যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর, ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির নেতা নির্বাচনে জয়ী হয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। আজ সোমবার (২০ জুলাই) তিনি নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী ও গত এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিটেনের মসনদে বসতে যাওয়া বার্নহ্যামকে তার আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাব ও উত্তর ইংল্যান্ডের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ভূমিকার জন্য ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে ডাকা হয়।
দীর্ঘ এক দশক আগে লন্ডনের মূলধারার রাজনীতি বা ওয়েস্টমিনস্টার ছেড়ে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে একটি উপ-নির্বাচনে জিতে তিনি পুনরায় সংসদে ফিরে আসেন। কেয়ার স্টারমারের আকস্মিক পদত্যাগের পর লেবার পার্টির এমপিরা বার্নহ্যামের পেছনে জোরালো অবস্থান নেন। দলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সংখ্যক এমপির সমর্থন পেয়ে এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লেবার পার্টির নেতা নির্বাচিত হন।
কেন সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে না?
যুক্তরাজ্যের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিবর্তিত হলে সাধারণ নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি হাউজ অব কমন্সে (সংসদে) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায়, দলের নতুন নেতা হিসেবে বার্নহ্যাম স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাচ্ছেন। ফলে ২০২৯ সালের আগে দেশে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
ক্ষমতা হস্তান্তরের দ্রুত আনুষ্ঠানিকতা
ব্রিটিশ সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, আজ (সোমবার) বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন কেয়ার স্টারমার। এরপরই রাজা নতুন সরকার গঠনের জন্য অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে আমন্ত্রণ জানাবেন। রাজার আমন্ত্রণ গ্রহণের মুহূর্ত থেকেই বার্নহ্যাম আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে যেখানে প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতা হস্তান্তরে কয়েক মাস সময় লাগে, ব্রিটেনে ঠিক তার উল্টো। ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনে সরকারি বাসভবন ‘ডাউনিং স্ট্রিট’ খালি করার জন্য একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সাধারণত মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় পান। গোছগাছের বেশিরভাগ কাজ আগে থেকেই সেরে রাখা হয়।
সোমবার বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ডাউনিং স্ট্রিটের বাসভবন খালি করবেন এবং অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সেখানে প্রবেশ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে তার প্রথম ভাষণ দেবেন।
বার্নহ্যামের সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ
৫৬ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ নেতা এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন যখন দেশটিতে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং অর্থনৈতিক মন্দাভাব বিরাজ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি চ্যান্সেলর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে তার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্নহ্যামের প্রথম বড় পদক্ষেপ হতে পারে তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা পানির বোতলজাত ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘থেমস ওয়াটার’-কে সাময়িকভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটিকে পুনর্গঠন করা।
লেবার পার্টির নেতৃত্ব পাওয়ার পর নিজের ভাষণে বার্নহ্যাম ব্রিটেনের জন্য একটি ‘নতুন পথ’ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তার সরকার জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার ওপর বিশেষ জোর দেবে।
তিনি আরো বলেন, “আজকের এই পরিবর্তন গত ৪০ বছরের মধ্যে আমাদের রাজনীতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। আমি এমন এক ব্রিটেন গড়ে তুলব যেখানে জীবনযাত্রা হবে সাশ্রয়ী এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চল সমানভাবে উন্নত হবে।” তিনি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডসহ সমগ্র যুক্তরাজ্যের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
স্টারমারের বিদায়ের নেপথ্যে
দুই বছরেরও কম সময় প্রধানমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর গত ২২ জুন লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কেয়ার স্টারমার। বেশ কিছু রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব তীব্র চাপের মুখে পড়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও পিটার ম্যান্ডেলসনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
এর পাশাপাশি গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর স্টারমারের ওপর পদত্যাগের আরো জোড়ালো হয়। এরপর একটি উপ-নির্বাচনে জিতে বার্নহ্যাম যখন সংসদে ফিরে আসেন, তখন অনেক লেবার এমপি স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে তার পেছনে এসে দাঁড়ান।
স্টারমারের পদত্যাগের ফলে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। দলের নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নিতে অন্তত এক-পঞ্চমাংশ লেবার এমপির সমর্থন প্রয়োজন হয়। বার্নহ্যাম সহজেই সেই শর্ত পূরণ করেন এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ



























