ঢাকা ০৪:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক করছেন জটিল অস্ত্রোপচার!

সরকারি হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চিকিৎসক। অথচ বেসরকারি প্রচারণায় নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সার্জন হিসেবে।

এমন অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, কর্মস্থলের বাইরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি, ব্রেস্ট টিউমার, পাইলস, অ্যাপেন্ডিক্স, সিজারসহ অন্তত ২০ ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার নামে।

সম্প্রতি একটি অপারেশন থিয়েটারের ভিডিওতেও ডা. মোস্তাকিমকে পাইলসের অস্ত্রোপচার করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে উপস্থিত এক বিশেষজ্ঞ সার্জনের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ভিডিওটি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন রোগীর পাইলসের অস্ত্রোপচার করছেন ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনি। ভিডিও ধারণকারী চিকিৎসক তাকে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, তিনি কিভাবে এ ধরনের অস্ত্রোপচার করছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটিও হয়।

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কি না, জানতে অনুসন্ধান চালিয়ে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকে ডা. জনির চিকিৎসাসেবা ও প্রচারণার তথ্য পাওয়া যায়। তার নামে ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এসব প্রচারণায় কিডনি, ব্রেস্ট টিউমার, পাইলস, অ্যাপেন্ডিক্স, সিজারসহ অন্তত ২০ ধরনের অস্ত্রোপচারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

ফলে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের একজন চিকিৎসক এসব জটিল ও বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া ডা. মোস্তাকিমের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়ের সঙ্গে তার বেসরকারি কার্যক্রমের কোনো সংঘাত রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দুপুর ২টা থেকে রোগী দেখার প্রচারণা চালানো হলেও তার সরকারি কর্মস্থল বগুড়ায়। বিষয়টি যাচাই করতে সংগ্রহ করা হয় তার বায়োমেট্রিক হাজিরার তথ্য।

গত ১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫২ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ডা. মোস্তাকিমের উপস্থিতি রেকর্ড হয়েছে ৩৫ দিন। কিন্তু এর প্রতিদিনই হাসপাতালে প্রবেশের (ইনটাইম) ও বের হওয়ার (আউট টাইম) সময় একই, অর্থাৎ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে উপস্থিতি থাকলেও কর্মঘণ্টা দেখাচ্ছে শূন্য।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনির দাবি, তিনি যেকোনো ধরনের সার্জারি করতে পারেন। এটা রোগীরা জানেন। উপস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দেখবেন, আপনাদের (সাংবাদিক) জবাব দেওয়ার কিছু নেই।’

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, বগুড়ার সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ বি এম জাফর সাদিক বলেন, ‘অস্ত্রোপচার মানেই শুধু একজন চিকিৎসকের দক্ষতার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িত রোগীর নিরাপত্তা, অ্যানেসথেসিয়া, অপারেশন থিয়েটারের ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল। কারণ অপারেশন থিয়েটারে একটি ভুলের মূল্য দিতে হয় একজন রোগীকেই। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ডা. মোস্তাকিম নিয়মিত জটিল অস্ত্রোপচার করছেন- এমন তথ্য তাদের জানা নেই। ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, উনি (ডা. মোস্তাকিম) অপারেশন টিমের সদস্য, কিন্তু অপারেশন করতে পারেন না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএমএ বগুড়ার সদস্যসচিব ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘বিশেষায়িত ও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের যোগ্যতা ও পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। এর বত্যয় ঘটালে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

বিএমএ বগুড়ার আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. আজফারুল হাবিব রোজ বলেন, ‘অ্যানেসথেসিয়ার চিকিৎসক যদি সার্জারি করে থাকেন, তা অনৈতিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সুষ্ঠ তদন্ত হওয়া দরকার।’

বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল ইসলাম নির্ঝর বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া বিশেষায়িত মেজর সার্জারি করা অনৈতিক। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কর্মস্থলের বাইরে গিয়ে বেসরকারি কার্যক্রম পরিচালনারও সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক করছেন জটিল অস্ত্রোপচার!

আপডেট সময় ০৫:০৩:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি হাসপাতালে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চিকিৎসক। অথচ বেসরকারি প্রচারণায় নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সার্জন হিসেবে।

এমন অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনির বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, কর্মস্থলের বাইরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন দিয়ে কিডনি, ব্রেস্ট টিউমার, পাইলস, অ্যাপেন্ডিক্স, সিজারসহ অন্তত ২০ ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার নামে।

সম্প্রতি একটি অপারেশন থিয়েটারের ভিডিওতেও ডা. মোস্তাকিমকে পাইলসের অস্ত্রোপচার করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে উপস্থিত এক বিশেষজ্ঞ সার্জনের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

ভিডিওটি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন রোগীর পাইলসের অস্ত্রোপচার করছেন ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনি। ভিডিও ধারণকারী চিকিৎসক তাকে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, তিনি কিভাবে এ ধরনের অস্ত্রোপচার করছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটিও হয়।

ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কি না, জানতে অনুসন্ধান চালিয়ে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের একাধিক বেসরকারি ক্লিনিকে ডা. জনির চিকিৎসাসেবা ও প্রচারণার তথ্য পাওয়া যায়। তার নামে ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এসব প্রচারণায় কিডনি, ব্রেস্ট টিউমার, পাইলস, অ্যাপেন্ডিক্স, সিজারসহ অন্তত ২০ ধরনের অস্ত্রোপচারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

ফলে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের একজন চিকিৎসক এসব জটিল ও বিশেষায়িত অস্ত্রোপচার করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া ডা. মোস্তাকিমের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়ের সঙ্গে তার বেসরকারি কার্যক্রমের কোনো সংঘাত রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দুপুর ২টা থেকে রোগী দেখার প্রচারণা চালানো হলেও তার সরকারি কর্মস্থল বগুড়ায়। বিষয়টি যাচাই করতে সংগ্রহ করা হয় তার বায়োমেট্রিক হাজিরার তথ্য।

গত ১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫২ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ডা. মোস্তাকিমের উপস্থিতি রেকর্ড হয়েছে ৩৫ দিন। কিন্তু এর প্রতিদিনই হাসপাতালে প্রবেশের (ইনটাইম) ও বের হওয়ার (আউট টাইম) সময় একই, অর্থাৎ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে উপস্থিতি থাকলেও কর্মঘণ্টা দেখাচ্ছে শূন্য।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. মোস্তাকিম বিল্লাহ জনির দাবি, তিনি যেকোনো ধরনের সার্জারি করতে পারেন। এটা রোগীরা জানেন। উপস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দেখবেন, আপনাদের (সাংবাদিক) জবাব দেওয়ার কিছু নেই।’

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, বগুড়ার সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ বি এম জাফর সাদিক বলেন, ‘অস্ত্রোপচার মানেই শুধু একজন চিকিৎসকের দক্ষতার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িত রোগীর নিরাপত্তা, অ্যানেসথেসিয়া, অপারেশন থিয়েটারের ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল। কারণ অপারেশন থিয়েটারে একটি ভুলের মূল্য দিতে হয় একজন রোগীকেই। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ডা. মোস্তাকিম নিয়মিত জটিল অস্ত্রোপচার করছেন- এমন তথ্য তাদের জানা নেই। ২৫০ শয্যা মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, উনি (ডা. মোস্তাকিম) অপারেশন টিমের সদস্য, কিন্তু অপারেশন করতে পারেন না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএমএ বগুড়ার সদস্যসচিব ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ‘বিশেষায়িত ও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের যোগ্যতা ও পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। এর বত্যয় ঘটালে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

বিএমএ বগুড়ার আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. আজফারুল হাবিব রোজ বলেন, ‘অ্যানেসথেসিয়ার চিকিৎসক যদি সার্জারি করে থাকেন, তা অনৈতিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর সুষ্ঠ তদন্ত হওয়া দরকার।’

বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল ইসলাম নির্ঝর বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া বিশেষায়িত মেজর সার্জারি করা অনৈতিক। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কর্মস্থলের বাইরে গিয়ে বেসরকারি কার্যক্রম পরিচালনারও সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ