চিংড়ি ঘের ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে সরকারি রাজস্ব বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের চিংড়ি মহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন, নতুন করে খাজনা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ১ লাখ ৯৫ হাজার একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চিংড়ি মহালের সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। সরকারি রাজস্ব আদায়ে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। কোনো লিজ নেওয়া জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকলেও আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখতে পারবে।
চিংড়ি চাষের উপযোগী এবং ইতিমধ্যে চিংড়ি চাষ হচ্ছে—এমন খাসজমি দ্রুত বন্দোবস্ত দেওয়ার পাশাপাশি চিংড়ি মহাল ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো পুনর্গঠনের তাগিদ দেন তিনি।
এ ছাড়া উপকূলীয় বনাঞ্চল নির্ধারণ ও সীমানা চিহ্নিত করে পরিবেশ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে ১৯৮০-এর দশকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় সুন্দরবন নিধনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। উপকূলীয় পরিবেশ ও বনাঞ্চল রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, চিংড়ি খাতে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও কয়েক দশকের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে চিংড়িচাষিরাও নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে জানিয়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য শুধু রাজস্ব বাড়ানো নয়, এ খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ও স্বার্থ সুরক্ষাও নিশ্চিত করা।
বৈঠক শেষে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, দেশের চিংড়ি মহালগুলো থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় এবং অতীতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লক্ষ্য হয়রানি ছাড়াই দেশের বঞ্চিত মানুষের কাছে স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া উল্লেখ করে ভূমি প্রতিমন্ত্রী বলেন, চিংড়ি ঘের ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ভূমি মন্ত্রণালয়কে স্বচ্ছ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সভায় যেসব সিদ্ধান্ত
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেসব জমিতে বনাঞ্চল নেই, সেসব জমি বন বিভাগের গেজেট থেকে বাদ দিয়ে চিংড়ি চাষের জন্য অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। এ ছাড়া বন, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ১ লাখ ৯৫ হাজার একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) করা হাইকোর্টের রিট মামলা নম্বর ৭৪৮৩/২০১২-এর কারণে ২০১২-১৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত স্থগিত থাকা কক্সবাজারের ১ হাজার ৪৬৬টি চিংড়ি মহালের কার্যক্রম পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৯২ সালের চিংড়ি মহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন, নতুন করে খাজনা নির্ধারণ এবং চিংড়ি মহালের আগের অপরিশোধিত সুদ সম্পূর্ণ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে চিংড়ি মহাল ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও অনিয়ম কমবে। পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব আদায় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। চিংড়িচাষিদের বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সভায় অন্যদের মধ্যে ভূমি সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ






















