ঢাকা ০১:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগুনে পুড়ল ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল

ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ এবং ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক সোয়া ২টার দিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

আগুনে সিনেমা হলটিসহ এর আশপাশের ডেকোরেশন সামগ্রীর দোকান, পুরনো কাপড়ের দোকান এবং একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গুদামসহ অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে হঠাৎ সিনেমা হলের দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো শোল কাঠের তৈরি ঐতিহাসিক মঞ্চ কাঠামোকে গ্রাস করে ফেলে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ময়মনসিংহ ও স্থানীয় ৪টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, প্রাথমিকভাবে এলপিজি সিলিন্ডারের গোডাউন থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তদন্ত সাপেক্ষে পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।

ধ্বংসের স্তূপে বিংশ শতাব্দীর এক নান্দনিক শিল্পকর্ম

এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে শুধু কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, বরং চিরতরে হারিয়ে গেল ময়মনসিংহের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। বিংশ শতাব্দীর ৩০-এর দশকে এই অনিন্দ্যসুন্দর নাট্যমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গৌরীপুর রাজবাড়ীর পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে, প্রখ্যাত সঙ্গীত ও নাট্যপ্রীতিতে অনন্য ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী।

কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘স্টার থিয়েটার’-এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও কাঠের নান্দনিক কাঠামো বীরেন্দ্র কিশোরকে মুগ্ধ করেছিল। সেই অনুকরণেই তিনি নিজ জন্মভূমি গৌরীপুরে শোল কাঠ দিয়ে এই নয়নাভিরাম থিয়েটার হলটি গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার পর ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়নের মাধ্যমে এই হলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। একসময় দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় মুখরিত থাকত এই নাট্যমঞ্চ।

নাট্যমঞ্চ থেকে সিনেমা হল

পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এটি সরকারি মালিকানায় হস্তান্তরিত হয়।

এরপর চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে বিনোদনের প্রসারে হলটি লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এটি স্থানীয়ভাবে ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রতিমা সিনেমা হল’। আর সর্বশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে নতুন প্রজন্মের কাছে বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্থানীয়দের দাবি ও ক্ষোভ

ঐতিহাসিক এই প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসন ও প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের দাবি, অনতিবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হোক।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। কেন কিভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।’

প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে কে ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর আগে এটি লিজে ছিল। দীর্ঘদিন হলেও প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না থাকায় লিজধারীকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন সব কিছুই খোঁজ নেওয়া হবে।’

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

আগুনে পুড়ল ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল

আপডেট সময় ১২:৫৪:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ এবং ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক সোয়া ২টার দিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

আগুনে সিনেমা হলটিসহ এর আশপাশের ডেকোরেশন সামগ্রীর দোকান, পুরনো কাপড়ের দোকান এবং একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গুদামসহ অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে হঠাৎ সিনেমা হলের দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো শোল কাঠের তৈরি ঐতিহাসিক মঞ্চ কাঠামোকে গ্রাস করে ফেলে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ময়মনসিংহ ও স্থানীয় ৪টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, প্রাথমিকভাবে এলপিজি সিলিন্ডারের গোডাউন থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তদন্ত সাপেক্ষে পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।

ধ্বংসের স্তূপে বিংশ শতাব্দীর এক নান্দনিক শিল্পকর্ম

এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে শুধু কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিই হয়নি, বরং চিরতরে হারিয়ে গেল ময়মনসিংহের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। বিংশ শতাব্দীর ৩০-এর দশকে এই অনিন্দ্যসুন্দর নাট্যমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গৌরীপুর রাজবাড়ীর পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে, প্রখ্যাত সঙ্গীত ও নাট্যপ্রীতিতে অনন্য ব্যক্তিত্ব বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী।

কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘স্টার থিয়েটার’-এর অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও কাঠের নান্দনিক কাঠামো বীরেন্দ্র কিশোরকে মুগ্ধ করেছিল। সেই অনুকরণেই তিনি নিজ জন্মভূমি গৌরীপুরে শোল কাঠ দিয়ে এই নয়নাভিরাম থিয়েটার হলটি গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার পর ঐতিহাসিক ‘শাহজাহান’ নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়নের মাধ্যমে এই হলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। একসময় দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা শিল্পী ও গুণীজনদের পদচারণায় মুখরিত থাকত এই নাট্যমঞ্চ।

নাট্যমঞ্চ থেকে সিনেমা হল

পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এটি সরকারি মালিকানায় হস্তান্তরিত হয়।

এরপর চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে বিনোদনের প্রসারে হলটি লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথম দিকে এটি স্থানীয়ভাবে ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রতিমা সিনেমা হল’। আর সর্বশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে নতুন প্রজন্মের কাছে বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্থানীয়দের দাবি ও ক্ষোভ

ঐতিহাসিক এই প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসন ও প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের দাবি, অনতিবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হোক।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। কেন কিভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।’

প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে কে ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর আগে এটি লিজে ছিল। দীর্ঘদিন হলেও প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না থাকায় লিজধারীকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন সব কিছুই খোঁজ নেওয়া হবে।’

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ