দেবীকে সাজাতে ব্যস্ত শিল্পীরা। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আলোকসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত ডেকোরেটর কর্মচারীরা। কাজের ব্যস্ততায় দিন-রাত একাকার তাদের।
মাঝে সময় মাত্র দুই দিন।
তারপর মহালয়া। ঘোড়ায় চড়ে স্বপরিবারে মর্ত্যে আসছেন দুর্গা। তাঁর আগমনে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাচ্ছে শিল্পী-কারিগররা।
দুর্গাপূজায় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন মণ্ডপে এবারের আয়োজন ব্যতিক্রমী।
মাটির প্রতিমায় দর্শনার্থীদের মন ভরাতে ৭০ বছরের ঐতিহ্যে এবার এসেছে নতুনত্ব। দুর্গা প্রতিমায় সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৫ হাজার মুক্তা। এক কথায় মুক্তায় সেজেছে দুর্গা।
প্রতিমার শরীরে মাটির প্রলেপ, তার ওপর রঙের টান। এরপর একে একে বসানো হচ্ছে হাজার হাজার মুক্তা।
আলো পড়তেই প্রতিমার শরীরজুড়ে ফুটছে ঝিকিমিকি আভা।
পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও বাকি। অথচ ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে এরই মধ্যে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে এমনই নান্দনিক আয়োজন চলছে উপজেলার বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত মন্দিরটিতে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মুক্তা বসানোর কাজ শেষ। প্রতিমাকে আরো আকর্ষণীয় করতে রং-তুলির শেষ টান বাকি। প্যান্ডেল তৈরিতে ব্যস্ত ডেকরেটর শ্রমিকরা।
আয়োজকরা জানান, মণ্ডপের ১৩টি প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা। এজন্য ব্যয় হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা।
আয়োজকদের মধ্যে বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উত্তম মণ্ডল জানান, এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণই হচ্ছে মুক্তার কারুকার্য। প্রচলিত সাজসজ্জার বাইরে গিয়ে গড়া হচ্ছে দেবদেবীর ১৩ প্রতিমা। প্রতিমার শরীর, অলংকারসহ বিভিন্ন অংশে মুক্তার ব্যবহার করা হয়েছে।
উপজেলার দক্ষিণ বড়দল গ্রামের নির্মল মণ্ডলের ছেলে প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল গত ৫ জুলাই শুরু করেন প্রতিমা গড়ার কাজ। প্রায় আড়াই মাস ধরে চারজন শিল্পী ধাপে ধাপে করছেন কাঠামো নির্মাণ, মাটির কাজ, অবয়ব, রং, সাজসজ্জা আর মুক্তার বসানোর কাজ।
প্রকাশ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করি। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশা ও নিজের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমার নকশা করেছি। মুক্তার কাজ খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লেগেছে।
প্রকাশ জানান, চারজন শিল্পীর ৫২ দিন সময় লেগেছে। ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই বাকি কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বৃদ্ধ কৃষ্ণপদ মণ্ডল বলেন, ‘৭০ বছর আগে ওয়াল্ড ভিশনের স্কুলেই স্থানীয় নারায়ন সরকার,কমলেশ সরকারসহ কয়েকজন মিলে দুর্গা পুজা শুরু করেন। জায়গা সংকট মেটাতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সহযোগিতার হাত বাড়ান।’ তিনি বলেন, ‘কপোতাক্ষ নদের তীরে বুড়িয়া মন্দিরের মণ্ডপে মুক্তা দিয়ে গড়া দুর্গা এবার দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ।’
বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। প্রতিবারই ঐতিহ্য ধরে রেখে নতুন কিছু করার চেষ্টা করি।’ তিনি বলেন, ‘এবার মুক্তার কারুকার্যের মাধ্যমে প্রতিমায় ভিন্নতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা যেন ম-পে এসে নতুনত্ব অনুভব করেন, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
কমিটির সভাপতি আরো বলেন, ‘দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বিবেচনায় শুরু থেকেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপে সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিমা দেখতে পূজার আগেই অনেকে মণ্ডপে আসছেন। এবারের আয়োজন নিয়ে মানুষের আগ্রহে আমরা আনন্দিত।’ তিনি বলেন, ‘পূজার পাঁচ দিন যাতে সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে কাটে, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
আয়োজকরা জানান, ১৭ অক্টোবর ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন থাকবে।
এদিকে, বড়দল ইউনিয়নে বিজয়া দশমীর দিন থাকছে আরো একটি বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলার মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হবে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়া এলাকার মণ্ডপের প্রতিমা এ আয়োজনে অংশ নেবে।
আশাশুনী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহেদুর রহমান জানান, পুজা চলাকালিন ও প্রতিমা বিসর্জন শেষে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ সতর্ক নজর রাখবে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ






















