ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন বিরাট কোহলি। গতকাল ৩৮ জন্মদিনের কেক কেটেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা—তবু ব্যাট হাতে তার ক্ষুধা কমেনি একটুও।
বরং চাপের বোঝা নামিয়ে এখন আরো স্বাধীন, আরো আগ্রাসী এবং আরো বিধ্বংসী হয়ে উঠেছেন ভারতের এই তারকা।
ইনিংসের শুরু থেকেই বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার যে মানসিকতা কোহলির ব্যাটিংয়ে দেখা যাচ্ছে, তাতে পুরোনো কোহলিকেও যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। সামনে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ক্যারিয়ারে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তুত করছেন নতুন এই কিংবদন্তি।
কোহলির এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ তার মানসিক স্বস্তি। দীর্ঘদিন ভারতের ব্যাটিংয়ের মূল ভরসা ছিলেন তিনি। দলের জয়ের দায়িত্বও অনেকটা নিজের কাঁধে তুলে নিতে হতো। কিন্তু এখন সাদা বলের ক্রিকেটে ভারতের ব্যাটিং গভীরতা অনেক বেশি।
ফলে আগের মতো সব চাপ একা বহন করতে হচ্ছে না তাকে। নিজের স্বাভাবিক খেলাটা আরো স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন।
কোহলি ইদানীং শুরু থেকেই হাত খুলে খেলছেন। ছবি: সংগৃহীত
২০২৫ সালের মে মাসে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর এই পরিবর্তন আরো স্পষ্ট হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে না পারার পর টেস্টকে বিদায় জানান কোহলি।
এরপর থেকে তার ব্যাটিংয়ে ইতিবাচক মানসিকতা ও আগ্রাসন আরো বেড়েছে। যদিও টেস্ট ছাড়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
তবে মাঠের পারফরম্যান্সে পরিবর্তনটি পরিষ্কার। ইনিংসের প্রথম বলেই আক্রমণে যেতে দ্বিধা করছেন না কোহলি। শর্ট বল পেলেই পুল, হাফ ভলি পেলেই আক্রমণাত্মক শট। বলের লাইন-লেংথ বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, খেলছেন নিজের স্বাভাবিক ছন্দে। তার ব্যাটিংয়ে এখন আগের চেয়ে বেশি আগ্রাসন, সঙ্গে নিখুঁত টাইমিং ও অসাধারণ শট নির্বাচন তো আছেই।
অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে গত পরশু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫১ বলে ৭৪ রানের ইনিংসটি কোহলি ২.০-এরই উদাহরণ। ১৩টি চার ও ১টি ছক্কায় সাজানো ইনিংসে কিউই বোলারদের কোনো ছাড় দেননি। ১৩টি চারের মধ্যে মাত্র দুটি এসেছে কাভার ড্রাইভ করে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের শর্ট বলের কৌশল বুঝে পুল শটকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ব্লেয়ার টিকনারের বলগুলোকে যেভাবে সীমানাছাড়া করেছেন, তাতে তার আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক মানসিকতারই প্রকাশ ঘটেছে।
এই ইনিংসে দুটি রেকর্ড গড়েছেন কোহলি। ওয়ানডেতে পরে ব্যাটিং করতে নেমে ছাড়িয়ে গেছেন তার আদর্শ শচীন টেন্ডুলকারকে। এই সংস্করণে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তার রান এখন ৮৭৪১, টেন্ডুলকারের ৮৭২০। তিন নম্বরে ব্যাট করে ১৩ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করা প্রথম ব্যাটারও তিনি।
ওয়ানডেতে ৩০৬ ইনিংসে এটি কোহলির ৮০তম ফিফটি। সেঞ্চুরি আছে ৫৫টি। ওয়ানডেতে লক্ষ্য তাড়া করে জয় এনে দেওয়া ম্যাচে লক্ষ্যে তার রান ৬৪৭৭, গড় ৮৯.৯৫। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের ১০৮টি জয়ের অংশ হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, রান তাড়া করতে নামলে কোহলি কতটা ভয়ংকর।
একসময় শচীন টেন্ডুলকারের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত কোহলি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে। ২০১৪-১৫ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরে চার টেস্টে চার সেঞ্চুরি করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন। এরপর টানা পাঁচ বছর ব্যাট হাতে ছিলেন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিক। করোনাকালের (২০২০ ও ২০২১) ছন্দহীনতা কাটিয়ে এখন আবার ফিরেছেন নতুন উদ্যমে।
নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন কোহলি। ছবি: সংগৃহীত
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপই হতে চলেছে কোহলির শেষ বিশ্বকাপ। ২০১১ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। ফাইনালেও খেলেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ৩৫ রানের ইনিংস। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে ম্যাচসেরা হয়ে শিরোপা জেতানোর স্মৃতিও এখনো তরতাজা।
কোহলির সামনে আরেকটি বড় মঞ্চ। ক্যারিয়ারের শেষ ধাপে এসে তিনি যেভাবে ব্যাটিং করছেন, তাতে বিশ্বকাপে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের প্রত্যাশা করাই যায়।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























