্ধারিত গতিসীমা ছিল ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার।

টানেলের ভেতরে ঢোকার পর চালক অঁরি পল গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। গাড়িটি একটি সাদা ফিয়াট ইউনোকে ঘেঁষে যায়। এরপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে মার্সিডিজটি টানেলের ১৩ নম্বর কংক্রিটের স্তম্ভে সজোরে আঘাত করে।

মুহূর্তের মধ্যেই ধুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটির সামনের অংশ।

রাত ১২টা ২৫ মিনিট — ধ্বংসস্তূপে ডায়ানা

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ। চালক অঁরি পল এবং ডডি আল ফায়েদ ঘটনাস্থলেই মারা যান।

গুরুতর আহত অবস্থায় গাড়ির ভেতরে আটকে ছিলেন ডায়ানা। তার পাশের দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্সও মারাত্মক আহত হন, তবে তিনি বেঁচে যান।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে যান কয়েকজন পাপারাজ্জি। আহতদের উদ্ধারে সহায়তা করার পাশাপাশি কিছু আলোকচিত্রী দুর্ঘটনাস্থলের ছবি তুলতে শুরু করেন। পরে পুলিশ ও উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং উদ্ধারকাজ শুরু করে।

রাত ২টা ৬ মিনিট — হাসপাতালে নেওয়া হয় ডায়ানাকে

উদ্ধারকারীরা গাড়ির ধ্বংসস্তূপ কেটে ডায়ানাকে বের করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত প্যারিসের পিটি-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

চিকিৎসকেরা দেখতে পান, ডায়ানার শরীরে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং হৃদযন্ত্রেও গুরুতর আঘাত লেগেছে। চিকিৎসক ও সার্জনরা তাকে বাঁচাতে দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালান।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ভোর ৪টা — স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রোববার ভোর ৪টার দিকে চিকিৎসকেরা প্রিন্সেস ডায়ানাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে থেমে যায় তার জীবন। কিন্তু তার মৃত্যু শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবার নয়, পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।

ডায়ানার মৃত্যু নিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যাপক তদন্ত ও নানা বিতর্ক হয়েছে। তবে সরকারি তদন্তে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো এবং চালকের মদ্যপ অবস্থাকে দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

একটি সাধারণ রাতের নৈশভোজ, পাপারাজ্জিদের পিছু ধাওয়া, দ্রুতগতির গাড়ি এবং প্যারিসের সেই টানেল—সবকিছু মিলিয়ে ১৯৯৭ সালের সেই রাত আজও ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ট্র্যাজিক রাতগুলোর একটি।

বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ‘প্রিন্সেস ডায়ানা’ আজও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন।

সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনের শেষ প্রহর, যার মৃত্যু স্তব্ধ করে দেয় পুরো বিশ্বকে

আপডেট সময় ০৮:০২:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

১৯৯৭ সালের ৩০ আগস্ট। প্যারিসের আলোঝলমলে রাত তখনও শুরু হয়নি। ভূমধ্যসাগরে এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে ব্যক্তিগত জেটে প্যারিসের লে বুর্জে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন প্রিন্সেস ডায়ানা ও তার সঙ্গী ডডি আল ফায়েদ। পরিকল্পনা ছিল প্যারিসে কিছুটা একান্ত সময় কাটানোর। কিন্তু বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই তাদের পিছু নিতে শুরু করে পাপারাজ্জিরা। কয়েক ঘণ্টা পর সেই পিছু ধাওয়া গিয়ে থামে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় ডায়ানার জীবন।

রাত ১০টা — রিটজ হোটেলে একান্ত সময়

পাপারাজ্জিদের নজর এড়াতে ডায়ানা ও ডডি আল ফায়েদ আশ্রয় নেন প্যারিসের বিখ্যাত রিটজ হোটেলে। হোটেলটির মালিক ছিলেন ডডির বাবা মোহাম্মদ আল ফায়েদ।

প্রথমে তারা বাইরে একটি ফরাসি রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বাইরে সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ভিড় দেখে পরিকল্পনা বদলে ফেলেন তারা। রিটজ হোটেলের ইম্পেরিয়াল স্যুটেই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

সেই সময় স্যুটের ভেতরের পরিবেশ ছিল বেশ শান্ত। ডায়ানা খাবার হিসেবে মাশরুম ও অ্যাসপারাগাসের একটি স্টার্টার এবং সামুদ্রিক মাছ অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু হোটেলের বাইরে তখনও ক্যামেরা হাতে অপেক্ষা করছিলেন বেশ কয়েকজন পাপারাজ্জি।

রাত ১২টা — হোটেল ছাড়ার প্রস্তুতি

নৈশভোজ শেষে ডডি আল ফায়েদ সিদ্ধান্ত নেন, হোটেলের মূল প্রবেশপথ দিয়ে বের হলে পাপারাজ্জিরা তাদের অনুসরণ করতে পারে। তাই পেছনের রাস্তা দিয়ে বের হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করতে হোটেলের মূল ফটক দিয়ে একটি ভুয়া গাড়িও বের করে দেওয়া হয়। এরপর রাত ১২টা ২০ মিনিটের দিকে রিটজ হোটেলের পেছনের রু ক্যাম্বন প্রবেশপথ দিয়ে একটি কালো মার্সিডিজ-বেঞ্জ এস২৮০ গাড়িতে ওঠেন ডায়ানা ও ডডি।

গাড়িটি চালাচ্ছিলেন হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক অঁরি পল। তার পাশে ছিলেন দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্স। পেছনের আসনে ছিলেন ডায়ানা ও ডডি।

রাত ১২টা ২৩ মিনিট — শুরু হয় পিছু ধাওয়া

হোটেল থেকে গাড়িটি বের হওয়ার পর পাপারাজ্জিরা দ্রুত বুঝতে পারেন, ডায়ানা ও ডডি অন্য গাড়িতে করে বের হয়েছেন। এরপর মোটরসাইকেলসহ কয়েকটি গাড়ি তাদের পিছু নেয়।

আইফেল টাওয়ারের পাশ দিয়ে সিন নদীর তীর ধরে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল কালো মার্সিডিজটি। পাপারাজ্জিদের ক্যামেরা এড়াতে গাড়িটি দ্রুত চালানো হচ্ছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটি পন্ট দ্য লা আলমা আন্ডারপাসের দিকে এগিয়ে যায়। দুর্ঘটনা তদন্তে পরে গাড়িটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ১০৫ কিলোমিটার ছিল বলে উঠে আসে, যেখানে ওই এলাকায় নির্ধারিত গতিসীমা ছিল ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার।

টানেলের ভেতরে ঢোকার পর চালক অঁরি পল গাড়িটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। গাড়িটি একটি সাদা ফিয়াট ইউনোকে ঘেঁষে যায়। এরপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে মার্সিডিজটি টানেলের ১৩ নম্বর কংক্রিটের স্তম্ভে সজোরে আঘাত করে।

মুহূর্তের মধ্যেই ধুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটির সামনের অংশ।

রাত ১২টা ২৫ মিনিট — ধ্বংসস্তূপে ডায়ানা

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ। চালক অঁরি পল এবং ডডি আল ফায়েদ ঘটনাস্থলেই মারা যান।

গুরুতর আহত অবস্থায় গাড়ির ভেতরে আটকে ছিলেন ডায়ানা। তার পাশের দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোন্সও মারাত্মক আহত হন, তবে তিনি বেঁচে যান।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে যান কয়েকজন পাপারাজ্জি। আহতদের উদ্ধারে সহায়তা করার পাশাপাশি কিছু আলোকচিত্রী দুর্ঘটনাস্থলের ছবি তুলতে শুরু করেন। পরে পুলিশ ও উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং উদ্ধারকাজ শুরু করে।

রাত ২টা ৬ মিনিট — হাসপাতালে নেওয়া হয় ডায়ানাকে

উদ্ধারকারীরা গাড়ির ধ্বংসস্তূপ কেটে ডায়ানাকে বের করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত প্যারিসের পিটি-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

চিকিৎসকেরা দেখতে পান, ডায়ানার শরীরে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং হৃদযন্ত্রেও গুরুতর আঘাত লেগেছে। চিকিৎসক ও সার্জনরা তাকে বাঁচাতে দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালান।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ভোর ৪টা — স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রোববার ভোর ৪টার দিকে চিকিৎসকেরা প্রিন্সেস ডায়ানাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে থেমে যায় তার জীবন। কিন্তু তার মৃত্যু শুধু ব্রিটিশ রাজপরিবার নয়, পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।

ডায়ানার মৃত্যু নিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যাপক তদন্ত ও নানা বিতর্ক হয়েছে। তবে সরকারি তদন্তে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো এবং চালকের মদ্যপ অবস্থাকে দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

একটি সাধারণ রাতের নৈশভোজ, পাপারাজ্জিদের পিছু ধাওয়া, দ্রুতগতির গাড়ি এবং প্যারিসের সেই টানেল—সবকিছু মিলিয়ে ১৯৯৭ সালের সেই রাত আজও ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ট্র্যাজিক রাতগুলোর একটি।

বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ‘প্রিন্সেস ডায়ানা’ আজও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন।

সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)

বাংলা৭১নিউজ/জেএস