ঢাকা ০১:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি, বোর্ডের জরুরি বার্তা Logo মানিকগঞ্জে ট্রাক-সিএনজির সংঘর্ষে নিহত ১ Logo বিশ্বকাপ ফাইনালের শোয়ে পারিশ্রমিক পাননি বিটিএস-শাকিরা-ম্যাডোনারা! Logo আমরা একসাথে ছিলাম, আছি এবং একসাথেই থাকবো: প্রধানমন্ত্রী Logo মা‌র্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গর ঢাকায় আসছেন Logo জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল: এআই বলার পর সেই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি Logo লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা, বিজিবির বাধা Logo ভাটারায় গ‍্যাস লাইন লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, শিশুসহ দগ্ধ ৩ Logo সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের দুই প্যাকেজ ঘোষণা Logo চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু

লামিন ইয়ামালের দাদি ফাতিমার সংগ্রামী গল্প

বিশ্ব ফুটবলে লামিন ইয়ামালের উত্থান যেন রূপকথার গল্প। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বার্সেলোনা ও স্পেন জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন তিনি। ম্যাচ শুরুর আগে পরে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত তুলে দোয়া করতে দেখা যায় এই তরুণ ফুটবলারকে। অনেকেরই প্রশ্ন-এ অভ্যাস কোথা থেকে এলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার দাদি ফাতিমা নাসরাউইয়ের জীবনে।

ইয়ামালের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই দাদি তাকে শিখিয়েছেন মাঠে নামার আগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে। মরক্কোর একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফাতিমা বলেন, ‘তিনি নাতিকে সব সময় দোয়া পড়ে মাঠে নামতে বলেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখান। সেই অভ্যাস এখনও ধরে রেখেছেন ইয়ামাল।’

কিন্তু এই আনন্দ-সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক নারীর অসাধারণ সংগ্রামের গল্প। লামিন ইয়ামালের দাদি ফাতিমার সংগ্রামের গল্প কাঁদাবে আপনাকেও-

মরক্কো থেকে অজানা পথে স্পেনে
ফাতিমা নাসরাউইয়ের জীবন কখনোই সহজ ছিল না। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ১৯৯০-এর দশকে তিনি একাই মরক্কো ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান। সে সময় তার কাছে বৈধ কাগজপত্রও ছিল না। নানা ঝুঁকি নিয়ে তিনি স্পেনে পৌঁছান, কারণ তার একটাই স্বপ্ন ছিল সন্তানদের জন্য ভালো জীবন গড়ে তোলা।

স্পেনে পৌঁছে তিনি কোনো বিলাসী জীবন পাননি। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। কখনো বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করেছেন, কখনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, আবার কখনো একসঙ্গে একাধিক শিফটে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় তিনি তিনটি শিফটেও কাজ করেছেন, শুধু সন্তানদের স্পেনে এনে মানুষ করার জন্য।

ফাতিমার সেই পরিশ্রমের ফলেই পরে তার ছেলে মুনির নাসরাউই, অর্থাৎ ইয়ামালের বাবা, স্পেনে আসতে পারেন। তখন মুনিরের বয়স মাত্র তিন বছর। পরিবারের পুনর্মিলনের সেই গল্প আজও ইয়ামাল আবেগ নিয়ে বলেন। তিনি জানিয়েছেন, দাদির সাহসী সিদ্ধান্ত না থাকলে হয়তো তার পরিবার কখনোই স্পেনে স্থায়ী হতে পারত না।

নাতির শৈশবেও ফাতিমা ছিলেন ছায়ার মতো
ইয়ামালের বয়স যখন তিন বছর, তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর মা শেইলা এবানা ও বাবা আলাদা থাকলেও ফাতিমা নাতির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বার্সেলোনার উপকণ্ঠের শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায় তিনি নাতিকে বড় হতে দেখেছেন, শাসন করেছেন, আবার সাহসও জুগিয়েছেন। ইয়ামাল অনেকবার বলেছেন, তার সাফল্যের পেছনে পরিবারের ত্যাগ সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে দাদির কথা তিনি প্রায়ই স্মরণ করেন।

ম্যাচের আগে দোয়া করার অভ্যাস
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ইয়ামালের ম্যাচের আগে দুই হাত তুলে দোয়া করার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ফাতিমা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি নাতিকে শিখিয়েছেন-যে কাজই করো, আগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। মাঠে নামার আগে সুরা আল-ফাতিহা ও দোয়া পড়ার পরামর্শও তিনি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ইয়ামালের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসেরও উৎস।

দাদির জন্য বিশেষ সম্মান
বিশ্বতারকা হওয়ার পরও ইয়ামাল কখনো দাদিকে ভুলে যাননি। বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক ছবিও তিনি দাদিকে ছাড়া তুলতে চাননি। ফাতিমা উপস্থিত থাকতে পারবেন এমন সময়ের জন্য অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাই বলে দেয়, তার জীবনে দাদির গুরুত্ব কতটা। ইয়ামাল পরে রোকাফোন্দায় দাদির জন্য একটি বাড়িও কিনে দেন। যদিও বহু বছর যে এলাকায় সংগ্রাম করে কাটিয়েছেন, সেই এলাকা ছাড়তে প্রথমে রাজি ছিলেন না ফাতিমা।

ফাতিমার সংগ্রাম থেকে বিশ্বমঞ্চ
আজ লামিন ইয়ামাল কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। কিন্তু তার সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বহু বছর আগে, যখন এক সাহসী নারী নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য সব ঝুঁকি নিয়ে মরক্কো থেকে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

ফাতিমা নাসরাউই শুধু একজন দাদি নন; তিনি এক সংগ্রামী অভিবাসী নারীর প্রতীক। তার কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং বিশ্বাসের উত্তরাধিকারই আজও বহন করছেন ইয়ামাল। ম্যাচের আগে দুই হাত তুলে করা সেই ছোট্ট দোয়ায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের বিশ্বাস নয়, জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং অদম্য স্বপ্নের ইতিহাস।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নিউওয়ার্ক টাইমস

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি, বোর্ডের জরুরি বার্তা

লামিন ইয়ামালের দাদি ফাতিমার সংগ্রামী গল্প

আপডেট সময় ১২:৫৭:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব ফুটবলে লামিন ইয়ামালের উত্থান যেন রূপকথার গল্প। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বার্সেলোনা ও স্পেন জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন তিনি। ম্যাচ শুরুর আগে পরে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত তুলে দোয়া করতে দেখা যায় এই তরুণ ফুটবলারকে। অনেকেরই প্রশ্ন-এ অভ্যাস কোথা থেকে এলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার দাদি ফাতিমা নাসরাউইয়ের জীবনে।

ইয়ামালের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই দাদি তাকে শিখিয়েছেন মাঠে নামার আগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে। মরক্কোর একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফাতিমা বলেন, ‘তিনি নাতিকে সব সময় দোয়া পড়ে মাঠে নামতে বলেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখান। সেই অভ্যাস এখনও ধরে রেখেছেন ইয়ামাল।’

কিন্তু এই আনন্দ-সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক নারীর অসাধারণ সংগ্রামের গল্প। লামিন ইয়ামালের দাদি ফাতিমার সংগ্রামের গল্প কাঁদাবে আপনাকেও-

মরক্কো থেকে অজানা পথে স্পেনে
ফাতিমা নাসরাউইয়ের জীবন কখনোই সহজ ছিল না। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ১৯৯০-এর দশকে তিনি একাই মরক্কো ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান। সে সময় তার কাছে বৈধ কাগজপত্রও ছিল না। নানা ঝুঁকি নিয়ে তিনি স্পেনে পৌঁছান, কারণ তার একটাই স্বপ্ন ছিল সন্তানদের জন্য ভালো জীবন গড়ে তোলা।

স্পেনে পৌঁছে তিনি কোনো বিলাসী জীবন পাননি। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। কখনো বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করেছেন, কখনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, আবার কখনো একসঙ্গে একাধিক শিফটে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় তিনি তিনটি শিফটেও কাজ করেছেন, শুধু সন্তানদের স্পেনে এনে মানুষ করার জন্য।

ফাতিমার সেই পরিশ্রমের ফলেই পরে তার ছেলে মুনির নাসরাউই, অর্থাৎ ইয়ামালের বাবা, স্পেনে আসতে পারেন। তখন মুনিরের বয়স মাত্র তিন বছর। পরিবারের পুনর্মিলনের সেই গল্প আজও ইয়ামাল আবেগ নিয়ে বলেন। তিনি জানিয়েছেন, দাদির সাহসী সিদ্ধান্ত না থাকলে হয়তো তার পরিবার কখনোই স্পেনে স্থায়ী হতে পারত না।

নাতির শৈশবেও ফাতিমা ছিলেন ছায়ার মতো
ইয়ামালের বয়স যখন তিন বছর, তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর মা শেইলা এবানা ও বাবা আলাদা থাকলেও ফাতিমা নাতির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বার্সেলোনার উপকণ্ঠের শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দায় তিনি নাতিকে বড় হতে দেখেছেন, শাসন করেছেন, আবার সাহসও জুগিয়েছেন। ইয়ামাল অনেকবার বলেছেন, তার সাফল্যের পেছনে পরিবারের ত্যাগ সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে দাদির কথা তিনি প্রায়ই স্মরণ করেন।

ম্যাচের আগে দোয়া করার অভ্যাস
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ইয়ামালের ম্যাচের আগে দুই হাত তুলে দোয়া করার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ফাতিমা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি নাতিকে শিখিয়েছেন-যে কাজই করো, আগে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। মাঠে নামার আগে সুরা আল-ফাতিহা ও দোয়া পড়ার পরামর্শও তিনি দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ইয়ামালের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসেরও উৎস।

দাদির জন্য বিশেষ সম্মান
বিশ্বতারকা হওয়ার পরও ইয়ামাল কখনো দাদিকে ভুলে যাননি। বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক ছবিও তিনি দাদিকে ছাড়া তুলতে চাননি। ফাতিমা উপস্থিত থাকতে পারবেন এমন সময়ের জন্য অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাই বলে দেয়, তার জীবনে দাদির গুরুত্ব কতটা। ইয়ামাল পরে রোকাফোন্দায় দাদির জন্য একটি বাড়িও কিনে দেন। যদিও বহু বছর যে এলাকায় সংগ্রাম করে কাটিয়েছেন, সেই এলাকা ছাড়তে প্রথমে রাজি ছিলেন না ফাতিমা।

ফাতিমার সংগ্রাম থেকে বিশ্বমঞ্চ
আজ লামিন ইয়ামাল কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। কিন্তু তার সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বহু বছর আগে, যখন এক সাহসী নারী নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য সব ঝুঁকি নিয়ে মরক্কো থেকে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

ফাতিমা নাসরাউই শুধু একজন দাদি নন; তিনি এক সংগ্রামী অভিবাসী নারীর প্রতীক। তার কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং বিশ্বাসের উত্তরাধিকারই আজও বহন করছেন ইয়ামাল। ম্যাচের আগে দুই হাত তুলে করা সেই ছোট্ট দোয়ায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের বিশ্বাস নয়, জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং অদম্য স্বপ্নের ইতিহাস।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নিউওয়ার্ক টাইমস

বাংলা৭১নিউজ/জেএস