ব্যথা সবার জন্যই কষ্টকর। তবে ব্যথার অনুভূতি কি আশপাশের মানুষের আচরণ বা পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে? সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী পরীক্ষক শারীরিক ব্যথা সৃষ্টি করলে পুরুষেরা তুলনামূলক কম ব্যথা অনুভব করেন। এমনকি অস্ত্রোপচারের পর নারী গবেষক ব্যথার কথা জানতে চাইলে পুরুষ রোগীরাও তুলনামূলক কম ব্যথার কথা জানান।
গবেষকেরা বলছেন, নারী ও পুরুষ পরীক্ষক একই ধরনের পোশাক পরেছিলেন এবং একই কথা বলেছিলেন। তারপরও পরীক্ষকের লিঙ্গের সঙ্গে ব্যথার অনুভূতিতে পার্থক্য দেখা গেছে।
পরীক্ষায় মিলল চমকপ্রদ ফল
গবেষণার প্রথম ধাপে সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের পায়ের পাতার ওপরের অংশে লেজারের সংক্ষিপ্ত স্পন্দন প্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যথার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্নায়ুতন্তুর সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এ সময় গবেষকেরা লক্ষ করেন, কোনো পুরুষ অংশগ্রহণকারীর শরীরে ব্যথা সৃষ্টি করার দায়িত্বে নারী থাকলে একই মাত্রার ব্যথা অনুভব করাতে তুলনামূলক বেশি তীব্র উদ্দীপনা প্রয়োগ করতে হতো।
এই ফলাফল থেকে উৎসাহ পেয়ে গবেষকেরা পরবর্তী পরীক্ষায় নারী ও পুরুষ পরীক্ষকের উপস্থিতিতে ব্যথার অনুভূতি তুলনা করেন।
এবার অংশগ্রহণকারীদের হাতে একটি ছোট যন্ত্র দেওয়া হয়। বোতাম চাপলে যন্ত্রটি মৃদু বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করত। ব্যথা অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বোতাম ছেড়ে দিতে বলা হয়। পরীক্ষাটি দুইবার করা হয়—একবার নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে, অন্যবার পুরুষ পরীক্ষকের উপস্থিতিতে।
পরীক্ষার ফলেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। নারী ও পুরুষ উভয় অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রেই নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে একই মাত্রার ব্যথা অনুভব করাতে বেশি তীব্র উদ্দীপনা প্রয়োজন হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পরও দেখা গেল পার্থক্য
শুধু পরীক্ষাগারে নয়, বাস্তব চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য দেখা যায় কি না, তা জানতে গবেষকেরা অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠছেন এমন রোগীদের নিয়ে আরেকটি গবেষণা করেন।
সুইডেনের স্কোনে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের অস্ত্রোপচার-পরবর্তী তিনটি ওয়ার্ডের মোট ২৪৫ জন রোগীর ওপর জরিপ চালানো হয়। অস্ত্রোপচারের অল্প সময় পর একজন নারী ও একজন পুরুষ গবেষক রোগীদের ব্যথার বিষয়ে জানতে চান।
এ ক্ষেত্রেও আগের ফলাফলের কিছুটা সমর্থন পাওয়া যায়। পুরুষ রোগীরা নারী গবেষকের কাছে ব্যথার কথা জানালে তাদের ব্যথার অনুভূতি তুলনামূলক কম ছিল। তবে নারী রোগীদের ক্ষেত্রে এমন পার্থক্য দেখা যায়নি।
গবেষকেরা জানান, সামগ্রিকভাবে পার্থক্যটি খুব বেশি ছিল না। তবে ব্যক্তিগত রোগীর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব থাকতে পারে। বিশেষ করে, ব্যথা এত বেশি হলে যে রোগী নিজেই ব্যথানাশক ওষুধ চাইতে শুরু করেন, তখন এই পার্থক্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
কেন এমন হয়, নিশ্চিত নন গবেষকেরা
আগের কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীদের সহমর্মিতা প্রকাশের ধরন তুলনামূলক আলাদা হতে পারে। বেশি হাসি বা সরাসরি চোখের দিকে তাকানোর মতো নীরব যোগাযোগের আচরণও এতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বর্তমান গবেষণায় দেখা পার্থক্যের পেছনে এসব কারণ কাজ করেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং অবেদনবিদ্যা ও নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের পরামর্শক আনা সেলগ্রেন ইংস্কভ বলেন, পরীক্ষায় নারী ও পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেই নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে একই মাত্রার ব্যথা অনুভব করাতে বেশি তীব্র উদ্দীপনা প্রয়োজন হয়েছে।
গবেষণাটির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক এবং মালমোর এসইউএস হাসপাতালের অবেদনবিদ্যা ও নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপক ইয়োনাস ওকেসন বলেন, সুস্থ ব্যক্তিদের ওপর পরীক্ষামূলক গবেষণা এবং অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের নিয়ে করা চিকিৎসাভিত্তিক গবেষণা—উভয় ক্ষেত্রেই এমন ফলাফলের পক্ষে এটি প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ।
তার মতে, ব্যথা মূল্যায়নের সময় এ ধরনের পার্থক্য বিবেচনায় নিলে ভবিষ্যতে রোগীদের আরও উন্নত সেবা দেওয়া এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ‘ব্যথার অনুভূতি: ব্যথা সৃষ্টি, মূল্যায়ন ও লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’। গবেষণার ফলাফল ব্যথা সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি ও তা প্রকাশের ধরন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। তবে কেন এমন পার্থক্য দেখা যায়, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস





























