ঢাকা ১২:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোলিলুরের যুদ্ধ ১৭৮১: রক্তক্ষয় ও এক অমীমাংসিত ইতিহাস

১৭৮১ সালের ২৭ আগস্ট তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমের নিকটবর্তী পোলিলুর নামক স্থানে মহীশূরের শাসক হায়দার আলী এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জেনারেল স্যার আয়ার কুটের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধের (১৭৮০–১৭৮৪) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও গতিপ্রকৃতি

১৭৮০ সালে পোলিলুরের প্রথম যুদ্ধে হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতান ব্রিটিশ কর্নেল উইলিয়াম বেইলির বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করেছিলেন। সেই প্রতিশোধ এবং মহীশূরের অগ্রযাত্রা রুখতে ১৭৮১ সালে জেনারেল আয়ার কুট ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্ব নেন।

হায়দার আলীর বাহিনী তাদের বিখ্যাত লোহার তৈরি উন্নত রকেট প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। এই রকেটের সুনির্দিষ্ট ও তীব্র আক্রমণের মুখে ব্রিটিশ লাইনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

হায়দার আলীর সামরিক কৌশল সত্ত্বেও জেনারেল আয়ার কুটের সুশৃঙ্খল এবং ভারী কামানে সজ্জিত ইউরোপীয় পদাতিক বাহিনী দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে একপর্যায়ে মহীশূর বাহিনীকেও তীব্র বেগ পেতে হয়।

ক্ষয়ক্ষতি ও কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন

তীব্র সংঘর্ষের ফলে উভয় পক্ষেই বিপুল হতাহতের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধের একপর্যায়ে হায়দার আলী তাঁর বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে রণক্ষেত্র থেকে কিছুটা পিছিয়ে কাঞ্চিপুরমে অবস্থান নেন।

অন্যদিকে বিজয় দাবি করলেও ব্রিটিশ বাহিনী চরম খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে পড়ে। শারীরিক ক্লান্তি ও তৃষ্ণায় কাতর সৈন্যদের সামলাতে না পেরে জেনারেল আয়ার কুট যুদ্ধক্ষেত্র ধরে রাখতে ব্যর্থ হন এবং ‘ত্রিপাসুর’ অঞ্চলের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য হন।

যুদ্ধের ফলাফল

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধের বিজয়ী কে—তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। ব্রিটিশরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাওয়ায় হায়দার আলী একে শত্রুভাবাপন্ন বাহিনীর “পলায়ন” হিসেবে গণ্য করেন এবং বিজয়োল্লাসে কামান দেগে নিজের জয় ঘোষণা করেন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতে, হায়দার আলী প্রথমে রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন—এই অজুহাতে ব্রিটিশরা নিজেদের বিজয়ী দাবি করে গান-স্যালুট ফায়ার করে। তবে ঐতিহাসিক নথিতে তারা এটিকে একটি ‘দ্ব্যর্থহীন বা বিতর্কিত বিজয়’ হিসেবে স্বীকার করেছে।

বাস্তবে যুদ্ধটি কোনো পক্ষের জন্যই সামরিক বা কৌশলগতভাবে চূড়ান্ত ছিল না; বরং এটি একটি কৌশলগত অমিমাংসিত সমতায় শেষ হয়েছিল।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পরবর্তী প্রভাব

পোলিলুরের পর শো লিঙ্গুরের যুদ্ধসহ আরও কয়েকটি সংঘর্ষ ঘটে। ১৭৮২ সালে হায়দার আলীর মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি টিপু সুলতান বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ বজায় রাখেন। অবশেষে ১৭৮৪ সালে ম্যাঙ্গালোরের চুক্তি-র মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে, যেখানে দুই পক্ষই বিজয়ী-বিজিত নির্ধারণ ব্যতিরেকে একে অপরের দখলকৃত এলাকা ও যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়।

বর্তমান অবস্থা

যে রক্তক্ষয়ী প্রাঙ্গণে একসময় কামান ও মহীশূরী রকেটের গর্জন শোনা যেত, সেখানে বর্তমানে বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত গড়ে উঠেছে। তবে ইতিহাসকে ধরে রাখতে আজও সেই যুদ্ধক্ষেত্রে দুজন ব্রিটিশ অফিসারের স্মৃতিতে নির্মিত দুটি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বাংলিা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

পোলিলুরের যুদ্ধ ১৭৮১: রক্তক্ষয় ও এক অমীমাংসিত ইতিহাস

আপডেট সময় ১১:২৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

১৭৮১ সালের ২৭ আগস্ট তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমের নিকটবর্তী পোলিলুর নামক স্থানে মহীশূরের শাসক হায়দার আলী এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জেনারেল স্যার আয়ার কুটের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধের (১৭৮০–১৭৮৪) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও গতিপ্রকৃতি

১৭৮০ সালে পোলিলুরের প্রথম যুদ্ধে হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতান ব্রিটিশ কর্নেল উইলিয়াম বেইলির বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করেছিলেন। সেই প্রতিশোধ এবং মহীশূরের অগ্রযাত্রা রুখতে ১৭৮১ সালে জেনারেল আয়ার কুট ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্ব নেন।

হায়দার আলীর বাহিনী তাদের বিখ্যাত লোহার তৈরি উন্নত রকেট প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। এই রকেটের সুনির্দিষ্ট ও তীব্র আক্রমণের মুখে ব্রিটিশ লাইনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

হায়দার আলীর সামরিক কৌশল সত্ত্বেও জেনারেল আয়ার কুটের সুশৃঙ্খল এবং ভারী কামানে সজ্জিত ইউরোপীয় পদাতিক বাহিনী দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে একপর্যায়ে মহীশূর বাহিনীকেও তীব্র বেগ পেতে হয়।

ক্ষয়ক্ষতি ও কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন

তীব্র সংঘর্ষের ফলে উভয় পক্ষেই বিপুল হতাহতের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধের একপর্যায়ে হায়দার আলী তাঁর বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে রণক্ষেত্র থেকে কিছুটা পিছিয়ে কাঞ্চিপুরমে অবস্থান নেন।

অন্যদিকে বিজয় দাবি করলেও ব্রিটিশ বাহিনী চরম খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে পড়ে। শারীরিক ক্লান্তি ও তৃষ্ণায় কাতর সৈন্যদের সামলাতে না পেরে জেনারেল আয়ার কুট যুদ্ধক্ষেত্র ধরে রাখতে ব্যর্থ হন এবং ‘ত্রিপাসুর’ অঞ্চলের দিকে যাত্রা করতে বাধ্য হন।

যুদ্ধের ফলাফল

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুদ্ধের বিজয়ী কে—তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। ব্রিটিশরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাওয়ায় হায়দার আলী একে শত্রুভাবাপন্ন বাহিনীর “পলায়ন” হিসেবে গণ্য করেন এবং বিজয়োল্লাসে কামান দেগে নিজের জয় ঘোষণা করেন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতে, হায়দার আলী প্রথমে রণক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে গিয়েছিলেন—এই অজুহাতে ব্রিটিশরা নিজেদের বিজয়ী দাবি করে গান-স্যালুট ফায়ার করে। তবে ঐতিহাসিক নথিতে তারা এটিকে একটি ‘দ্ব্যর্থহীন বা বিতর্কিত বিজয়’ হিসেবে স্বীকার করেছে।

বাস্তবে যুদ্ধটি কোনো পক্ষের জন্যই সামরিক বা কৌশলগতভাবে চূড়ান্ত ছিল না; বরং এটি একটি কৌশলগত অমিমাংসিত সমতায় শেষ হয়েছিল।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পরবর্তী প্রভাব

পোলিলুরের পর শো লিঙ্গুরের যুদ্ধসহ আরও কয়েকটি সংঘর্ষ ঘটে। ১৭৮২ সালে হায়দার আলীর মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি টিপু সুলতান বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ বজায় রাখেন। অবশেষে ১৭৮৪ সালে ম্যাঙ্গালোরের চুক্তি-র মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে, যেখানে দুই পক্ষই বিজয়ী-বিজিত নির্ধারণ ব্যতিরেকে একে অপরের দখলকৃত এলাকা ও যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়।

বর্তমান অবস্থা

যে রক্তক্ষয়ী প্রাঙ্গণে একসময় কামান ও মহীশূরী রকেটের গর্জন শোনা যেত, সেখানে বর্তমানে বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত গড়ে উঠেছে। তবে ইতিহাসকে ধরে রাখতে আজও সেই যুদ্ধক্ষেত্রে দুজন ব্রিটিশ অফিসারের স্মৃতিতে নির্মিত দুটি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বাংলিা৭১নিউজ/এসএইচবি