ভোটের রাজনীতিতে পথচলা খুব বেশি দিনের নয়। মাত্র দুই বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ক্যামডেনের নর্থ ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকারে যাত্রা শুরু করেছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এলিজা রহমান।
এবার সেই কাউন্সিলেরই নেতৃত্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে উঠলেন তিনি। কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ক্যামডেনের ডেপুটি মেয়র। তার ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি নারীর প্রতিনিধিত্বে যোগ হলো নতুন এক অধ্যায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো নারী দেশটির স্থানীয় কাউন্সিলে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্বে আসার ঘটনা এটিই প্রথম।
ফলে এলিজার এই অর্জন শুধু তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন উচ্চতা নয়, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও যোগ করল নতুন অধ্যায়। গত মঙ্গলবার দিবাগত সন্ধ্যায় ক্যামডেন কাউন্সিলের সাধারণ সভায় কাউন্সিলরদের ভোটে নির্ধারিত হয় নতুন নেতৃত্ব। ভোট শেষে ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন এলিজা রহমান। একই সভায় মেয়রের দায়িত্ব পান ভিন্স ফেরেরি।
জানা গেছে, মাত্র দুই বছর আগে এলিজার নাম প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছিল ক্যামডেনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তালিকায়। ২০২৪ সালের নিউ সাউথ ওয়েলস স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে নর্থ ওয়ার্ড থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ভোটারদের সমর্থনে নির্বাচিত হয়ে প্রবেশ করেন ক্যামডেন কাউন্সিলে। এবার সহকর্মী কাউন্সিলরদের আস্থা তাকে নিয়ে গেল ডেপুটি মেয়রের আসনে।
দুই নির্বাচনের এই দুই মুহূর্তের মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে এলিজার জন্য যাত্রাটি বড়। প্রথমে এলাকার মানুষের ভোটে কাউন্সিলর, এরপর কাউন্সিলরদের ভোটে ডেপুটি মেয়র স্থানীয় রাজনীতিতে অল্প সময়ের মধ্যেই তার দায়িত্বের পরিধি বেড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় সরকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এলাকার উন্নয়ন, স্থানীয় অবকাঠামো, জনসেবা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা সিদ্ধান্তে কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। ফলে ডেপুটি মেয়রের পদটি এলিজার জন্য যেমন সম্মানের,তেমনি নতুন দায়িত্ব ও প্রত্যাশারও।
সূত্র জানায়, ক্যামডেনের রাজনীতিতে অবশ্য এলিজার পথচলা হঠাৎ শুরু হয়নি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগেও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন সামাজিক ও কমিউনিটি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে এলাকার মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেই সম্পৃক্ততাই পরে তাকে নিয়ে আসে নির্বাচনি রাজনীতিতে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নর্থ ওয়ার্ড থেকে তার জয় সেই যাত্রায় প্রথম বড় স্বীকৃতি। এরপর কাউন্সিলর হিসেবে স্থানীয় বিভিন্ন বিষয় ও কমিউনিটির সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে যুক্ত রাখেন। প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এবার পেলেন আরো বড় দায়িত্ব। নতুন দায়িত্বেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্ব দিতে চান এলিজা। ক্যামডেনের তরুণ, পরিবার, প্রবীণ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বসবাসের উপযোগী কমিউনিটি গড়ে তুলতে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে এই অর্জনের গুরুত্বও তার কাছে আলাদা। নিজের রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও এটি গর্বের মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন এলিজা।
তার এই সাফল্য এমন এক সময়ে এলো, যখন অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে স্থানীয় রাজনীতির নেতৃত্বের পর্যায়ে নারীর এই অগ্রযাত্রা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।
তবে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশিদের পথচলায় এর আগেও ইতিহাস তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালে ক্যাম্পবেলটাউন সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে প্রথম এই পদে পৌঁছেছিলেন মাসুদ খলিল। এবার নারী হিসেবে সেই ইতিহাসে নিজের নাম যুক্ত করলেন এলিজা রহমান।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সিডনির বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও দেখা দিয়েছে উচ্ছ্বাস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানাচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ানদের রাজনীতি, নেতৃত্ব ও জনসেবায় এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে এলিজার এই অর্জন নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করবে বলে আশা করছেন প্রবাসীরা।
তবে বিজ্ঞজনদের মতে ইতিহাস গড়ার আনন্দের সঙ্গে এলিজার সামনে এখন অপেক্ষা করছে বাস্তব দায়িত্বের পরীক্ষা। দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্যামডেনের জনসংখ্যা ও আবাসন বৃদ্ধি, অবকাঠামো এবং নাগরিক সেবার মতো বিষয় নিয়ে কাউন্সিলকে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেতৃত্বে এখন সরাসরি যুক্ত থাকবেন তিনি।
বাংলাদেশের শিকড় নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বেড়ে ওঠা একটি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব থেকে মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বে পৌঁছানোর এই গল্প তাই একটি নির্বাচনের ফলেই শেষ হচ্ছে না। বরং এলিজা রহমানের সামনে শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়—যেখানে পরিচয়ের পাশাপাশি তার কাজ, সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্বই হবে পরবর্তী পথচলার আসল পরিচয়।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

























