ঢাকা ০৫:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ত্রুটি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন Logo ব্যাটিং বিভিষিকায় বাংলাদেশের আকাশে কালো মেঘ Logo রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু Logo টানা তৃতীয় দিন আলোকস্বল্পতায় খেলা আগেভাগে শেষ Logo ‘দুধের মতো ফর্সা শরীর’, অভিনেতার মন্তব্যে তামান্নার জবাব Logo কুমিল্লায় লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল ব্র্যাক কর্মকর্তার Logo মুখে কথা নয়, চিন্তা দিয়েই প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রযুক্তি আনছে নিউরালিংক Logo গভীর রাতে পার্সেলে আনা হলো ২৮ কেজি গাঁজা, যুবক গ্রেপ্তার Logo অধিকারবঞ্চিত শিশুদের মূলধারায় পুনর্বাসনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : সমাজকল্যাণমন্ত্রী Logo চুয়াডাঙ্গায় ভারতীয় সীমান্তে রাসেল ভাইপার উদ্ধার

মোবাইলে টুজি বন্ধের পরিকল্পনা, চাপে দেশীয় শিল্প

দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও ফোরজি প্রযুক্তির বিস্তার বাড়াতে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ছয় কোটি বাটন ফোন ব্যবহারকারীকে বিকল্প প্রযুক্তির হ্যান্ডসেটে যেতে হবে।

কিন্তু এক হাজার টাকারও কম দামের ফোন ব্যবহারকারী নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে কয়েক গুণ বেশি দামে নতুন ফোন কেনা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনশিল্প, কর্মসংস্থান এবং সাশ্রয়ী ফোনের বাজার।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। টুজি নেটওয়ার্কের জন্য ব্যবহৃত তরঙ্গ ফোরজি প্রযুক্তিতে কাজে লাগানো গেলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা ও তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়তে পারে।

তবে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের সামর্থ্য, বিকল্প ফোনের প্রাপ্যতা এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনা না করে দ্রুত এই রূপান্তর ঘটানো হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিরুপ হতে পারে।

তাই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু নেটওয়ার্কের সক্ষমতা নয়, ব্যবহারকারীদের বিকল্প প্রযুক্তিতে যাওয়ার প্রস্তুতিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ গ্রাহকের হাতে সাশ্রয়ী ফোন পৌঁছানো, নেটওয়ার্কের মান নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত সময় দেওয়া ছাড়া নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম নয়; বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে এটি দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান অবলম্বন।

বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, বয়স্ক মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমজীবী এবং নিম্নআয়ের পরিবারের অনেক সদস্য সাধারণ বাটন ফোনের ওপর নির্ভরশীল। এসব ফোনে কথা বলা ও খুদে বার্তা পাঠানোর সুবিধাই তাদের প্রধান প্রয়োজন। কম দাম, সহজ ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির কারণে স্মার্টফোনের বিস্তার সত্ত্বেও বাটন ফোনের চাহিদা রয়ে গেছে। অনেক ব্যবহারকারীর জন্য স্মার্টফোনের অতিরিক্ত সুবিধার চেয়ে কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারে একটি সাধারণ টুজি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা।

অন্যদিকে, ফোরজি-সমর্থিত ফিচার ফোনের দাম প্রায় তিন হাজার টাকা থেকে শুরু। আর স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে ব্যয় আরো বেশি। ফলে টুজি ফোন বন্ধ হলে শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তন নয়, গ্রাহকের জন্য নতুন করে অর্থ ব্যয়ের চাপও তৈরি হবে।

যারা বর্তমানে এক হাজার টাকার কম দামে ফোন ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করে নতুন হ্যান্ডসেট কেনা সহজ নয়। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক শুধু ফোনকল ও খুদে বার্তার জন্য মোবাইল ব্যবহার করেন, তাদের কাছে ব্যয়বহুল স্মার্টফোন কেনার প্রয়োজনীয়তাও কম। তাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত না করে টুজি সেবা বন্ধ করা হলে এক্ষেত্রে বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

বিটিআরসির অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত কর্মশালায় টুজি ব্যবহার কমানো ও নেটওয়ার্ক বন্ধের জন্য তিনটি কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে আগ্রাসী কৌশলে প্রতিবছর ১৫ শতাংশ হারে টুজি ব্যবহার কমিয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে সেবা বন্ধের প্রস্তাব রয়েছে। মধ্যম কৌশলে প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে ব্যবহার কমিয়ে ২০৩০ সালে এবং নমনীয় কৌশলে প্রতিবছর ৭.৫ শতাংশ হারে কমিয়ে ২০৩১ সালে টুজি বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত রোডম্যাপে নতুন টুজি ফোনের মডেল অনুমোদন বন্ধ, উৎপাদন ও বিক্রি সীমিত করা এবং পরবর্তী সময়ে নেটওয়ার্ক বন্ধের প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের চূড়ান্ত সময়সীমা ও বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু গ্রাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান। দেশে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের একটি বড় অংশ এখনো টুজি ফিচার ফোন। এসব ফোনের বাজার সংকুচিত হলে স্থানীয় উৎপাদকদের উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ফোরজি ফিচার ফোন বাজারে এনেছে। কিন্তু দাম ও গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধানের কারণে এসব ফোনের বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্প্রসারিত হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যছাড় দিয়েও অবিক্রীত ফোনের মজুত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় টুজি ফোনের উৎপাদন ও বিক্রি দ্রুত বন্ধ করে দিলে বাজারে সাশ্রয়ী বিকল্পের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

বৈধ উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও চাহিদা থেকে গেলে অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ পথে ফোন বাজারজাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এতে রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদকদের সঙ্গে অবৈধ বাজারের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশীয় উৎপাদনশিল্পকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ফোরজি ফিচার ফোনের উৎপাদন বাড়ানো, যন্ত্রাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্রেতাদের জন্য দাম সহনীয় রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন। টুজি থেকে ফোরজিতে রূপান্তরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত মধ্যবর্তী সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ সময়ে গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী ফোনের সরবরাহ বাড়ানো, স্থানীয় উৎপাদকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বিকল্প ফোন কেনার আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি হলেও দরিদ্র মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। তাই টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের ক্ষেত্রে আরো সময় দেওয়া প্রয়োজন। দরিদ্র জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে টুজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্ক করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে, সেটাই তাদের উদ্বেগের বিষয় বলে জানান তিনি।

এই প্রেক্ষাপটে টেলিকম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টুজি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, নিম্নআয়ের গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী ফোরজি ফিচার ফোনের সরবরাহ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগ, স্বল্পসুদের ঋণ কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, দেশীয় উৎপাদকদের নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।

পাশাপাশি, একযোগে সারা দেশে নেটওয়ার্ক বন্ধ না করে পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। যেসব এলাকায় ফোরজি কাভারেজ দুর্বল, সেখানে সেবা নিশ্চিত না করে টুজি বন্ধ না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় গ্রাহক ও দেশীয় শিল্পের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করা। বিশেষ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং গ্রাহকদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা আগেভাগে স্পষ্ট করা গেলে অনিশ্চয়তা কমবে বলে মনে করেন তারা।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ত্রুটি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন

মোবাইলে টুজি বন্ধের পরিকল্পনা, চাপে দেশীয় শিল্প

আপডেট সময় ০৪:৫৮:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও ফোরজি প্রযুক্তির বিস্তার বাড়াতে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ছয় কোটি বাটন ফোন ব্যবহারকারীকে বিকল্প প্রযুক্তির হ্যান্ডসেটে যেতে হবে।

কিন্তু এক হাজার টাকারও কম দামের ফোন ব্যবহারকারী নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে কয়েক গুণ বেশি দামে নতুন ফোন কেনা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনশিল্প, কর্মসংস্থান এবং সাশ্রয়ী ফোনের বাজার।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। টুজি নেটওয়ার্কের জন্য ব্যবহৃত তরঙ্গ ফোরজি প্রযুক্তিতে কাজে লাগানো গেলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা ও তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়তে পারে।

তবে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের সামর্থ্য, বিকল্প ফোনের প্রাপ্যতা এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনা না করে দ্রুত এই রূপান্তর ঘটানো হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিরুপ হতে পারে।

তাই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু নেটওয়ার্কের সক্ষমতা নয়, ব্যবহারকারীদের বিকল্প প্রযুক্তিতে যাওয়ার প্রস্তুতিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ গ্রাহকের হাতে সাশ্রয়ী ফোন পৌঁছানো, নেটওয়ার্কের মান নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত সময় দেওয়া ছাড়া নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম নয়; বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে এটি দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান অবলম্বন।

বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, বয়স্ক মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমজীবী এবং নিম্নআয়ের পরিবারের অনেক সদস্য সাধারণ বাটন ফোনের ওপর নির্ভরশীল। এসব ফোনে কথা বলা ও খুদে বার্তা পাঠানোর সুবিধাই তাদের প্রধান প্রয়োজন। কম দাম, সহজ ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির কারণে স্মার্টফোনের বিস্তার সত্ত্বেও বাটন ফোনের চাহিদা রয়ে গেছে। অনেক ব্যবহারকারীর জন্য স্মার্টফোনের অতিরিক্ত সুবিধার চেয়ে কম খরচে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারে একটি সাধারণ টুজি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা।

অন্যদিকে, ফোরজি-সমর্থিত ফিচার ফোনের দাম প্রায় তিন হাজার টাকা থেকে শুরু। আর স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে ব্যয় আরো বেশি। ফলে টুজি ফোন বন্ধ হলে শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তন নয়, গ্রাহকের জন্য নতুন করে অর্থ ব্যয়ের চাপও তৈরি হবে।

যারা বর্তমানে এক হাজার টাকার কম দামে ফোন ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করে নতুন হ্যান্ডসেট কেনা সহজ নয়। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক শুধু ফোনকল ও খুদে বার্তার জন্য মোবাইল ব্যবহার করেন, তাদের কাছে ব্যয়বহুল স্মার্টফোন কেনার প্রয়োজনীয়তাও কম। তাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত না করে টুজি সেবা বন্ধ করা হলে এক্ষেত্রে বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

বিটিআরসির অংশীজনদের নিয়ে আয়োজিত কর্মশালায় টুজি ব্যবহার কমানো ও নেটওয়ার্ক বন্ধের জন্য তিনটি কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে আগ্রাসী কৌশলে প্রতিবছর ১৫ শতাংশ হারে টুজি ব্যবহার কমিয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে সেবা বন্ধের প্রস্তাব রয়েছে। মধ্যম কৌশলে প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে ব্যবহার কমিয়ে ২০৩০ সালে এবং নমনীয় কৌশলে প্রতিবছর ৭.৫ শতাংশ হারে কমিয়ে ২০৩১ সালে টুজি বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত রোডম্যাপে নতুন টুজি ফোনের মডেল অনুমোদন বন্ধ, উৎপাদন ও বিক্রি সীমিত করা এবং পরবর্তী সময়ে নেটওয়ার্ক বন্ধের প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের চূড়ান্ত সময়সীমা ও বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু গ্রাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান। দেশে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের একটি বড় অংশ এখনো টুজি ফিচার ফোন। এসব ফোনের বাজার সংকুচিত হলে স্থানীয় উৎপাদকদের উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ফোরজি ফিচার ফোন বাজারে এনেছে। কিন্তু দাম ও গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধানের কারণে এসব ফোনের বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্প্রসারিত হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্যছাড় দিয়েও অবিক্রীত ফোনের মজুত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় টুজি ফোনের উৎপাদন ও বিক্রি দ্রুত বন্ধ করে দিলে বাজারে সাশ্রয়ী বিকল্পের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

বৈধ উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ার পরও চাহিদা থেকে গেলে অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ পথে ফোন বাজারজাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এতে রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদকদের সঙ্গে অবৈধ বাজারের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশীয় উৎপাদনশিল্পকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ফোরজি ফিচার ফোনের উৎপাদন বাড়ানো, যন্ত্রাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্রেতাদের জন্য দাম সহনীয় রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন। টুজি থেকে ফোরজিতে রূপান্তরের জন্য একটি বাস্তবসম্মত মধ্যবর্তী সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ সময়ে গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী ফোনের সরবরাহ বাড়ানো, স্থানীয় উৎপাদকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বিকল্প ফোন কেনার আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি হলেও দরিদ্র মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। তাই টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের ক্ষেত্রে আরো সময় দেওয়া প্রয়োজন। দরিদ্র জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে টুজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্ক করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে, সেটাই তাদের উদ্বেগের বিষয় বলে জানান তিনি।

এই প্রেক্ষাপটে টেলিকম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টুজি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, নিম্নআয়ের গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী ফোরজি ফিচার ফোনের সরবরাহ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগ, স্বল্পসুদের ঋণ কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, দেশীয় উৎপাদকদের নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।

পাশাপাশি, একযোগে সারা দেশে নেটওয়ার্ক বন্ধ না করে পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। যেসব এলাকায় ফোরজি কাভারেজ দুর্বল, সেখানে সেবা নিশ্চিত না করে টুজি বন্ধ না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় গ্রাহক ও দেশীয় শিল্পের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করা। বিশেষ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং গ্রাহকদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা আগেভাগে স্পষ্ট করা গেলে অনিশ্চয়তা কমবে বলে মনে করেন তারা।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ