বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ নয় বছর আপসহীনভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন করেছেন। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে তিনি কারও সঙ্গে কোনো আপস করেননি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, নানা নিপীড়ন, নির্যাতন, অত্যাচার ও ভয়াবহ নৈরাজ্যের মধ্য দিয়েও দেশ ও দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তি এবং নানা ধরনের চক্রান্তের মাধ্যমে বারবার বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়াকে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সব ধরনের বাধা, অত্যাচার ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার দৃঢ় প্রত্যয় থেকে তিনি কখনো সরে যাননি।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই অঙ্গীকারকে সামনে রেখে বেগম খালেদা জিয়া তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেছেন। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম একপর্যায়ে প্রবল গণআন্দোলনে রূপ নেয়। রাজপথে জনতার শক্তির যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা পরবর্তীতে আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে।
সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ও প্রতিরোধ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রিজভী বলেন, এই দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য।
বেগম খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তার আদর্শ, সাহস, বীরত্ব এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের চেতনা সামনে রেখে বিএনপি এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে রিজভী।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের হাতে গড়ে ওঠা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পতাকা এবং বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ তারেক রহমানের হাতে অর্পিত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জনগণের সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই বিএনপির মূল লক্ষ্য। একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর এখন উন্নয়ন, উৎপাদন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই পথে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত থাকতে পারে। তবে সেসব মোকাবেলা করেই দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রিজভী বলেন, তারেক রহমান জনগণের কাছে যে অঙ্গীকারগুলো করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছেন। হার্ভেস্ট কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনগণের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে বিএনপির এ নেতা বলেন, সংকট মোকাবেলায় সরকার বসে নেই। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশে জ্বালানি নিয়ে নানা ধরনের সংকট ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলেও সরকার তা সমাধানের চেষ্টা করছে। এমনকি দেশে জ্বালানি নিয়ে আসার পথে একাধিক জাহাজে বোমা হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নির্ধারিত বাজেটের পাশাপাশি বিপুল অর্থ ব্যয় করে গ্যাস সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহেশখালীতে থাকা টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে। সেই ত্রুটি সমাধানের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এসব সংকট মোকাবেলা করেই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত থাকবে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য তুলে ধরে রিজভী বলেন, গণতান্ত্রিক চেতনা, জনগণের সামাজিক সুরক্ষা এবং দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদনের যে অঙ্গীকার ৩১ দফায় দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনী ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং বেগম খালেদা জিয়া যে কর্মসূচি দিয়ে গেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এসব কর্মসূচি আরো বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
দল ও সরকারের সম্পর্ক প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, দল ও সরকার দুটি আলাদা সত্তা হলেও তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। ফলে সরকারের দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি বিএনপির নেতা হওয়াটাই স্বাভাবিক। জনগণ যখন একটি দলকে ভোট দিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তখন সেই দলের যোগ্য নেতাকর্মীরাই রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, তৃণমূলের সদস্য থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা সরকারের জনকল্যাণমূলক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করবেন। এতে দল ও সরকারের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি বা বৈসাদৃশ্য নেই। দল তার সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবে, আর সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। তবে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যেহেতু বিএনপি রয়েছে, তাই দলের যোগ্য নেতারাই সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন।
বিএনপির নেতাদের মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলীয় দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা দলে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন, তারা দলের দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে সরকারের যেসব মন্ত্রী বিএনপির নেতা, তারাও মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি দলের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তাদের পদ ও সাংগঠনিক অবস্থান অনুযায়ী পালন করবেন। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।
দীর্ঘ ১৭ বছর বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে আন্দোলন-সংগ্রামের পর জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ হয়েছে। তবে সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে সততার সঙ্গে জনগণের জন্য কাজ করা। জনগণের স্বার্থে আন্তরিকভাবে কাজ করতে গেলে সংকট আসতে পারে। কিন্তু সেই সংকট যদি সরকার বা দলের নিজেদের তৈরি না হয়, তাহলে জনগণ তা বুঝতে পারে এবং মেনে নেয়।
তিনি বলেন, জনগণ মূলত দেখতে চায়, সংকটের সময় সরকার কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করছে। বর্তমান সরকার সেই আন্তরিকতার চরম নিদর্শন দেখাচ্ছে। তাই জনগণের স্বার্থে পরিচালিত এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার জনকল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না।
রিজভী বলেন, বিএনপির সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও দেশ গঠনের আদর্শ এবং বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বিএনপি দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে। চ্যালেঞ্জ, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত থাকলেও সেগুলো মোকাবেলা করে জনগণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাবে বিএনপি।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























