ঢাকা ০১:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, অথচ দর্শক টানাই দায়

ঢাকায় আবারও দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। দীর্ঘ আট বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে ফিরছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ।

দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হওয়ার কথা ছিল বড় উৎসব। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সেই উৎসবের আমেজ কোথায়?

মাঠে খেলা দেখার আগ্রহ থাকলেও গ্যালারিতে দর্শক টানার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। প্রচারের ঘাটতি, সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে টিকিটের দাম আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতের দ্বিতীয় সারির দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে সাফের আকর্ষণ যেন অনেকটাই ফিকে।

টিকিট বিক্রির হিসাবেও মিলছে তার আভাস।

ঘরের মাঠে এমন একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করেও দর্শকদের মধ্যে প্রত্যাশিত উন্মাদনা তৈরি করতে পারছেন না আয়োজকেরা।

আগামী ৫ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হবে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। চলবে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত। ছয় দলের এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ রয়েছে ‘এ’ গ্রুপে, সঙ্গে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা।

‘বি’ গ্রুপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতের সঙ্গে আছে পাকিস্তান ও মালদ্বীপ।

কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই আলোচনায় উঠে এসেছে মাঠের বাইরের নানা বিষয়।

টিকিটের দামই কি অনাগ্রহের কারণ

সাফের টিকিটের সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম এত বেশি হওয়ায় ক্ষুব্ধ দেশের ফুটবল সমর্থকেরা। অন্য ক্যাটাগরির টিকিটের দাম আরও বেশি।

ক্লাব হাউসের টিকিট ৪ হাজার, ভিআইপি গ্যালারি ৭ হাজার, রেড বক্স ৮ হাজার এবং কর্পোরেট বক্সের টিকিটের দাম ১০ হাজার টাকা।

একটি টিকিটে একই দিনের দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও সাধারণ দর্শকদের কাছে একসঙ্গে ১ হাজার টাকা খরচ করা সহজ নয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এই দাম বড় বাধা। অনলাইনে টিকিট কিনলে সার্ভিস চার্জও দিতে হচ্ছে।

অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ফুটবলে দর্শকদের আগ্রহের কমতি ছিল না। এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে সিঙ্গাপুর, হংকং ও ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের হোম ম্যাচগুলোতে গ্যালারিতে ছিল উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। গত বছর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এবার সাফে তা বেড়ে আড়াই গুণ হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড জাহিদ হাসান এমিলিও টিকিটের দাম নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা ও ফুটবলপ্রেমীদের আনুষাঙ্গিক ব্যয় বিবেচনা করে কখনোই ১ হাজার টাকা টিকিট বাস্তবসম্মত নয়। আমার কাছে অনেকেই টিকিট নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।’

এমিলির মতে, ‘বাংলাদেশের ম্যাচই মূলত দর্শক হবে। অন্য ম্যাচগুলোতে গ্যালারি ভরবে না। এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচের ব্যবধান আড়াই ঘণ্টা। এতক্ষণ মানুষ কী করবে? ১ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫০০ কিংবা ৬০০ টাকা হলে বিষয়টি যৌক্তিক হতো।’

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কম্পিটিশন কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম গাউসও টিকিটের দাম বেশি বলে স্বীকার করেছেন, ‘অবশ্যই দাম বেশি। কিন্তু এখানে বাফুফের কিছু করার ছিল না। সাফই টিকিটের দাম নির্ধারণ করেছে। আমাদের কাছে প্রস্তাব বা মতামতও চায়নি।’

বিক্রি হয়নি হাজার হাজার টিকিট

টিকিটের দাম যে দর্শকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার প্রমাণ মিলছে বিক্রির হিসাবেও। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্রি শুরুর দুই দিন পরও ১৪ হাজারের বেশি টিকিট অবিক্রীত ছিল। সংরক্ষিত আসন বাদ দিয়েও এত বিপুলসংখ্যক টিকিট অবিক্রীত থাকায় গ্যালারি ফাঁকা থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরেকটি দৈনকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্বোধনী দিনের প্রায় ১১ হাজার টিকিট অবিক্রীত। ২২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার জাতীয় স্টেডিয়ামে অর্ধেকের মতো আসন ফাঁকা থাকতে পারে।

ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠী রেড অ্যান্ড গ্রিন আর্মির রাফি ইকবাল বলেন, ‘টিকিটের মূল্য দেশের মানুষের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ কম।’

তবে টিকিট বিক্রির গতি নিয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যাও এসেছে। সাফের বিপণন সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিএসএ স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী সজিব রশিদ বলেন, ‘টিকিট বিক্রির হার নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। ওয়েবসাইটে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে সিরিয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যার কারণে টিকিট বিক্রির গতি নিয়ে কারও কারও মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।’

প্রচারের ঘাটতি, নেই প্রত্যাশিত উন্মাদনা

এত বড় একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের আগে সাধারণত যে ধরনের প্রচার-প্রচারণা ও উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, ঢাকায় তার ঘাটতি চোখে পড়ছে। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—সাফের খবর সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছেন আয়োজকেরা?

টুর্নামেন্টের বিপণন, সম্প্রচার, পৃষ্ঠপোষকতা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব পেয়েছে টিএসএ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট। টুর্নামেন্টের খেলা সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও হয়েছে। তবে এসব আয়োজনের পাশাপাশি মাঠে দর্শক টানার জন্য আরো দৃশ্যমান প্রচার ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন ফুটবলসংশ্লিষ্টরা।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে গতকাল জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রীতি ম্যাচ খেলেছেন সাবেক ফুটবলাররা। ছবি: মীর ফরিদ

সাবেক ফুটবলারদের নিয়ে গতকাল প্রচারমূলক ম্যাচের আয়োজন করা হলেও সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত সাড়া তৈরি করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভারত পাঠাচ্ছে দ্বিতীয় সারির দল

সাফের আকর্ষণ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতের দল নির্বাচন। শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে এবার প্রথম পছন্দের দল পাঠাচ্ছে না ভারত। ৩০ অক্টোবর ঘোষিত ২৮ সদস্যের দলটির ডাগআউটে দাঁড়াবেন অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ নওশাদ মুসা। অর্থাৎ, জাতীয় দলের প্রধান কোচ খালিদ জামিলের পরিবর্তে দায়িত্ব পেয়েছেন বয়সভিত্তিক দলের কোচ।

ভারতের প্রথম পছন্দের খেলোয়াড়দের অনেকেই থাকছেন না এবারের দলে। কারণ, একই সময়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলবে তারা। ১২ ও ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সেই ম্যাচ দুটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। পাশাপাশি সাফের শুরুর দিকের ম্যাচগুলো ফিফার আন্তর্জাতিক বিরতির বাইরে হওয়ায় ভারতীয় ক্লাবগুলোর কাছ থেকেও সব খেলোয়াড়কে পাওয়া কঠিন হয়েছে।

সাফে অংশ নিতে ঢাকায় দ্বিতীয় সারির দল পাঠাচ্ছে ভারত। ছবি: এআইএফএফ

ভারতের এই সিদ্ধান্তে সাফের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আকর্ষণ কিছুটা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, গত আসরের চ্যাম্পিয়ন দলটিকে নিয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের আগ্রহ বরাবরই বেশি।

তবে ভারত দ্বিতীয় সারির দল পাঠালেও সাফ কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সেভাবে দেখতে রাজি নয়। সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম ক্যাটেল এর আগে বলেছিলেন, ‘ভারত আসবেই। সূচিতে যা প্রকাশ করা হয়েছে, সবকিছু সেভাবেই সব থাকবে। যেহেতু এটি প্রথম সারির প্রতিযোগিতা, তাই তারা যাদেরই পাঠাক না কেন, আমাদের ধরে নিতে হবে এটিই তাদের মূল দল।’

আয়োজকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ

টিকিটের দাম নিয়ে সমর্থকদের অসন্তোষ, টিকিট বিক্রির ধীরগতি, প্রচারের ঘাটতি এবং ভারতের দ্বিতীয় সারির দল—সব মিলিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই অস্বস্তিতে আয়োজকেরা। অথচ বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ একটি বড় ইভেন্ট। ঘরের মাঠে ভালো ফলের পাশাপাশি দর্শকদের মাঠে ফেরানোরও সুযোগ এটি।

২০০৩ সালে সাফে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ, সেটিও নিজেদের মাঠে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবারও ঘরের মাঠে শিরোপার স্বপ্ন দেখছে দল। সেই স্বপ্ন পূরণে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি গ্যালারিতে সমর্থকদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত মাঠে হামজা-শমিতদের পারফরম্যান্স কেমন হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে এর আগে আয়োজকদের জন্য বড় প্রশ্ন—দর্শকদের মাঠে টানতে পারবেন তো তারা?

শুধু টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই যে উৎসবমুখর হয় না; সেখানে ব্যাপক দর্শক উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হয়।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, অথচ দর্শক টানাই দায়

আপডেট সময় ১২:১৭:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকায় আবারও দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। দীর্ঘ আট বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে ফিরছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ।

দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হওয়ার কথা ছিল বড় উৎসব। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সেই উৎসবের আমেজ কোথায়?

মাঠে খেলা দেখার আগ্রহ থাকলেও গ্যালারিতে দর্শক টানার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। প্রচারের ঘাটতি, সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে টিকিটের দাম আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতের দ্বিতীয় সারির দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে সাফের আকর্ষণ যেন অনেকটাই ফিকে।

টিকিট বিক্রির হিসাবেও মিলছে তার আভাস।

ঘরের মাঠে এমন একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করেও দর্শকদের মধ্যে প্রত্যাশিত উন্মাদনা তৈরি করতে পারছেন না আয়োজকেরা।

আগামী ৫ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হবে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। চলবে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত। ছয় দলের এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ রয়েছে ‘এ’ গ্রুপে, সঙ্গে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা।

‘বি’ গ্রুপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতের সঙ্গে আছে পাকিস্তান ও মালদ্বীপ।

কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই আলোচনায় উঠে এসেছে মাঠের বাইরের নানা বিষয়।

টিকিটের দামই কি অনাগ্রহের কারণ

সাফের টিকিটের সর্বনিম্ন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম এত বেশি হওয়ায় ক্ষুব্ধ দেশের ফুটবল সমর্থকেরা। অন্য ক্যাটাগরির টিকিটের দাম আরও বেশি।

ক্লাব হাউসের টিকিট ৪ হাজার, ভিআইপি গ্যালারি ৭ হাজার, রেড বক্স ৮ হাজার এবং কর্পোরেট বক্সের টিকিটের দাম ১০ হাজার টাকা।

একটি টিকিটে একই দিনের দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও সাধারণ দর্শকদের কাছে একসঙ্গে ১ হাজার টাকা খরচ করা সহজ নয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এই দাম বড় বাধা। অনলাইনে টিকিট কিনলে সার্ভিস চার্জও দিতে হচ্ছে।

অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ফুটবলে দর্শকদের আগ্রহের কমতি ছিল না। এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে সিঙ্গাপুর, হংকং ও ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের হোম ম্যাচগুলোতে গ্যালারিতে ছিল উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। গত বছর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এবার সাফে তা বেড়ে আড়াই গুণ হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড জাহিদ হাসান এমিলিও টিকিটের দাম নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা ও ফুটবলপ্রেমীদের আনুষাঙ্গিক ব্যয় বিবেচনা করে কখনোই ১ হাজার টাকা টিকিট বাস্তবসম্মত নয়। আমার কাছে অনেকেই টিকিট নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।’

এমিলির মতে, ‘বাংলাদেশের ম্যাচই মূলত দর্শক হবে। অন্য ম্যাচগুলোতে গ্যালারি ভরবে না। এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচের ব্যবধান আড়াই ঘণ্টা। এতক্ষণ মানুষ কী করবে? ১ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫০০ কিংবা ৬০০ টাকা হলে বিষয়টি যৌক্তিক হতো।’

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কম্পিটিশন কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম গাউসও টিকিটের দাম বেশি বলে স্বীকার করেছেন, ‘অবশ্যই দাম বেশি। কিন্তু এখানে বাফুফের কিছু করার ছিল না। সাফই টিকিটের দাম নির্ধারণ করেছে। আমাদের কাছে প্রস্তাব বা মতামতও চায়নি।’

বিক্রি হয়নি হাজার হাজার টিকিট

টিকিটের দাম যে দর্শকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার প্রমাণ মিলছে বিক্রির হিসাবেও। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্রি শুরুর দুই দিন পরও ১৪ হাজারের বেশি টিকিট অবিক্রীত ছিল। সংরক্ষিত আসন বাদ দিয়েও এত বিপুলসংখ্যক টিকিট অবিক্রীত থাকায় গ্যালারি ফাঁকা থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরেকটি দৈনকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্বোধনী দিনের প্রায় ১১ হাজার টিকিট অবিক্রীত। ২২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার জাতীয় স্টেডিয়ামে অর্ধেকের মতো আসন ফাঁকা থাকতে পারে।

ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠী রেড অ্যান্ড গ্রিন আর্মির রাফি ইকবাল বলেন, ‘টিকিটের মূল্য দেশের মানুষের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ কম।’

তবে টিকিট বিক্রির গতি নিয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যাও এসেছে। সাফের বিপণন সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিএসএ স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী সজিব রশিদ বলেন, ‘টিকিট বিক্রির হার নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। ওয়েবসাইটে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে সিরিয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যার কারণে টিকিট বিক্রির গতি নিয়ে কারও কারও মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।’

প্রচারের ঘাটতি, নেই প্রত্যাশিত উন্মাদনা

এত বড় একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের আগে সাধারণত যে ধরনের প্রচার-প্রচারণা ও উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, ঢাকায় তার ঘাটতি চোখে পড়ছে। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—সাফের খবর সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছেন আয়োজকেরা?

টুর্নামেন্টের বিপণন, সম্প্রচার, পৃষ্ঠপোষকতা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব পেয়েছে টিএসএ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট। টুর্নামেন্টের খেলা সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও হয়েছে। তবে এসব আয়োজনের পাশাপাশি মাঠে দর্শক টানার জন্য আরো দৃশ্যমান প্রচার ও জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন ফুটবলসংশ্লিষ্টরা।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে গতকাল জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রীতি ম্যাচ খেলেছেন সাবেক ফুটবলাররা। ছবি: মীর ফরিদ

সাবেক ফুটবলারদের নিয়ে গতকাল প্রচারমূলক ম্যাচের আয়োজন করা হলেও সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশিত সাড়া তৈরি করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ভারত পাঠাচ্ছে দ্বিতীয় সারির দল

সাফের আকর্ষণ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতের দল নির্বাচন। শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে এবার প্রথম পছন্দের দল পাঠাচ্ছে না ভারত। ৩০ অক্টোবর ঘোষিত ২৮ সদস্যের দলটির ডাগআউটে দাঁড়াবেন অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ নওশাদ মুসা। অর্থাৎ, জাতীয় দলের প্রধান কোচ খালিদ জামিলের পরিবর্তে দায়িত্ব পেয়েছেন বয়সভিত্তিক দলের কোচ।

ভারতের প্রথম পছন্দের খেলোয়াড়দের অনেকেই থাকছেন না এবারের দলে। কারণ, একই সময়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলবে তারা। ১২ ও ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সেই ম্যাচ দুটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)। পাশাপাশি সাফের শুরুর দিকের ম্যাচগুলো ফিফার আন্তর্জাতিক বিরতির বাইরে হওয়ায় ভারতীয় ক্লাবগুলোর কাছ থেকেও সব খেলোয়াড়কে পাওয়া কঠিন হয়েছে।

সাফে অংশ নিতে ঢাকায় দ্বিতীয় সারির দল পাঠাচ্ছে ভারত। ছবি: এআইএফএফ

ভারতের এই সিদ্ধান্তে সাফের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আকর্ষণ কিছুটা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, গত আসরের চ্যাম্পিয়ন দলটিকে নিয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের আগ্রহ বরাবরই বেশি।

তবে ভারত দ্বিতীয় সারির দল পাঠালেও সাফ কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে সেভাবে দেখতে রাজি নয়। সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম ক্যাটেল এর আগে বলেছিলেন, ‘ভারত আসবেই। সূচিতে যা প্রকাশ করা হয়েছে, সবকিছু সেভাবেই সব থাকবে। যেহেতু এটি প্রথম সারির প্রতিযোগিতা, তাই তারা যাদেরই পাঠাক না কেন, আমাদের ধরে নিতে হবে এটিই তাদের মূল দল।’

আয়োজকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ

টিকিটের দাম নিয়ে সমর্থকদের অসন্তোষ, টিকিট বিক্রির ধীরগতি, প্রচারের ঘাটতি এবং ভারতের দ্বিতীয় সারির দল—সব মিলিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই অস্বস্তিতে আয়োজকেরা। অথচ বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ একটি বড় ইভেন্ট। ঘরের মাঠে ভালো ফলের পাশাপাশি দর্শকদের মাঠে ফেরানোরও সুযোগ এটি।

২০০৩ সালে সাফে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ, সেটিও নিজেদের মাঠে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবারও ঘরের মাঠে শিরোপার স্বপ্ন দেখছে দল। সেই স্বপ্ন পূরণে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি গ্যালারিতে সমর্থকদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত মাঠে হামজা-শমিতদের পারফরম্যান্স কেমন হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে এর আগে আয়োজকদের জন্য বড় প্রশ্ন—দর্শকদের মাঠে টানতে পারবেন তো তারা?

শুধু টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই যে উৎসবমুখর হয় না; সেখানে ব্যাপক দর্শক উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হয়।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ