বাবা আর নেই। যে মানুষটি ছিলেন পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার একমাত্র অবলম্বন, সেই বাবাই এখন শুধুই স্মৃতি।
মাত্র আট বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে তাফরেজউল্লাহ আরশ। রাজধানীর মগবাজারে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারানো প্রকৌশলী এবিএম আহসান উল্লাহ আরিফের মৃত্যুর পর দিশেহারা তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা।
গত ১৮ অক্টোবর সকালে মায়ের জন্য খাবার নিয়ে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী প্রকৌশলী আরিফ। মগবাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে পৌঁছালে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি ক্রেন তাঁর মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়।
এতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে চার দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২২ অক্টোবর মারা যান আরিফ।
আরিফের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আট বছরের সন্তান আরশ হারিয়েছে তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। যে বয়সে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, বাবার সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই বাবাহীন হয়ে পড়ল শিশুটি।
সন্তানের পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁর মা।
নিহত আরিফের ছোট ভাই চিকিৎসক ডা. এবিএম ইয়াসিন উল্লাহ জানান, তাঁদের মা সেলিনা বেগম নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ইউনিভার্সেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মায়ের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার পথেই দুর্ঘটনার শিকার হন আরিফ। চার দিন পর মা হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও ছেলেকে আর ফিরে পাননি। ছেলের মৃত্যুর খবরের পর মায়ের শারীরিক অবস্থাও খারাপ হয়ে পড়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আরিফ মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে নিজেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। স্ত্রী ও আট বছরের ছেলে আরশকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার।
দুর্ঘটনার ঘটনায় পথচারীরা ক্রেনচালক মেহেদী হাসান সানিকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পুলিশ ক্রেনটি জব্দ করে। এ ঘটনায় নিহতের ফুফাতো ভাই সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বাদী হয়ে ১৯ অক্টোবর হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। দুর্ঘটনায় রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালক ফারুক মিয়াও গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় সড়কে তেমন যানজট বা ভিড় ছিল না। ক্রেনচালকের অবহেলার কারণেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁদের দাবি। পাশাপাশি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ভারী যানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
নিহতের স্বজন সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বলেন, আরিফের স্ত্রী ও ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। বাবাকে হারিয়ে শিশুটি কীভাবে বড় হবে, তার পড়াশোনা ও জীবনের দায়িত্ব কে নেবে—এসব প্রশ্নই এখন পরিবারের সামনে।
এদিকে আরিফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক মো. সুমন জানিয়েছেন, সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
একটি নির্মাণাধীন প্রকল্পের ক্রেনের নিচে চাপা পড়ে নিভে গেছে একজন প্রকৌশলীর জীবন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে থমকে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্নও। এখন আট বছরের আরশের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে বাবা তাকে আগলে রাখতেন, সেই বাবা আর কখনো ফিরবেন না। আর তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দায়িত্বই বা নেবে কে?
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

























