আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ঐতিহ্যবাহী নীল-সাদা জার্সিতে মহাতারকা লিওনেল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের রেশ কাটেনি এখনো। সর্বকালের সেরা ফুটবলারের এই মহাবিদায়ে অশ্রুসিক্ত ও আবেগে ভাসছে পুরো আর্জেন্টিনা।
সেই সর্বজনীন আবেগ গভীরভাবে স্পর্শ করে গেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়াকেও। প্রিয় অধিনায়কের বিদায়লগ্নে এক আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি।
মেসিকে দেওয়া সেই চিঠিতে তার কোনো পরিসংখ্যান, গোলের সংখ্যা কিংবা জেতা শিরোপার আনুষ্ঠানিক হিসাব টানেননি তাপিয়া। বরং বিশ্বমঞ্চে বিশ্বজয়ী অধিনায়কের অনন্য বিনয়, দায়িত্ববোধ, কঠোর পরিশ্রম ও ফুটবলে রেখে যাওয়া অমর উত্তরাধিকারের কথাই প্রাধান্য পেয়েছে তার লেখায়।
চিঠির সূচনাতেই এএফএ সভাপতি লিখেছেন, ‘যে দিনটি কেউই আসুক চায়নি, সেটি এসে গেছে। কিন্তু সময় অনিবার্য। তাই একটি অধ্যায়ের শেষ নিয়ে কিছু কথা লিখতে বসেছি। গল্পের শেষ নয়।
কারণ কিছু গল্প চিরন্তন হয়ে গেলে তার আর শেষ থাকে না।’
মেসির চরিত্রের বিরল দিকগুলো তুলে ধরে তাপিয়া তার বিশ্বজোড়া মহাজাগতিক খ্যাতির পরও নিরহংকার ও মাটির মানুষ থাকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার কিছু না থাকার পরও মেসি তাঁর কঠোর পরিশ্রম বা সাধনা বিন্দুমাত্র কমাননি এবং সতীর্থদের প্রতি সব সময় অকৃত্রিম সম্মান প্রদর্শন করেছেন।
দলে নতুন আগত তরুণ খেলোয়াড়দের আপন করে নেওয়া, কঠিন বিপদের সময় সতীর্থদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো এবং জাতীয় দলের জার্সির প্রতি মেসির অবিচল দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করেছেন তাপিয়া। এএফএ প্রধান লিখেন, ‘এই জার্সির প্রতি তোমার দায়বদ্ধতা ছিল।
এমন সময়ও ছিল, যখন এই জার্সির ওজন কল্পনার চেয়েও বেশি ভারী হয়ে উঠেছিল।’
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের কঠিন সময়গুলোর চিত্রও তাপিয়ার চিঠিতে ফুটে উঠেছে। জাতীয় দল নিয়ে একের পর এক তীব্র সমালোচনা, অন্যায় সংশয় এবং বিষাদময় সময় অতিক্রম করেছেন এলএমটেন। এমন বহু মুহূর্ত ছিল, যখন চাইলে তিনি পথচলা থামিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু মেসি হাল ছাড়েননি; প্রতিবার নতুন উদ্দীপনায় ফিরে এসেছেন।
সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলোর কথা টেনে তাপিয়া লেখেন, ‘কোপা আমেরিকা এল। ওয়েম্বলি এল। আর শেষ পর্যন্ত কাতারের সেই বিকেল এল। যে বিকেল আর্জেন্টাইনরা চিরকাল তাদের স্মৃতির সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় ধরে রাখবে।’
তবে এএফএ সভাপতির চোখে মেসির জীবনের সবচেয়ে বড় ও মহৎ অর্জন কেবল কাচের শোকেসে রাখা শিরোপাগুলো নয়। তাপিয়ার মতে, মেসি আর্জেন্টিনার একাধিক প্রজন্মকে এক সুতোয় বেঁধে একই জার্সির পতাকাতলে একত্রিত করেছেন।
চিঠিতে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় তাপিয়া লিখেছেন, ‘তুমি আরো বড় কিছু করেছ। তুমি প্রজন্মগুলোকে এক করেছ। দাদা, বাবা, সন্তান ও নাতি—সবাই একই জার্সি পরে, একই ১০ নম্বরের জন্য কেঁদেছে। এটিও তোমার উত্তরাধিকার।’
চিঠির শেষাংশে পৌঁছে মেসির বিদায়কে রূপকথার মতো আলৌকিক ও আবেগঘন রূপ দেন তাপিয়া। তিনি লিখেছেন, ‘একদিন জার্সি তুলে রাখা হয়। ম্যাচ শেষ হয়। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যায়। কিন্তু কিংবদন্তিদের আলো নিভে না।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়ে মেসির উপস্থিতি নিয়ে তাপিয়ার গভীর উপলব্ধি, ‘যত দিন আমাদের দেশে কোনো বল গড়াবে, যত দিন কোনো শিশু নীল-সাদা জার্সি পরে গোল করে আকাশের দিকে চিৎকার করবে, যত দিন কোনো আর্জেন্টাইন মনে রাখবে সেই ১৮ ডিসেম্বর কোথায় ছিল—তত দিন তুমি সেখানে থাকবে।’
চিঠির ইতি টেনে মেসিকে নিজের জীবনের প্রিয় নায়ক হিসেবে অভিহিত করেছেন এএফএ প্রধান। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় লেখা তাপিয়ার শেষ পঙ্ক্তিমালা, ‘আমাদের অধিনায়ক। আমাদের চ্যাম্পিয়ন। আমাদের ১০ নম্বর। আমার প্রিয় নায়ক। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, লিও। এই জায়গা সব সময় তোমার বাড়ি হয়ে থাকবে।’
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ



























