মুম্বাইয়ের আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের স্মৃতি। শহরটির ভূতাত্ত্বিক ভিত্তির বড় অংশ গড়ে উঠেছে ডেকান ট্র্যাপসের ব্যাসল্ট শিলা দিয়ে; যে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল প্রায় ৬ কোটি ৬৭ লাখ বছর আগে, ডাইনোসরদের বিলুপ্তির সময়ের কাছাকাছি। এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি।
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে প্রায় ১০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি গ্রহাণু মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে আঘাত হানে। ‘সাইন্স’-এর এক পুরোনো প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই আঘাতের ফলে সৃষ্টি হয় বিশাল চিকশুলুব ক্রেটার (একটি গভীর খাদ), যার বিস্তার ১১০ মাইলেরও বেশি। এই মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর ৭৫ শতাংশের বেশি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায় বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, যার মধ্যে ছিল ডাইনোসররাও।
গ্রহাণুটির আঘাত ছিল ভয়াবহ শক্তিশালী। এর অভিঘাতে সৃষ্টি হয়েছিল ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড, সুনামি এবং বায়ুমণ্ডলে এমন পরিবর্তন, যা পৃথিবীর জলবায়ুকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপর্যস্ত করে দেয়।
কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তখন চলছিল আরেক ভয়াবহ ভূতাত্ত্বিক ঘটনা। চিকশুলুবের আঘাতের প্রায় একই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে শুরু হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আগ্নেয়গিরির ধ্বংসযজ্ঞ। ‘সাইন্সডিরেক্ট’-এ প্রকাশিত ‘ডেকান ট্রাপস’ বিষয়ক গবেষণা অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ পশ্চিমাঞ্চল ডেকান ট্র্যাপসের ধারাবাহিক ব্যাসল্টিক লাভা প্রবাহে গঠিত।
এই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের প্রধান পর্যায়গুলোর বয়স প্রায় ৬ কোটি ৭৪ লাখ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। বারবার লাভা প্রবাহিত হয়ে বিশাল অঞ্চল ঢেকে ফেলে এবং তৈরি হয় স্তরে স্তরে জমা ব্যাসল্ট শিলা। কোনো কোনো এলাকায় এই লাভার স্তরের পুরুত্ব ২,০০০ মিটারেরও বেশি। একসময় ডেকান ট্র্যাপস প্রায় ৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। আজকের মহারাষ্ট্রের ভূপ্রকৃতিতে সেই প্রাচীন আগ্নেয়গিরির সরাসরি ছাপ রয়েছে।
চিকশুলুবের আঘাত এবং ডেকান ট্র্যাপসের সবচেয়ে বড় অগ্ন্যুৎপাতের সময়কাল এত কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গবেষক মার্ক রিচার্ডসের নেতৃত্বে একটি দল এই দুই ঘটনার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করে। গবেষকেরা ঘটনা দুটির এই বিস্ময়কর কাছাকাছি সময়কালকে নিছক কাকতালীয় ঘটনা নাও হতে পারে বলে যুক্তি দিয়েছিলেন।
তাদের ধারণা ছিল, চিকশুলুবের মতো বিশাল আঘাত থেকে উৎপন্ন ভূকম্পন শক্তি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকে প্রভাবিত বা ত্বরান্বিত করার মতো শক্তিশালী হতে পারে। তবে গবেষণাটি একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্বীকার করেছিল; চিকশুলুবের আঘাতের অনেক আগেই ডেকান অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাৎ শুরু হয়েছিল। ফলে শুধু গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর অভ্যন্তরে নতুন করে শিলা গলে ডেকানের অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছিল; এমন ব্যাখ্যা দিয়ে দুই ঘটনার সময়ের এই ঘনিষ্ঠতা পুরোপুরি বোঝানো যায় না।
অর্থাৎ, গ্রহাণুর আঘাত ডেকান ট্র্যাপসের অগ্ন্যুৎপাতকে তীব্র করেছিল কি না, তা এখনো বিতর্কিত। ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্যও নেই।
‘জিওএক্সপ্রো ম্যাগাজিন’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বীপসমূহকে ভূমি ভরাটের মাধ্যমে যুক্ত করে গড়ে ওঠা বর্তমান মুম্বাই মূলত আগ্নেয় উৎসের শিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শহরের বিভিন্ন অংশে ডেকান ট্র্যাপসের ব্যাসল্ট দেখা যায়। সঞ্জয় গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের বোরিভালির মতো এলাকাতেও এই প্রাচীন আগ্নেয় শিলা উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
মুম্বাইয়ের কাছেই এলিফ্যান্টা গুহাগুলোও ডেকান ব্যাসল্টের সঙ্গে এই ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান যোগসূত্র। শক্ত কালো ব্যাসল্ট কেটে তৈরি করা এই গুহাগুলো আজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হলেও, একই সঙ্গে এগুলো কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনেরও সাক্ষী।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস


























