ঢাকা ০৭:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাকে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করলেন ছেলে

জীবিত মাকে কাগজে-কলমে মৃত বানিয়ে নিজের পৈতৃক বসতভিটাসহ জমি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।

নজিরবিহীন এমন প্রতারণার ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত জমসেদ আলীর ছেলে আব্দুল জলিল জুয়ার টাকার জোগান দিতে গত প্রায় সাত মাস আগে তার জীবিত মা রহিমাকে মৃত দেখিয়ে বসতঘরের ভিটেসহ ২১ শতক জমি প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করে দেন।

সম্প্রতি ক্রেতা মজিবুর রহমান তার লোকজন নিয়ে ওই বাড়ির আশপাশের পানের বরজ ও বড় পুকুরসহ সবকিছু নিজের দাবি করে দখল নিতে গেলে এই জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবার নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের নকল (কপি) উত্তোলন করলে জালিয়াতির সত্যতা খুঁজে পায়।

নথি অনুযায়ী, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ১১৫৪ ও ১১৫৫ নম্বরসহ মোট তিনটি দুটি দলিলের মাধ্যমে মোট ২১ শতক জমি রেজিস্ট্রেশন করা হয়।

জমির ক্রেতা হলেন, পাশের পূর্ব রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে মজিবুর রহমান। এই জালিয়াতির দলিলে সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মো. হোসেন মিয়া। আর এই বিতর্কিত দলিলটি সম্পাদন করেছেন ঝন্টু সরকার নামের এক দলিল লেখক।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজাবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যাকে দলিলে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করা হয়েছে, সেই বৃদ্ধা রহিমা নিজের বাড়ির সামনেই বসে আছেন। নিজের বেঁচে থাকার প্রমাণ দিয়ে ক্ষোভ ও অশ্রুসজল চোখে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি তো মরছি না। তা অইলে কেরে আমারে মরা বানাইয়া জমি বেচছে? আমি এইডার কঠিন বিচার চাই।

এসময় তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিযুক্ত আব্দুল জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম, তার ছোট ছেলে অলি মিয়া, ছোট ছেলের স্ত্রী হাফছা বেগম এবং একমাত্র মেয়ে রোকিয়া বেগম।

জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম স্বামীর এমন হীন কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, আমার স্বামী নিজের মাকে জীবিত রেখে যেভাবে মৃত বলে জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই মানা যায় না।

তিনি জানান, জলিল জুয়া খেলায় আসক্ত। জুয়া খেলতে গিয়ে এর আগেও সে পরিবারের আরো অনেক জমি বিক্রি করে দিয়েছে।

অভিযুক্ত জলিলের ছোট ভাই অলি মিয়া জানান, তার বড় ভাই জলিল মূলত একটি জুয়াড়ি চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন ধারদেনা করে জুয়া খেলে বিপুল পরিমাণ টাকা হারেন তিনি। একপর্যায়ে জুয়ার আসরেই জমি বিক্রি করার কথা বলে ওই চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা নেন। সেই দেনা শোধ করতেই গোপনে মাকে মৃত দেখিয়ে এই জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

তবে অলি মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, মা যে মারা গেলেন, সেই ভুয়া মৃত্যু সার্টিফিকেট কে দিল? আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই বা কিভাবে এত বড় জালিয়াতির দলিল রেজিস্ট্রি করল? এই ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত আব্দুল জলিল ও দলিল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত চক্রটি পরিবারের ওপর ভিন্ন ধরনের অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে দলিল লেখক ঝন্টু সরকার জানান, আমাকে মৃত সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশান দিয়েছে। তা দেখে দলিল সম্পন্ন করে দিয়েছি। যাচাই করার দায়িত্ব আমার না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. হামিদুল মৃত সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশ দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন বিষয়টি দেখছি।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :

মাকে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করলেন ছেলে

আপডেট সময় ০৬:১৭:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবিত মাকে কাগজে-কলমে মৃত বানিয়ে নিজের পৈতৃক বসতভিটাসহ জমি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।

নজিরবিহীন এমন প্রতারণার ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত জমসেদ আলীর ছেলে আব্দুল জলিল জুয়ার টাকার জোগান দিতে গত প্রায় সাত মাস আগে তার জীবিত মা রহিমাকে মৃত দেখিয়ে বসতঘরের ভিটেসহ ২১ শতক জমি প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করে দেন।

সম্প্রতি ক্রেতা মজিবুর রহমান তার লোকজন নিয়ে ওই বাড়ির আশপাশের পানের বরজ ও বড় পুকুরসহ সবকিছু নিজের দাবি করে দখল নিতে গেলে এই জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবার নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের নকল (কপি) উত্তোলন করলে জালিয়াতির সত্যতা খুঁজে পায়।

নথি অনুযায়ী, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ১১৫৪ ও ১১৫৫ নম্বরসহ মোট তিনটি দুটি দলিলের মাধ্যমে মোট ২১ শতক জমি রেজিস্ট্রেশন করা হয়।

জমির ক্রেতা হলেন, পাশের পূর্ব রাজাবাড়িয়া গ্রামের মৃত আমির হোসেনের ছেলে মজিবুর রহমান। এই জালিয়াতির দলিলে সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মো. হোসেন মিয়া। আর এই বিতর্কিত দলিলটি সম্পাদন করেছেন ঝন্টু সরকার নামের এক দলিল লেখক।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজাবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যাকে দলিলে মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করা হয়েছে, সেই বৃদ্ধা রহিমা নিজের বাড়ির সামনেই বসে আছেন। নিজের বেঁচে থাকার প্রমাণ দিয়ে ক্ষোভ ও অশ্রুসজল চোখে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি তো মরছি না। তা অইলে কেরে আমারে মরা বানাইয়া জমি বেচছে? আমি এইডার কঠিন বিচার চাই।

এসময় তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিযুক্ত আব্দুল জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম, তার ছোট ছেলে অলি মিয়া, ছোট ছেলের স্ত্রী হাফছা বেগম এবং একমাত্র মেয়ে রোকিয়া বেগম।

জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম স্বামীর এমন হীন কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, আমার স্বামী নিজের মাকে জীবিত রেখে যেভাবে মৃত বলে জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই মানা যায় না।

তিনি জানান, জলিল জুয়া খেলায় আসক্ত। জুয়া খেলতে গিয়ে এর আগেও সে পরিবারের আরো অনেক জমি বিক্রি করে দিয়েছে।

অভিযুক্ত জলিলের ছোট ভাই অলি মিয়া জানান, তার বড় ভাই জলিল মূলত একটি জুয়াড়ি চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন ধারদেনা করে জুয়া খেলে বিপুল পরিমাণ টাকা হারেন তিনি। একপর্যায়ে জুয়ার আসরেই জমি বিক্রি করার কথা বলে ওই চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা নেন। সেই দেনা শোধ করতেই গোপনে মাকে মৃত দেখিয়ে এই জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

তবে অলি মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, মা যে মারা গেলেন, সেই ভুয়া মৃত্যু সার্টিফিকেট কে দিল? আর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই বা কিভাবে এত বড় জালিয়াতির দলিল রেজিস্ট্রি করল? এই ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত আব্দুল জলিল ও দলিল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত চক্রটি পরিবারের ওপর ভিন্ন ধরনের অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে দলিল লেখক ঝন্টু সরকার জানান, আমাকে মৃত সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশান দিয়েছে। তা দেখে দলিল সম্পন্ন করে দিয়েছি। যাচাই করার দায়িত্ব আমার না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. হামিদুল মৃত সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশ দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন বিষয়টি দেখছি।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ