মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যগুলোর একটি হলো আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা লাভ করা। দুনিয়ার কোনো ভালোবাসাই চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা বান্দার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার পথ খুলে দেয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন স্থানে জানিয়েছেন, কোন ধরনের মানুষ তাঁর প্রিয়। এসব গুণের মধ্যে রয়েছে তাওবা করা, পবিত্রতা অর্জন, তাকওয়া অবলম্বন, ধৈর্য ধারণ, ন্যায়বিচার করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর ভালোবাসা লাভকারী বান্দাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো-
১. তাওবাকারী
মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তবে ভুলের পর আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। যারা আন্তরিকভাবে তাওবা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের ভালোবাসেন।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা: ২২২)
তাওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়; বরং গুনাহ থেকে ফিরে আসা, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করাই প্রকৃত তাওবার অংশ।
২. পবিত্রতা অর্জনকারী
ইসলামে পবিত্রতার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এটি শুধু শরীর ও পোশাকের পরিচ্ছন্নতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্তরের পবিত্রতা, উত্তম চরিত্র, হালাল উপার্জন এবং সুন্দর আচরণও এর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: ২২২) হাদিসে এসেছে, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন এবং পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন।’ (জামে তিরমিজি: ২৭৯৯)
একজন মুমিনের কথা, কাজ ও জীবনাচরণে পরিচ্ছন্নতা থাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম মাধ্যম।
৩. রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণকারী
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম প্রধান পথ হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলে একজন মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে যায়।
৪. তাকওয়াবান
তাকওয়া হলো আল্লাহর উপস্থিতি ও জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে জীবন পরিচালনা করা। মুত্তাকি ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ পালন করে এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৭৬)
তাকওয়া মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের বিষয় নয়; বরং এটি অন্তরের এমন একটি গুণ, যা মানুষের কাজ ও আচরণে প্রকাশ পায়।
৫. ধৈর্যশীল
জীবনের নানা পরীক্ষা, কষ্ট ও প্রতিকূলতায় ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।
আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৪৬)
বিপদের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং সঠিক পথে অবিচল থাকাই ধৈর্যের পরিচয়।
৬. আল্লাহর ওপর ভরসাকারী
ইসলাম মানুষকে চেষ্টা করতে শেখায় এবং একই সঙ্গে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করতে নির্দেশ দেয়। যে ব্যক্তি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখে, সে আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করে।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)
তাওয়াক্কুলের অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং চেষ্টা করার পর আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
৭. ন্যায়বিচারকারী
ন্যায় ও ইনসাফ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নিজের পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা হুজরাত: ৯)
পরিবার, সমাজ ও লেনদেন সবক্ষেত্রেই ন্যায়পরায়ণতা একজন মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
৮. দানশীল ও কল্যাণকামী
আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সম্পদ দিয়েছেন পরীক্ষার জন্য। সেই সম্পদ থেকে অভাবী ও অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কখনো পূর্ণ কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তা থেকে ব্যয় করো, যা তোমরা ভালোবাসো। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯২)
দান শুধু অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের উপকার করা, সহযোগিতা করা এবং কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
৯. সৎকর্মশীল
আল্লাহ তাআলা উত্তম কাজ সম্পাদনকারী বা মুহসিনদের ভালোবাসেন। ইবাদত, মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করা সৎকর্মশীলতার অংশ।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: ১৯৫)
সৎকর্মশীল ব্যক্তি শুধু নিজের সংশোধনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজের কল্যাণেও ভূমিকা রাখে।
১০. অহংকারমুক্ত ও বিনয়ী
অহংকার মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে বিনয় একজন মুমিনের সৌন্দর্য।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ৯১)
বিনয়ী মানুষ নিজের যোগ্যতা ও অর্জনকে আল্লাহর দান মনে করে এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।
আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার পথ
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন কোনো একটি আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঈমান, তাওবা, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণ- এসব গুণ একত্রে একজন মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পথে এগিয়ে নেয়। কোরআনে আল্লাহ যেসব গুণের অধিকারীদের ভালোবাসার ঘোষণা দিয়েছেন, সেগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
বাংলা৭১নিউজ/জেএস



























