গার্মেন্টস শ্রমিকরা যে মজুরি পান তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। প্রতি মাসেই শ্রমিকদের নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা।
বলা যায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাদের। উচ্চ পণ্যমূল্যের বাজারে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিটা খুবই যৌক্তিক। সরকারও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহমত জানিয়ে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে। তারপরও শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন, যাতে মজুরিটা বেশি বাড়ানো হয়।
অতীতে যতবার মজুরি বেড়েছে ততবারই এ রকম আন্দোলন হয়েছে।
তবে এবার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য আন্দোলনটি ছিনতাই হয়ে গেছে। শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে গেছে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা এবং আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন ব্যবসায়ীর ইন্ধন রয়েছে এবারের শ্রমিক আন্দোলনে।
তাদের দলীয় ক্যাডার যেমন নামানো হয়েছে এই শ্রমিক আন্দোলনে, তেমনি নামানো হয়েছে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপির কারখানার শ্রমিক এবং আওয়ামী লীগপন্থী গার্মেন্টস মালিকদের কারখানার শ্রমিকদের। সরকারের বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনে ও অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ কাজে কিছু শিল্প মালিকও জড়িত রয়েছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনা চলার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে বলে মনে করছে সরকার।
এ ঘটনায় জড়িত শিল্প মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।’ গতকাল সোমবার সচিবালয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের দুটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যেসব শিল্প মালিক কারখানা বন্ধ রেখেছেন, তাদের তালিকা সরকারের কাছে জমা দেবেন মালিকপক্ষ। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টিতে জড়িত সন্দেহভাজন শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামের তালিকাও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে শ্রমিক আন্দোলনের যেসব ছবি এবং ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে তাতেও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অনেক পদধারী নেতাকর্মীকে দেখা গেছে। শ্রমিকদের আন্দোলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে দলটির নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎপর হয়েছেন বলে দাবি করেছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। এ ঘটনায় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে আটকের খবরও পাওয়া গেছে।
তবে বিজিএমইএ নেতা ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, শুরুতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নামলেও পরে এ আন্দোলনের মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষ ঢুকে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের জোর করে রাস্তায় নামানো হচ্ছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ন্যায্য দাবিটি যাতে অন্য কোনো পক্ষ কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে না পারে সে জন্য শ্রমিক নেতারা শ্রমিকদের আন্দোলন ফেলে কাজে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘দিনভর আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছি। সেসব জায়গায় আমরা বলেছি, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন একটি পক্ষ ছিনতাই করেছে। এই সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকরা জড়িত না। এ জন্য আমরা শ্রমিকদের কারও উসকানিতে পা না দিয়ে আন্দোলন ছেড়ে দ্রুত শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফেরার নির্দেশনা দিচ্ছি।’
আর বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতাদের কারখানার শ্রমিকদের নামানোর যে ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং প্রতিবেদনে কিছু কারখানা মালিকের নাম আসার কথা শোনা যাচ্ছে। যদি এই শ্রমিক আন্দোলনে কোনো গার্মেন্টস মালিকের ইন্ধনের প্রমাণ মেলে তা হলে বিজিএমইএ থেকে সে কারখানাকে সব ধরনের সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এমন তথ্য জানিয়ে বিজিএমইএর পরিচালক ও নতুন গঠিত মজুরি বোর্ডের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, ‘এই শ্রমিক আন্দোলনে কোনো কারখানা মালিকের ইন্ধন আছে কি না সেটা আমাদের জানা নেই— এটা সরকার ও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভালো বলতে পারবে। তবে আমি এটা বলতে পারি, কোনো গার্মেন্টস কারখানার মালিককে এই শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার যদি প্রমাণ মেলে তা হলে বিজিএমইএ থেকে সে কারখানাকে সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
নতুন মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক কবে নাগাদ হতে পারে এবং কতদিনের মধ্যে মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত হতে পারে— এ বিষয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘হাইকোর্ট থেকে বোর্ডের চেয়ারম্যানের নাম চূড়ান্ত করে দেওয়ার পরই আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে বৈঠকে বসে যাব। কয়েক দফা বৈঠকের পর সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে আমরা চাইব চলতি নভেম্বর মাসের মধ্যেই শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করতে পারব।’
তবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— বেশ কিছু গার্মেন্টস কারখানার মালিকের ইন্ধন রয়েছে এই শ্রমিক আন্দোলনে। বলা হচ্ছে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাদের নাম এসেছে। তবে আমরা এখনও এমন কোনো তালিকা হাতে পাইনি। তাই এ ব্যাপারে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না। তবে এখনও শিল্প-কারখানায় আন্দোলন-ভাঙচুর হচ্ছে, অগ্নিসংযোগ হচ্ছে— আমরা এসব বিষয় নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এই সহিংসতার কারণেও আজ সোমবার (গতকাল) শিল্প এলাকার ৬৭৯টি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি।’
গোয়েন্দা তালিকায় নাম এসেছে যাদের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাদের ইন্ধনের যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তার সত্যতা মিলেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। এ রকমই একটি প্রতিবেদন সময়ের আলোর হাতে এসেছে। তাতে আওয়ামী লীগের প্রায় ডজনখানেক নেতার কারখানার নাম ও আওয়ামী লীগপন্থি ব্যবসায়ীর কারখানার নাম এসেছে। ওইসব কারখানার মালিকদের কেউ পলাতক, আবার কেউ আছেন জেলে। যারা পলাতক আছেন তারা ফোনে নির্দেশনা দিয়ে উসকানি দিচ্ছেন এবং যারা জেলে আছেন তাদের কারখানার শীর্ষ কর্মকর্তারা উসকানি দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
তালিকায় যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে আছে— পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপ, সাবেক বাণিজমন্ত্রী টিপু মুনশির প্রতিষ্ঠান সেপাল গ্রুপ, সাবেক এমপি আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ গ্রুপ (ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল), সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হামিদ গ্রুপ (হামিদ সোয়েটার্স লি.), সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের ফেবিয়ান গ্রুপ (ফেবিয়ান গার্মেন্টস লি.)।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগপন্থি বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের নামও এসেছে এই গোয়েন্দা তালিকায়। এর মধ্যে আছে— তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের আব্দুস সালাম, নিপা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. খসরু চৌধুরী, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এমপি ও অ্যাক্সিস নিটওয়্যার্স লিমিটেডের মালিক জাহিদ আহমেদ টুলু, এবং গিভেন্সি গ্রুপের মাসুমা খাতুন লিপার নাম।
ছবি-ভিডিওতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী : ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের চেহারা দেখা গেছে ছবি ও ভিডিওতে। শ্রমিকদের আন্দোলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে দলটির নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎপর হয়েছেন বলে দাবি করেছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। এ ঘটনায় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে আটকের খবরও পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এসব পোস্টে আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচির দৃশ্যও তুলে ধরেছেন তারা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলাম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে উসকানি দিয়েছেন। গত রোববার দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কারও ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসবে না। আমরা জনগণের শক্তি সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি দেব।’
এর ৫১ মিনিট আগে একটি ভিডিও পোস্ট করেন তিনি। এ ছাড়া দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে আরেকটি ভিডিও এবং সকাল ১০টা ৬ মিনিটে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে একটি পোস্ট দেন সাজিবুল। সেখানে তিনি লেখেন, ‘শ্রমিকের বেতন ৩০ হাজার টাকার বৃদ্ধির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আজকেও শ্রমিক আন্দোলন চলছে।’
এর আগে গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে আগুন জ্বালানোর একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। ওই ভিডিওতে ‘৩০ হাজার বেতন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’ স্লোগান শোনা যায়।
কারখানা বন্ধের তালিকা চেয়েছে সরকার : বৈঠকে শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিছু শিল্প মালিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের কারখানা বন্ধ রেখেছেন। এমন কারখানা ও মালিকদের তালিকা সরকারকে দেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কারখানার তালিকা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা রাখা শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামও দিতে বলা হয়েছে। সরকার বিশ্বাস করে, কোনো শ্রমিক কিংবা শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে না। তবে ভুলক্রমে কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দিয়ে থাকলে কিংবা জড়িত থাকলে তাদের সেখান থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করবে। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সীমান্তের ওপার থেকে ইশারায় কেউ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা হবে।
শিল্প-কারখানা বন্ধ চায় না সরকার : পোশাক খাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনো শিল্প-কারখানা বন্ধ হোক তা চায় না। এক মুহূর্তের জন্যও কোনো কারখানা বন্ধ থাকুক, সেটি সরকারের কাম্য নয়। একইভাবে শিল্প খাতে কোনো ধরনের অস্থিরতাও চায় না সরকার।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা জরুরি। শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।
নিষিদ্ধ দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না, মাহদী আমিন : এদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির যেকোনো পরিকল্পনা সফল হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা বলেন তিনি।
গার্মেন্টস শিল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, এই শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, সাপ্লাই চেইন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি জড়িত। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য ও প্রাপ্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, অন্যান্য সেক্টরের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি জানান, সেই লক্ষ্যে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
জানুয়ারি থেকে যেন মজুরি পান সেভাবে কাজ করব, শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার : তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মজুরি বোর্ডে এমনভাবে কাজ করব, যাতে আগামী জানুয়ারি থেকে শ্রমিকরা বাড়তি মজুরি হাতে পান। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়ার কোনো কারণ নেই।’ সোমবার শ্রম ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক পক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন। আরও উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা নাজমা আক্তার, আবুল হোসাইন, লাভলী ইয়াসমিন, সুলতানা বেগম প্রমুখ।
বাবুল আখতার বলেন, ‘চলমান মজুরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অজুহাতে কিছু শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যেসব শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা শুধু মজুরি-সংক্রান্ত ন্যায্য দাবি উত্থাপন বা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে আটক হয়েছেন, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হোক এবং তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হোক।’
শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ ৬৭৯ পোশাক কারখানা— বিজিএমইএ : এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবং শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যাওয়ায় রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া-জিরানী অঞ্চলের ৬৭৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানানো হয় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে। এতে কাজ না করেই কারখানা থেকে বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক। সোমবার বিজিএমইএ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংস্থাটির দেওয়া বেলা সাড়ে ১১টার হিসাব অনুযায়ী দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে মোট ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪টি খোলা ছিল। বিজিএমইএ সূত্র জানায়, শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। সেখানকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টির শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যান। ফলে এ দুই এলাকায় কাজ না করে ফিরে গেছেন ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ জন শ্রমিক।
একই চিত্র সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকাতেও। সেখানে ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টি কারখানায় কাজ বন্ধ রয়েছে এবং কাজ না করে ফিরে গেছেন ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ জন শ্রমিক। এ ছাড়া রাজধানী মিরপুরে ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৬৫টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফেরেন ৫৩ হাজার ৪৫০ জন শ্রমিক।
তবে নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি এবং চট্টগ্রামের ৩১৪টি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের কোনো প্রভাব পড়েনি। এসব এলাকার সব কারখানা স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























