দৈনন্দিন জীবনের নানান অনিয়ম, কাজের তীব্র চাপ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যাভ্যাস অলক্ষ্যেই হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ‘পাম্পিং’ ক্ষমতাকে অবশ করে দেয়।
অনেকেই ভাবেন কোনো বড় শারীরিক উপসর্গ দেখা না দেওয়া পর্যন্ত হয়তো হৃদযন্ত্র সম্পূর্ণ নিরাপদ, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা।
হৃদযন্ত্র কতটা সুরক্ষিত এবং ভবিষ্যতে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কতটুকু রয়েছে, তা ঘরে বসেই ৫টি বিষয়ের ওপর নজর দিয়ে বোঝা সম্ভব।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই পাঁচ মানকে সামগ্রিক ‘কার্ডিওভাসকুলার’ স্বাস্থ্যের ‘মেটাবলিক দর্পণ’ বলা চলে।
‘হার্ভার্ড হেল্থ পাবলিশিং’-এ প্রকাশিত, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘ওয়েট সেন্টার’ ও ‘হার্ভার্ড হার্ট লেটার’-এর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এই ৫টির মান যদি আদর্শ সীমার বাইরে চলে যায়, তবে ধমনীতে চর্বির আস্তরণ জমিয়ে রক্ত সঞ্চালন স্থায়ীভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিঘাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটালের ইন্টারনিস্ট ও হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের প্রধান চিকিৎসা সম্পাদক ডা. হাওয়ার্ড ই. লেওয়াইন এবং হার্ভার্ড হার্ট লেটারের নির্বাহী সম্পাদক জুলি করলিস, হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ৫টি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন।
১. রক্তচাপ: ১২০/৮০ মি.মি. পারদ চিহ্নের নিচে
রক্তচাপের প্রথম সংখ্যাটি (সিস্টোলিক) হৃদপিণ্ডের সংকোচন এবং দ্বিতীয় সংখ্যাটি (ডায়াস্টোলিক) হৃদপিণ্ডের প্রসারণের সময় ধমনীর দেয়ালে রক্তের ধাক্কা বা শক্তি নির্দেশ করে।
ধমনী যদি চর্বি জমে সরু ও শক্ত হয়ে যায়, তবে রক্তচাপ ১২০/৮০-এর ওপরে উঠে যায়।
উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিণ্ডের প্রধান ‘পাম্পিং’ প্রকোষ্ঠকে আকারে বড় করে ফেলে, যা পরে আকস্মিক ‘হার্ট ফেইলিউর’ বা মস্তিস্কের রক্তনালী ছিঁড়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. এলডিএল কোলেস্টেরল: ৭০ মি.গ্রা./ডে.লি.-এর নিচে
রক্তের মোট কোলেস্টেরলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই তৈরি হয় এই ক্ষতিকর ‘লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন’ বা ‘এলডিএল’ কণা দিয়ে।
রক্তে এর মাত্রা ৭০ মিলিগ্রামের বেশি হলে, এই চর্বির কণাগুলো সরাসরি ধমনীর দেয়ালে গেঁড়ে বসে এবং শ্বেত রক্তকণিকার সঙ্গে বিক্রিয়া করে ‘ফোম সেল’ বা চর্বির শক্ত ব্লক তৈরি করে হার্ট অ্যাটাক ডেকে আনে।
৩. ট্রাইগ্লিসারাইড: ১৫০ মি.গ্রা./ডে.লি.-এর নিচে
এটি রক্তে ভাসমান সবচেয়ে সাধারণ চর্বির অণু। প্রতিদিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে চিনি, অ্যালকোহল ও কার্বোহাইড্রেইট গ্রহণ করা হয়, মস্তিস্কের সংকেতে শরীর সেই অব্যবহৃত বাড়তি ক্যালরিকে ট্রাইগ্লিসারাইডে রূপান্তর করে মেদ কোষে জমা রাখে।
রক্তে এর মাত্রা ১৫০ মিলিগ্রাম পার হয়ে গেলে, সরাসরি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তিনগুন বাড়িয়ে দেয়।
৪. খালি পেটের রক্তে শর্করা: ১০০ মি.গ্রা./ডে.লি.-এর নিচে
রক্তে শর্করার মাত্রা ১০০ মিলিগ্রামের বেশি হওয়া মানেই শরীর ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ফাঁদে পড়েছে।
অতিরিক্ত চিনি রক্তনালীর দেয়াল পুড়িয়ে দেয় এবং রক্তের প্লেটলেট বা অণুচক্রিকাগুলোকে অতিরিক্ত চটচটে বা আঠালো করে তোলে।
ফলে ধমনীর ভেতর হঠাৎ করে ক্ষতিকর রক্ত জমাট বেঁধে পাম্পিং ক্রিয়া অবশ হয়ে যায়।
৫. কোমরের পরিমাপ: উচ্চতার অর্ধেকের কম
কোমর মাপার সঠিক নিয়ম হল, নাভির ঠিক ওপরের উন্মুক্ত পেটের অংশটি ফিতা দিয়ে মাপা। আদর্শ মাপ হল, নিজের মোট উচ্চতার অর্ধেকের কম ইঞ্চি।
এছাড়া সাধারণ নিয়মে নারীদের কোমর ৩৫ ইঞ্চি এবং পুরুষদের কোমর ৪০ ইঞ্চির নিচে থাকা বাধ্যতামূলক।
পেটের এই অতিরিক্ত জেদি মেদ বা ভিসারাল ফ্যাট শরীরজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি করে ধমনীর ব্লক বা আটকে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করে।
৫টি মানকে আদর্শ সীমায় রাখার ৪ পন্থা
পটাসিয়াম ডায়েট ও সোডিয়াম বর্জন: প্যাকেটজাত ফাস্টফুডের ক্ষতিকর সোডিয়াম বা লবণ পুরোপুরি বর্জন করে তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি ও ডাল ধরনের পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া ধমনী নমনীয় রাখার প্রধান প্রতিষেধক।
অসম্পৃক্ত চর্বির ব্যবহার: মাংস, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্যের সম্পৃক্ত চর্বি কমিয়ে, এর বদলে কাঠবাদাম, চিয়া সিডস ও উদ্ভিজ্জ তেলের অসম্পৃক্ত চর্বি খাওয়া হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি নিয়ম।
প্রতিদিন ৩০ মিনিটের দ্রুত হাঁটা: সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ন্যূনতম ৩০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার কসরত বা দ্রুত হাঁটা শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে চর্বি জমতে বাধা দেয়।
৭-৮ ঘণ্টার ঘুম ও আর্দ্রতা: প্রতি রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার গভীর ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা হৃদযন্ত্রের পেশি সুস্থ রাখার একটি পদ্ধতি।
পাশাপাশি রক্ত পাতলা এবং লিভার ও কিডনির ছাঁকন ক্ষমতা সচল রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে, যদিও এই পাঁচ বিষয় সুস্থ হৃদযন্ত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, তবে বয়স বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ইতিহাস ভেদে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই মান কিছুটা ওলটপালট হতে পারে।
তাই ঘরে বসে কোনো অবহেলা না করে বছরে অন্তত একবার ‘লিপিড প্রোফাইল’ ও ইসিজি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করাই শ্রেয়।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস


























