নাচ, বক্সিং কিংবা দৌড় মানুষের মতো নানা কাজ করে বিশ্বকে তাক লাগাচ্ছে হিউম্যানয়েড রোবট। এবার এসব রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রস্তুতিও শুরু করেছে চীন।
সামরিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে যুদ্ধের সময় সেনাদের সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম রোবট তৈরির দিকে এগোচ্ছে দেশটি।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে চীনের সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত নোটিশ, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
গত মাসে চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে রোবটদের দৌড়, বক্সিং, নাচ ও উশু প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেখা যায়। কয়েকটি রোবট ১০০ মিটার দৌড়ে মানুষের দ্রুততম দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের রেকর্ডের কাছাকাছি গতিও দেখিয়েছে।
প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিন পর চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সরকারি সংবাদপত্রে এসব প্রযুক্তিকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য দ্রুত গবেষণাগার থেকে বাস্তব প্রয়োগে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
রয়টার্সের পর্যালোচনা অনুযায়ী, চীনের প্রতিরক্ষা খাত ২০২৫ ও ২০২৬ সালে হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক ব্যবহার নিয়ে গবেষণা আরও জোরদার করেছে। রোবটের চারপাশের পরিবেশ শনাক্ত করা, বিভিন্ন বস্তু পরিচালনা করা এবং প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তৈরির মতো প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শহুরে যুদ্ধে রোবট
শহুরে যুদ্ধেও হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে চীন।
২০২৫ সালের আগস্টে চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির গবেষকদের একটি গবেষণাপত্রে এমন একটি যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা বলা হয়।
সেখানে ছয়টি ‘কমব্যাট রোবট’ হিউম্যানয়েড রোবট, রোবট কুকুর ও চালকবিহীন যান—দুটি আক্রমণকারী দলের সঙ্গে কাজ করার কথা বলা হয়। এসব রোবট সেনাদের সঙ্গে মিলে শত্রুর দখলে থাকা ভবনে প্রবেশ করে তলা ও কক্ষ ধরে অভিযান চালাতে পারে এমন পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে।
তবে ওই গবেষণায় রোবটগুলো কী ধরনের অস্ত্র বহন করবে বা বেসামরিক মানুষের মুখোমুখি হলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি।
শত্রুর এলাকায় প্রবেশ ও নজরদারি
চীনের সামরিক গবেষণায় হিউম্যানয়েড রোবটকে শত্রুর অবস্থানের পেছনে পাঠানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির একটি প্রতিযোগিতায় রোবটকে ‘শত্রুর পেছনের এলাকায় প্রবেশের’ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করা হয়।
সেখানে রোবটের কাজ ছিল নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করা, সেই এলাকার মানচিত্র তৈরি করা এবং লক্ষ্য শনাক্ত করা। সামরিক ঘাঁটিতে পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা টহল ও অন্যান্য কাজেও রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে চীনের পিএলএ একটি হিউম্যানয়েড রোবট কেনার জন্য দরপত্রও প্রকাশ করে। এতে রোবট সরবরাহের পাশাপাশি স্থাপন ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের কথাও ছিল।
মানুষ দূরে, রোবট সামনে
হিউম্যানয়েড রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অন্যতম কারণ হিসেবে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক ডেনিস হং বলেন, যেখানে মানুষকে পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে রোবট পাঠানো হতে পারে এ প্রযুক্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব রোবট প্রচুর শক্তি ব্যবহার করে এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চিত পরিস্থিতিও রোবটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিরক্ষা শিল্পেও ব্যবহার
২০২৬ সালে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির কার্যক্রম চীনের সামরিক গবেষণার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পেও ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নরিনকোর তৈরি ফুসি নামের হিউম্যানয়েড রোবট এর একটি উদাহরণ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ফুসি পাহারার দায়িত্ব, যেকোনো আবহাওয়ায় নজরদারি, টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারে। রোবটটিকে দূর থেকে একজন মানুষ পরিচালনাও করতে পারেন।
দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রোবটের সব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমাতে পারে। ফলে বর্তমান প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সামরিক ক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও এগোচ্ছে
হিউম্যানয়েড রোবটকে সামরিক কাজে ব্যবহারের চিন্তা শুধু চীনের নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীও গত বছর ‘সামরিকায়িত হিউম্যানয়েড সক্ষমতা’ তৈরির জন্য একটি প্রতিযোগিতা শুরু করে।
নজরদারি, নিরাপত্তা, বাধা অপসারণ, বিপজ্জনক পদার্থ মোকাবিলা এবং শহুরে এলাকায় আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে এসব রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে দেশটি।
তবে হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট তৈরিতে চীন বর্তমানে অনেক এগিয়ে রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোফা গ্লোবাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে চীনা নির্মাতাদের কাছ থেকে।
যুদ্ধক্ষেত্রে আসবে রোবট?
বর্তমানে চীনের কোনো সশস্ত্র হিউম্যানয়েড রোবটকে পিএলএর কোনো সক্রিয় সামরিক ইউনিটে মোতায়েন করা হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সামরিক গবেষণা, রোবট কেনার উদ্যোগ এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে প্রযুক্তির উন্নয়ন, উৎপাদন খরচ কমানো এবং রোবটের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলে সামরিক ক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার বাস্তব রূপ পেতে পারে।
তবে স্বয়ংক্রিয় রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার নিয়ে নৈতিক ও আইনি প্রশ্নও রয়েছে। বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধাকে আলাদা করা, আহত বা আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা এবং কখন শক্তি প্রয়োগ করা হবে এসব সিদ্ধান্ত রোবটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের পাশাপাশি হিউম্যানয়েড রোবটও দেখা যেতে পারে এমন সম্ভাবনাই এখন সামনে আনছে চীনের সামরিক গবেষণা।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























