ঢাকা ০৪:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাঁচকলা খেলে কি শরীরে আয়রন বাড়ে?

কাঁচকলা বাঙালির রান্নাঘরের খুব চেনা সবজি। ভর্তা, ভাজি থেকে শুরু করে পাতলা ঝোল-নানা পদে এর ব্যবহার রয়েছে। শুধু রান্নায় নয়, কাঁচকলাকে ঘিরে বাঙালির ঘরোয়া বিশ্বাসও কম নয়। শরীর ফ্যাকাশে দেখালেই বাড়ির বড়রা বলতেন, ‘কাঁচকলা সিদ্ধ খাও, রক্ত বাড়বে।’ আবার পেট খারাপ হলে গরম ভাতের সঙ্গে কাঁচকলার হালকা ঝোলও ছিল ঘরোয়া সমাধানের অন্যতম ভরসা।

কাঁচকলা কাটার পর হাতে যে কষ লেগে কালচে দাগ পড়ে, সেটিকেও অনেকে আয়রনের উপস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। কিন্তু কাঁচকলা নিয়ে প্রচলিত এই ধারণাগুলোর কতটা সত্যি? সত্যিই কি কাঁচকলা খেলে শরীরে রক্ত বাড়ে? নাকি এর আসল গুণ লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়?

রক্ত বাড়াতে কাঁচকলা কতটা কার্যকর?
রক্ত তৈরির সঙ্গে আয়রনের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। আর এখানেই কাঁচকলা নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জনপ্রিয় ভুল ধারণা।

কাঁচকলা কাটার পর যে কালচে বা বাদামি দাগ দেখা যায়, সেটি আয়রন জমে যাওয়ার কারণে নয়। উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান ও বাতাসের সংস্পর্শে রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেই এমন রং তৈরি হতে পারে।

গরম ভাতের সঙ্গে কাঁচকলার পাতলা ঝোল-বাঙালির চেনা স্বাদগরম ভাতের সঙ্গে কাঁচকলার পাতলা ঝোল-বাঙালির চেনা স্বাদ

কাঁচকলায় আয়রন একেবারেই নেই, তা নয়। তবে পরিমাণ খুব বেশি নয়। বিভিন্ন পুষ্টি-তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচকলায় আনুমানিক ০.৩ থেকে ০.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকতে পারে। ফলে শুধু কাঁচকলা খেয়েই শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়রন পাওয়া বা হিমোগ্লোবিন বাড়িয়ে ফেলার ধারণা ঠিক নয়।

অর্থাৎ কাঁচকলা স্বাস্থ্যকর সবজি হতে পারে। আয়রনের ঘাটতি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও চিকিৎসকের পরামর্শই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে পেট খারাপের হলে কাঁচকলার বেশ ভালো কাজ করে। আন্তর্জাতিক ডায়রিয়া গবেষণা কেন্দ্রের একদল গবেষক হাসপাতালে ডায়রিয়ায় ভোগা শিশুদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, সাধারণ ওষুধের সঙ্গে কাঁচকলা খাওয়ালে শিশুরা অনেক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।

কাঁচকলায় রয়েছে প্রতিরোধী স্টার্চ বা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ, যা সহজে হজম হয় না। এটি বৃহদান্ত্রে পৌঁছে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। এর পাশাপাশি কাঁচকলার কিছু উপাদান মলের গঠন ও অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ায় কাঁচকলা নিয়ে এত সতর্কতা কেন?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগে বারবার রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আয়রন জমে গেলে হৃদ্‌যন্ত্র, যকৃতসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণেই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের খাদ্যতালিকায় আয়রন নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তবে কাঁচকলায় আয়রনের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তাই ‘কাঁচকলা মানেই প্রচুর আয়রন’-এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। থ্যালাসেমিয়া রোগী কাঁচকলা খাবেন কি না, সেটি শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর করে ঠিক করা উচিত নয়; রোগীর আয়রন জমার মাত্রা, চিকিৎসা ও সামগ্রিক খাদ্যতালিকা বিবেচনা করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

কাঁচকলার আসল পরিচয় কী?
কাঁচকলা নিঃসন্দেহে পুষ্টিকর সবজি এবং সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। পেটের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের জন্য এর ফাইবার ও প্রতিরোধী স্টার্চ উপকারী হতে পারে।

তাই কাঁচকলাকে রক্ত বাড়ানোর ওষুধ না ভেবে পুষ্টিকর একটি সবজি হিসেবেই দেখুন। পেটের গোলমালে এটি খাদ্যতালিকায় জায়গা পেতে পারে, তবে ডায়রিয়া হলে ওআরএসের গুরুত্ব সবার আগে। আর আয়রনের ঘাটতি বা থ্যালাসেমিয়ার মতো রক্তের রোগ থাকলে ঘরোয়া বিশ্বাসের বদলে চিকিৎসকের পরামর্শই নেওয়া উচিত।

সূত্র: ভেরিওয়েল ফিট, ইন্ডিয়া টুডে

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

কাঁচকলা খেলে কি শরীরে আয়রন বাড়ে?

আপডেট সময় ১০:১৪:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাঁচকলা বাঙালির রান্নাঘরের খুব চেনা সবজি। ভর্তা, ভাজি থেকে শুরু করে পাতলা ঝোল-নানা পদে এর ব্যবহার রয়েছে। শুধু রান্নায় নয়, কাঁচকলাকে ঘিরে বাঙালির ঘরোয়া বিশ্বাসও কম নয়। শরীর ফ্যাকাশে দেখালেই বাড়ির বড়রা বলতেন, ‘কাঁচকলা সিদ্ধ খাও, রক্ত বাড়বে।’ আবার পেট খারাপ হলে গরম ভাতের সঙ্গে কাঁচকলার হালকা ঝোলও ছিল ঘরোয়া সমাধানের অন্যতম ভরসা।

কাঁচকলা কাটার পর হাতে যে কষ লেগে কালচে দাগ পড়ে, সেটিকেও অনেকে আয়রনের উপস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। কিন্তু কাঁচকলা নিয়ে প্রচলিত এই ধারণাগুলোর কতটা সত্যি? সত্যিই কি কাঁচকলা খেলে শরীরে রক্ত বাড়ে? নাকি এর আসল গুণ লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়?

রক্ত বাড়াতে কাঁচকলা কতটা কার্যকর?
রক্ত তৈরির সঙ্গে আয়রনের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। আর এখানেই কাঁচকলা নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জনপ্রিয় ভুল ধারণা।

কাঁচকলা কাটার পর যে কালচে বা বাদামি দাগ দেখা যায়, সেটি আয়রন জমে যাওয়ার কারণে নয়। উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান ও বাতাসের সংস্পর্শে রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেই এমন রং তৈরি হতে পারে।

গরম ভাতের সঙ্গে কাঁচকলার পাতলা ঝোল-বাঙালির চেনা স্বাদগরম ভাতের সঙ্গে কাঁচকলার পাতলা ঝোল-বাঙালির চেনা স্বাদ

কাঁচকলায় আয়রন একেবারেই নেই, তা নয়। তবে পরিমাণ খুব বেশি নয়। বিভিন্ন পুষ্টি-তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচকলায় আনুমানিক ০.৩ থেকে ০.৫ মিলিগ্রাম আয়রন থাকতে পারে। ফলে শুধু কাঁচকলা খেয়েই শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়রন পাওয়া বা হিমোগ্লোবিন বাড়িয়ে ফেলার ধারণা ঠিক নয়।

অর্থাৎ কাঁচকলা স্বাস্থ্যকর সবজি হতে পারে। আয়রনের ঘাটতি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও চিকিৎসকের পরামর্শই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে পেট খারাপের হলে কাঁচকলার বেশ ভালো কাজ করে। আন্তর্জাতিক ডায়রিয়া গবেষণা কেন্দ্রের একদল গবেষক হাসপাতালে ডায়রিয়ায় ভোগা শিশুদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, সাধারণ ওষুধের সঙ্গে কাঁচকলা খাওয়ালে শিশুরা অনেক দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।

কাঁচকলায় রয়েছে প্রতিরোধী স্টার্চ বা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ, যা সহজে হজম হয় না। এটি বৃহদান্ত্রে পৌঁছে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। এর পাশাপাশি কাঁচকলার কিছু উপাদান মলের গঠন ও অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ায় কাঁচকলা নিয়ে এত সতর্কতা কেন?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগে বারবার রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আয়রন জমে গেলে হৃদ্‌যন্ত্র, যকৃতসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণেই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের খাদ্যতালিকায় আয়রন নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তবে কাঁচকলায় আয়রনের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তাই ‘কাঁচকলা মানেই প্রচুর আয়রন’-এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। থ্যালাসেমিয়া রোগী কাঁচকলা খাবেন কি না, সেটি শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর করে ঠিক করা উচিত নয়; রোগীর আয়রন জমার মাত্রা, চিকিৎসা ও সামগ্রিক খাদ্যতালিকা বিবেচনা করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

কাঁচকলার আসল পরিচয় কী?
কাঁচকলা নিঃসন্দেহে পুষ্টিকর সবজি এবং সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। পেটের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের জন্য এর ফাইবার ও প্রতিরোধী স্টার্চ উপকারী হতে পারে।

তাই কাঁচকলাকে রক্ত বাড়ানোর ওষুধ না ভেবে পুষ্টিকর একটি সবজি হিসেবেই দেখুন। পেটের গোলমালে এটি খাদ্যতালিকায় জায়গা পেতে পারে, তবে ডায়রিয়া হলে ওআরএসের গুরুত্ব সবার আগে। আর আয়রনের ঘাটতি বা থ্যালাসেমিয়ার মতো রক্তের রোগ থাকলে ঘরোয়া বিশ্বাসের বদলে চিকিৎসকের পরামর্শই নেওয়া উচিত।

সূত্র: ভেরিওয়েল ফিট, ইন্ডিয়া টুডে

বাংলা৭১নিউজ/জেএস