সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পাওয়ার জন্য সুষম পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের গুরুত্ব সবারই জানা। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষের জীবনে গভীর সামাজিক মেলবন্ধন বা নিখুঁত বন্ধুত্বও শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে ঠিক সমান ভূমিকা পালন করে।
নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব অজান্তেই মস্তিস্ককে বুড়ো করে ফেলে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অবশ করে দেয়। অন্যদিকে জীবনে সঠিক বন্ধুদের উপস্থিতি মনে ভালোবাসার হরমোন বাড়িয়ে দীর্ঘায়ু পেতে সাহায্য করে।
জীবনযাপন ও মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক পোর্টাল ‘টুডে ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. লরেন নেপোলিটানো বলেন, “সামাজিক জীবনে সুখ ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে একজন মানুষের জীবনে অন্তত পাঁচ ধরনের সুনির্দিষ্ট বন্ধুত্বের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।”
তিনি আরও বলেন, “একজন মানুষের জন্য ৩ থেকে ৫ জন অতি-ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকা হল আদর্শ বা ‘অপটিমাল রিডিং’। ৫ জনের বেশি ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকলে মস্তিস্ক সবার পেছনে সমান মানসিক শক্তি ও সময় ব্যয় করতে পারে না, যা এক সময় হরমোনের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে।”
“আবার জীবনে ৩ জনের কম বন্ধু থাকা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সংকটের মুহূর্তে কেউ একজন ব্যস্ত বা অনুপস্থিত থাকলে মনে তীব্র নিঃসঙ্গতা গ্রাস করে”, ব্যাখ্যা করেন এই মনোবিদ।
সুখের জন্য প্রয়োজনীয় ৫ ধরনের বন্ধু
শৈশবের আজীবন বন্ধু
এই বন্ধুরা মানুষের বেড়ে ওঠার দিনগুলো, পারিবারিক ইতিহাস এবং স্বভাবের আদিম রূপটি নিখুঁতভাবে জানে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন মানুষের সামাজিক পরিধি ছোট হয়ে আসে, তখন এই শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে বছরে একবার কথা হলেও মনের ভেতর এক গভীর নিরাপত্তা ও রক্তচাপ শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
‘ক্লোজ ফ্রেন্ড’ বা অন্তরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু
মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এই বন্ধুরা বড় বর্ম।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার শিশু ও পরিবার মনস্তত্ত্ববিদ ডা. অঞ্জলি ফার্গুসন একই প্রতিবেদনে বলেন, “ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সামনে মানুষকে কোনো লৌকিকতা বা কৃত্রিম সামাজিক মুখোশ পরে থাকতে হয় না। এখানে কোনো বিচারবুদ্ধি বা জাজমেন্টের ভয় ছাড়াই নিজের আসল রূপ বা সততা প্রকাশ করা যায়, যা মস্তিস্ককে আরাম দেয়।”
সুবিধাজনক বা চেনা পরিবেশের বন্ধু
এরা মূলত একই পাড়া-মহল্লা, জিম কিংবা কোনো নির্দিষ্ট শখের ক্লাবের সহযাত্রী। হয়ত এই বন্ধুত্ব সারা জীবন টিকবে না, তবে জীবনের কোনো কঠিন রূপান্তর বা ‘ট্রানজিশন’-এর সময় (যেমন নতুন শহরে আসা) একসঙ্গে কফি খাওয়া বা রেস্তোরাঁয় যাওয়া মানসিক ‘বার্নআউট’ ও ক্ষতিকর চাপ এক নিমেষে কমিয়ে দেয়।
কর্মক্ষেত্রের বন্ধু
অফিসের দৈনন্দিন গুরুদায়িত্ব, বসের বকুনি বা কাজের তীব্র ‘ডেডলাইনের’ মানসিক চাপ একা সহ্য করা কঠিন।
“করোনাকালে হোম অফিস করার সময় মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, অফিসের সহকর্মীদের আন্তরিক উপস্থিতি কতটা মানসিক শক্তি দেয়। কাজের জায়গায় মেজাজ চাঙা রাখতে এরা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে” বলেন ডা. অঞ্জলি ফার্গুসন।
জীবনের একই অধ্যায়ের বন্ধু
মানুষ যখন জীবনের একটি নির্দিষ্ট ও কঠিন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়— যেমন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, প্রথমবার মা হওয়া বা বিবাহ বিচ্ছেদের মতো মানসিক ট্রমা, তখন ঠিক একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া বন্ধুদের সান্নিধ্য মানসিক ভরসা দেয়।
একে অপরের ভুল ও সফলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই অধ্যায়গুলো সহজে পার করা সম্ভব হয়।
একজন বন্ধু কি সব অভাব পূরণ করতে পারে?
গবেষকদের মতে, একজন মাত্র সঙ্গীর ওপর নিজের সমস্ত সামাজিক চাহিদার ভরসা করা মস্তিস্কের ওপর বাড়তি ধকল তৈরি করে। কোনো কারণে সেই একটি সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ তীব্র বিষণ্নতার সাগরে ডুবে যায়।
তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ফেইসবুকের কৃত্রিম ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বের হয়ে এসে বাস্তবের রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে শারীরিক মেলবন্ধন গড়া উপকারী।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস


























