ভারতীয় উপমহাদেশের সুফি সংস্কৃতির ইতিহাসে যে কজন মহামানব মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক আলোর বিস্তার ঘটিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)। তাঁর জীবন শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার গল্প নয়, বরং এটি চরম দারিদ্র্য, তীব্র সংগ্রাম, এবং কঠোর ত্যাগের মধ্য দিয়ে মানবকল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক অনন্য ইতিহাস।
জন্ম এবং পারিবারিক পরিচয়
হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া ইসলামিক হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৭ সফর, ৬৩৬ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। এই হিজরি তারিখটিকে ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে রূপান্তর করলে তা মূলত ৯ অক্টোবর, ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে গণ্য করা হয় (যদিও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে হিজরি সাল গণনার তারতম্যের কারণে ইংরেজি সালটি ১২৩৭ বা ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ওঠানামা করে)। তাঁর পিতা ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ বিন আহমদ আল-হোসাইনী এবং মাতা বিবি জুলেখা। উভয়েই ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার এবং উচ্চ বংশীয়। বংশগতভাবে তিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এবং মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর বংশধর (সৈয়দ) ছিলেন।
স্ত্রী-সন্তান সংক্রান্ত তথ্য
সুফি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং চিশতিয়া তরিকার ঐতিহ্য অনুসারে, হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া আজীবন অবিবাহিত (মুজাররাদ) ছিলেন। তিনি বৈষয়িক কোনো সংসার গড়েননি এবং তাঁর কোনো স্ত্রী ও সন্তান ছিল না। পুরো সৃষ্টিজগৎ এবং তাঁর হাজারো ভক্ত-মুরিদানই ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক পরিবার।
এতিম শৈশব ও কৈশোরের কঠিন সংগ্রাম
নিজামুদ্দিনের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। এরপর তাঁর মা বিবি জুলেখা চরম অর্থকষ্টের মধ্যে তাঁকে লালন-পালন করেন। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। এমন দিনও গেছে যে ঘরে কোনো খাবার থাকত না। তখন তাঁর মা বলতেন, “নিজামুদ্দিন, আজ আমরা আল্লাহর মেহমান (অর্থাৎ আজ আমাদের রোজা)”। মায়ের এই একটি বাক্যই শৈশবে তাঁর মধ্যে চরম ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল (ভরসা) তৈরি করে দিয়েছিল। বদায়ূনে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর মা ও বোনকে নিয়ে তৎকালীন রাজধানী দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লিতে এসে তিনি মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদের অধীনে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে হাদিস, ফেকাহ এবং সাহিত্যশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখে ‘শামসুল ওলামা’ উপাধি লাভ করেন।
আধ্যাত্মিকতার পথে যাত্রা
মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত বাবা ফরিদউদ্দীন গঞ্জেশকর (রহ.)-এর নাম শোনেন এবং তাঁর অন্তরে এক স্বর্গীয় প্রেমের সৃষ্টি হয়। শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে ২০ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের আজোধন (বর্তমান পাকপাত্তান শরিফ) গিয়ে বাবা ফরিদের দরবারে উপস্থিত হন এবং তাঁর হাতে বায়াত (দীক্ষা) গ্রহণ করেন। বাবা ফরিদ তাঁর ভেতরের পাণ্ডিত্য ও অহংকার ধূলিসাৎ করার জন্য তাঁকে অত্যন্ত কঠোর ও কঠিন পরিশ্রমে নিয়োজিত করেন। তিনি নিজামুদ্দিনকে খানকাহর লঙ্গরখানায় নিজ হাতে রান্না করা এবং কাঠ কাটার নির্দেশ দেন। বছরের পর বছর আধ্যাত্মিক সাধনা ও কঠোর ত্যাগের পর, বাবা ফরিদ তাঁকে নিজের প্রধান খলিফা বা আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেন এবং দিল্লিতে গিয়ে চিশতিয়া তরিকার প্রচারের নির্দেশ দেন।
দিল্লির গিয়াসপুরে অবস্থান ও লঙ্গরখানার মহিমা
পীর বা গুরুর নির্দেশ মেনে তিনি দিল্লির উপকণ্ঠে গিয়াসপুর নামক একটি নির্জন গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেন।এখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত খানকাহ (আধ্যাত্মিক কেন্দ্র) স্থাপন করেন। শুরুতে এখানেও তাঁকে চরম অভাবের সম্মুখীন হতে হয়েছে, বুনো ফলমূল খেয়ে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর আধ্যাত্মিক আলোর কথা ছড়িয়ে পড়লে এই গিয়াসপুরই হয়ে ওঠে পুরো ভারতবর্ষের মানুষের প্রধান আশ্রয়স্থল। তাঁর খানকাহতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য বিনামূল্যে লঙ্গর (খাবারের ব্যবস্থা) চালু হয়। আশ্চর্য বিষয় ছিল, সারা দিন হাজার হাজার মানুষকে খাওয়ালেও খাজা নিজে কিন্তু প্রায় সবসময় রোজা রাখতেন এবং সামান্য শুকনো রুটি খেয়ে জীবন ধারণ করতেন।
শাসকদের সাথে সংঘাত
হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার জীবনে অন্যতম কঠিন সংগ্রাম ছিল দিল্লির অহংকারী সুলতানদের মানসিক চাপ প্রতিরোধ করা। তিনি তাঁর জীবনে দিল্লির সাতজন সুলতানের উত্থান-পতন দেখেছেন, কিন্তু কোনোদিন কোনো সুলতানের দরবারে যাননি বা রাজকীয় অনুদান গ্রহণ করেননি। সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি এবং আলাউদ্দিন খিলজি তাঁর সাথে দেখা করার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। আলাউদ্দিন খিলজি যখন জোর করে দেখা করতে চাইলেন, তখন খাজা বিখ্যাত একটি উত্তর দিয়েছিলেন: “আমার খানকাহর দুটি দরজা আছে। সুলতান যদি একটি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকেন, তবে আমি অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যাব।” পরবর্তীতে সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলক খাজার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে দিল্লি ছাড়ার নির্দেশ দেন। তখন খাজা জবাবে বলেছিলেন, “হনুজ দিল্লি দূর অস্ত” (অর্থাৎ, দিল্লি এখনো অনেক দূরে)। অলৌকিকভাবে, সুলতান গিয়াসুদ্দিন দিল্লিতে পৌঁছানোর আগেই এক দুর্ঘটনায় মারা যান এবং খাজার এই উক্তিটি ইতিহাসে চিরদিনের জন্য প্রবাদে পরিণত হয়।
বিশাল ভক্তকুল ও সুযোগ্য শিষ্যগণ
হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ভক্তকুল ছিল অগণিত। তৎকালীন চোর, ডাকাত, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে পণ্ডিত ব্যক্তিরা তাঁর সান্নিধ্যে এসে নিজেদের জীবন সংশোধন করেছিলেন। তাঁর প্রধান এবং সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য ছিলেন বিখ্যাত কবি, ঐতিহাসিক ও সংগীতজ্ঞ আমীর খসরু। খাজা এবং আমীর খসরুর মধ্যের আধ্যাত্মিক প্রেম সুফি ইতিহাসে এক অমর উপাখ্যান। এছাড়া তাঁর অন্যতম প্রধান খলিফা ছিলেন চিরাগ-ই-দিল্লি (হযরত নাসিরুদ্দিন মাহমুদ), যিনি পরবর্তীতে চিশতিয়া তরিকার হাল ধরেন।
শেষ জীবন ও পরলোকগমন
জীবনের শেষ দিনগুলোতে খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া পুরোপুরি ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। ওফাতের কয়েক মাস আগে থেকেই তিনি প্রায় খাবার খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভক্তরা কাঁদো কাঁদো হয়ে অনুরোধ করলে তিনি বলতেন, “যাঁরা আল্লাহর প্রেমে ব্যাকুল, তাঁরা প্রিয়তমের (আল্লাহর) সাথে মিলনের আনন্দে বিভোর থাকেন, তাঁদের আবার খাবারের ক্ষুধা কীসের?” অবশেষে, ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ এপ্রিল (১৮ রবীউস সানী, ৭২৫ হিজরি) এই মহান সুফি সাধক ও ‘মাহবুব-ই-ইলাহী’ (আল্লাহর প্রিয়পাত্র) ইহধাম ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর প্রিয় শিষ্য আমীর খসরু এতটাই শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে, মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তিনিও ইন্তেকাল করেন।
উপসংহার
আজকের দিল্লির যে স্থানে তাঁর মাজার শরিফ অবস্থিত, সেটি ‘হযরত নিজামুদ্দিন’ নামে পরিচিত। ৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর মাজার শরিফে প্রতিদিন কাওয়ালি, জিকির এবং লঙ্গর সেবা চলছে। নিজামুদ্দিন আউলিয়া কোনো রাজপ্রাসাদ বা সাম্রাজ্য রেখে যাননি, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে যে আধ্যাত্মিক ভালোবাসার সাম্রাজ্য তিনি গড়ে গেছেন, তা আজও চিরভাস্বর।
বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

























