ঢাকা ০২:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

স্বর্গের লোভ দেখিয়ে অনাহারে শিশুদের হত্যা, ধর্মগুরুর ২০০ বছরের সাজা

ধর্মীয় চরমপন্থায় প্ররোচিত করে যিশুর সঙ্গে সাক্ষাতের আশ্বাসে নিজের অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার বহুল আলোচিত মামলায় কেনিয়ার ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার দায়ে তার ২৮ জন সহযোগীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশটির উপকূলীয় শহর মোম্বাসার হাইকোর্টের বিচারক ডায়ানা কাবেদজা-মোচাচে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের নথিতে বলা হয়, পল ম্যাকেঞ্জি তার অনুসারীদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে চরম অনাহারে দিন কাটালে তারা সরাসরি যিশুর দেখা পাবেন। তার অন্ধ নির্দেশে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু আহার এবং পানি গ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। ফলে ১৯০টি নিষ্পাপ শিশু ও একজন প্রাপ্তবয়স্কসহ মোট ১৯১ জন মারা যান। ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদনে আদালত উল্লেখ করেন, নিহতদের মধ্যে ১৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে তীব্র অনাহার ও অপুষ্টিতে এবং বাকি আটজনকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছিল।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক দুটি পৃথক ধারায় ম্যাকেঞ্জিকে ১০০ বছর করে মোট ২০০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। অন্যদিকে, অপরাধে সহায়তা করার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে তার ২৮ সহযোগীকে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৬০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের জোর দাবি জানিয়েছিল। তবে বিচারক সেই আবেদন খারিজ করে দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ডায়ানা কাবেদজা উল্লেখ করেন, এই গোষ্ঠীর বিকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী শারীরিক মৃত্যুকে মূলত ‘স্বর্গে যাওয়ার পথ’ বলে মনে করা হতো। ফলে তাদের কাছে মৃত্যুদণ্ড কোনো শাস্তি নয়, বরং একটি ঐশ্বরিক ‘পুরস্কার’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—সেই যুক্তি থেকেই ম্যাকেঞ্জিকে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন ম্যাকেঞ্জির আইনজীবী। তবে এতেই তার আইনি সংকট কাটছে না; কারণ শাকাহোলা বনাঞ্চলে আরও শতাধিক অনুসারীর মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও পরিকল্পিত হত্যাসহ একাধিক পৃথক মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে কেনিয়ার উপকূলীয় কিলিফি কাউন্টির দুর্গম শাকাহোলা বনাঞ্চলে একাধিক গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর এই নারকীয় ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ওই জঙ্গল থেকে চার শতাধিক কঙ্কাল ও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, যার অনেকের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। কেনিয়ার আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই গণমৃত্যুর ঘটনা দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি এবং উগ্রপন্থা দমনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

এআই খাতের স্বর্ণযুগ কি শেষ?

স্বর্গের লোভ দেখিয়ে অনাহারে শিশুদের হত্যা, ধর্মগুরুর ২০০ বছরের সাজা

আপডেট সময় ১০:১৪:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

ধর্মীয় চরমপন্থায় প্ররোচিত করে যিশুর সঙ্গে সাক্ষাতের আশ্বাসে নিজের অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার বহুল আলোচিত মামলায় কেনিয়ার ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার দায়ে তার ২৮ জন সহযোগীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশটির উপকূলীয় শহর মোম্বাসার হাইকোর্টের বিচারক ডায়ানা কাবেদজা-মোচাচে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের নথিতে বলা হয়, পল ম্যাকেঞ্জি তার অনুসারীদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে চরম অনাহারে দিন কাটালে তারা সরাসরি যিশুর দেখা পাবেন। তার অন্ধ নির্দেশে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু আহার এবং পানি গ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। ফলে ১৯০টি নিষ্পাপ শিশু ও একজন প্রাপ্তবয়স্কসহ মোট ১৯১ জন মারা যান। ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদনে আদালত উল্লেখ করেন, নিহতদের মধ্যে ১৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে তীব্র অনাহার ও অপুষ্টিতে এবং বাকি আটজনকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছিল।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক দুটি পৃথক ধারায় ম্যাকেঞ্জিকে ১০০ বছর করে মোট ২০০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন। অন্যদিকে, অপরাধে সহায়তা করার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে তার ২৮ সহযোগীকে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৬০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের জোর দাবি জানিয়েছিল। তবে বিচারক সেই আবেদন খারিজ করে দেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক ডায়ানা কাবেদজা উল্লেখ করেন, এই গোষ্ঠীর বিকৃত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী শারীরিক মৃত্যুকে মূলত ‘স্বর্গে যাওয়ার পথ’ বলে মনে করা হতো। ফলে তাদের কাছে মৃত্যুদণ্ড কোনো শাস্তি নয়, বরং একটি ঐশ্বরিক ‘পুরস্কার’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—সেই যুক্তি থেকেই ম্যাকেঞ্জিকে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন ম্যাকেঞ্জির আইনজীবী। তবে এতেই তার আইনি সংকট কাটছে না; কারণ শাকাহোলা বনাঞ্চলে আরও শতাধিক অনুসারীর মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও পরিকল্পিত হত্যাসহ একাধিক পৃথক মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে কেনিয়ার উপকূলীয় কিলিফি কাউন্টির দুর্গম শাকাহোলা বনাঞ্চলে একাধিক গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর এই নারকীয় ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ওই জঙ্গল থেকে চার শতাধিক কঙ্কাল ও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, যার অনেকের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। কেনিয়ার আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই গণমৃত্যুর ঘটনা দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি এবং উগ্রপন্থা দমনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ