ঢাকা ০৭:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo স্ত্রীকে নিয়ে টয়োটার প্রথম প্রাইভেটকারে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান Logo হামলার ক্ষণ গুনছে যুক্তরাষ্ট্র, শেষ মুহূর্তে ইরানকে চিঠি ভ্যান্সের Logo নেতৃত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, মেনে নেন— জামায়াতকে আম্মার Logo বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ Logo কাঁধের হাড় সরে যাওয়া বায়ার্ন মিউনিখ কোচ এখন কেমন আছেন Logo ‘ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনাটি যদি আরেকটু পরে ঘটত…’ Logo প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ Logo লাল কার্ড দেখার পর প্রতিপক্ষকে আঘাত করায় ৬ মাস নিষিদ্ধ Logo হরমুজে মাইন বিস্ফোরণে তিন ট্যাংকারে আগুন Logo ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা, গেজেট প্রকাশ করল সরকার

জাপানের সঙ্গে অংশীদারিতে শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সফরের সাফল্য শুধু যৌথ ঘোষণা, সমঝোতা স্মারক কিংবা আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অর্জন, কৌশলগত সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হলো- তার ভিত্তিতে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা প্রয়োজন। টোকিওতে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩৩ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা নিঃসন্দেহে বড় সংবাদ। তবে এই সফরের গুরুত্ব কেবল বিনিয়োগের অঙ্কে নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্মাণের সম্ভাবনার মধ্যেই নিহিত।

জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত উন্নয়ন অংশীদার। স্বাধীনতার পর থেকে অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশটির অবদান উল্লেখযোগ্য। মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী এবং বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো বৃহৎ প্রকল্পে জাপানের অংশগ্রহণ সেই সম্পর্কের দৃশ্যমান প্রমাণ। কিন্তু এবারের সফরে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে।

এতদিন সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি ছিল উন্নয়ন সহযোগিতা। এখন সেই সম্পর্ক উৎপাদন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের দিকে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নয়, সম্ভাব্য পূর্বাভাস।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এর অর্থ, জাপানি বিনিয়োগকারীরা সম্ভাবনা দেখছেন, কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তাও চাইছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, স্বচ্ছ করব্যবস্থা, দ্রুত শুল্ক ছাড়করণ এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা ছাড়া বড় বিনিয়োগ আসবে না। ফলে টোকিওর আশ্বাস বাস্তবায়নের প্রথম দায়িত্ব ঢাকার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা রপ্তানি আয়ের সীমিত ভিত্তি। তৈরি পোশাকশিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও একটি খাতের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, প্রকৌশলপণ্য ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। জাপানের উৎপাদনব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পণ্যের গুণগত মান। বাংলাদেশ এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে শুধু রপ্তানি নয়, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতাও বাড়বে।

কৃষি ও খাদ্যশিল্পে জাপানের আগ্রহও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে এখনো বড় দুর্বলতা রয়েছে। জাপানের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, শীতল সংরক্ষণব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও একই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ যেন শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারলেই প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।

ওষুধশিল্প বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর অন্যতম। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। কিন্তু উচ্চমানের কাঁচামাল, উন্নত গবেষণা, জটিল ওষুধ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন। জাপানের প্রযুক্তি ও গবেষণাগত সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন দক্ষতার সমন্বয় ঘটলে এই খাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও অটোমেশনে সহযোগিতা বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি বা ইপিএ দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকার। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। জাপানের সঙ্গে ইপিএ কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে চুক্তির সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।

এই সফরের একটি সুদূরপ্রসারী দিক মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিআইজি-বি উদ্যোগ। মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেবে না, এর সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, সড়ক, রেল ও জ্বালানি অবকাঠামো যুক্ত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিষয়টির ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ক্রমেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। জাপানের মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগস্বার্থের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান গভীরভাবে সম্পর্কিত। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করলেও তা যেন কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি পক্ষ নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না করে। চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

এই প্রেক্ষাপটে সমুদ্র নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং উপকূলীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে জাপানের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণেও সহায়ক হতে পারে।

জাপানে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। জাপানের জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকসংকট বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণ পরিচর্যা, নির্মাণ, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত মান অর্জন ছাড়া এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা।

এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের জন্য এই সফর আন্তর্জাতিক পরিসরে তার সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন শুধু অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করে না; সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের ওপরও নির্ভর করে। ফলে জাপানের বিনিয়োগ আগ্রহকে সরকারের প্রতি আস্থার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা গেলেও তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান দূর করা। যৌথ ঘোষণায় করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ, লাইসেন্স প্রদান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সফরের আগেই সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্প, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক সহায়তার একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতিটি সমঝোতা ও বিনিয়োগ উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর তাই শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আয়োজন নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষিত সম্ভাবনা আর বাস্তবে অর্জিত সাফল্য এক বিষয় নয়। টোকিওতে যে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, তাকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রূপান্তর করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সফরের সাফল্য নির্ধারিত হবে কতগুলো সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কত বিনিয়োগ বাস্তবে এল, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হলো, তার ভিত্তিতে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

স্ত্রীকে নিয়ে টয়োটার প্রথম প্রাইভেটকারে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাপানের সঙ্গে অংশীদারিতে শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা

আপডেট সময় ০৫:৫৬:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সফরের সাফল্য শুধু যৌথ ঘোষণা, সমঝোতা স্মারক কিংবা আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অর্জন, কৌশলগত সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হলো- তার ভিত্তিতে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা প্রয়োজন। টোকিওতে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬৩৩ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা নিঃসন্দেহে বড় সংবাদ। তবে এই সফরের গুরুত্ব কেবল বিনিয়োগের অঙ্কে নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্মাণের সম্ভাবনার মধ্যেই নিহিত।

জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত উন্নয়ন অংশীদার। স্বাধীনতার পর থেকে অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশটির অবদান উল্লেখযোগ্য। মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী এবং বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো বৃহৎ প্রকল্পে জাপানের অংশগ্রহণ সেই সম্পর্কের দৃশ্যমান প্রমাণ। কিন্তু এবারের সফরে একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে।

এতদিন সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি ছিল উন্নয়ন সহযোগিতা। এখন সেই সম্পর্ক উৎপাদন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের দিকে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নয়, সম্ভাব্য পূর্বাভাস।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এর অর্থ, জাপানি বিনিয়োগকারীরা সম্ভাবনা দেখছেন, কিন্তু বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তাও চাইছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, স্বচ্ছ করব্যবস্থা, দ্রুত শুল্ক ছাড়করণ এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা ছাড়া বড় বিনিয়োগ আসবে না। ফলে টোকিওর আশ্বাস বাস্তবায়নের প্রথম দায়িত্ব ঢাকার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা রপ্তানি আয়ের সীমিত ভিত্তি। তৈরি পোশাকশিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও একটি খাতের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, প্রকৌশলপণ্য ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। জাপানের উৎপাদনব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পণ্যের গুণগত মান। বাংলাদেশ এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে শুধু রপ্তানি নয়, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতাও বাড়বে।

কৃষি ও খাদ্যশিল্পে জাপানের আগ্রহও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে এখনো বড় দুর্বলতা রয়েছে। জাপানের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, শীতল সংরক্ষণব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও একই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ যেন শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারলেই প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।

ওষুধশিল্প বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর অন্যতম। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। কিন্তু উচ্চমানের কাঁচামাল, উন্নত গবেষণা, জটিল ওষুধ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন। জাপানের প্রযুক্তি ও গবেষণাগত সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন দক্ষতার সমন্বয় ঘটলে এই খাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও অটোমেশনে সহযোগিতা বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি বা ইপিএ দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকার। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। জাপানের সঙ্গে ইপিএ কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে চুক্তির সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।

এই সফরের একটি সুদূরপ্রসারী দিক মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিআইজি-বি উদ্যোগ। মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেবে না, এর সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, সড়ক, রেল ও জ্বালানি অবকাঠামো যুক্ত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিষয়টির ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ক্রমেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। জাপানের মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগস্বার্থের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান গভীরভাবে সম্পর্কিত। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করলেও তা যেন কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি পক্ষ নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না করে। চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

এই প্রেক্ষাপটে সমুদ্র নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং উপকূলীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে জাপানের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর চেষ্টা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণেও সহায়ক হতে পারে।

জাপানে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। জাপানের জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকসংকট বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণ পরিচর্যা, নির্মাণ, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত মান অর্জন ছাড়া এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা।

এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের জন্য এই সফর আন্তর্জাতিক পরিসরে তার সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন শুধু অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করে না; সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসনের ওপরও নির্ভর করে। ফলে জাপানের বিনিয়োগ আগ্রহকে সরকারের প্রতি আস্থার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা গেলেও তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান দূর করা। যৌথ ঘোষণায় করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ, লাইসেন্স প্রদান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সফরের আগেই সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্প, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক সহায়তার একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতিটি সমঝোতা ও বিনিয়োগ উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর তাই শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আয়োজন নয়; বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘোষিত সম্ভাবনা আর বাস্তবে অর্জিত সাফল্য এক বিষয় নয়। টোকিওতে যে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে, তাকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রূপান্তর করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সফরের সাফল্য নির্ধারিত হবে কতগুলো সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কত বিনিয়োগ বাস্তবে এল, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হলো, তার ভিত্তিতে।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ