ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ‘আমার বিবেক আমাকে বিচারকের আসনে থাকতে দিচ্ছে না’ Logo আইইডিসিআরের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী Logo ‘ব্যক্তি জীবনে বৈষম্যের শিকার হলেও, পেশাগত জীবনে চর্চা করবেন না’ Logo তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo এলপি গ্যাসের দাম: দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব Logo ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে ইসি অনিয়মের প্রমাণ পায়নি : সিইসি Logo রাজশাহীতে বাড়ির ছাদে কৃষককে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ Logo জাতীয় যুব দিবসে তাৎক্ষণিক ১০০ জনকে চাকরি দেওয়া হবে: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী Logo মানবতাবিরোধী অপরাধ: হানিফের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড Logo উত্তরের চা নার্সারিতে নতুন কর্মসংস্থান, আয় করছেন শিক্ষার্থীরাও

উত্তরের চা নার্সারিতে নতুন কর্মসংস্থান, আয় করছেন শিক্ষার্থীরাও

চায়ের কাঁচা পাতার ভালো দাম, আর সেই সম্ভাবনাকে ঘিরেই পঞ্চগড়ে বাড়ছে চা চাষের পরিধি। নতুন নতুন বাগান গড়ে ওঠায় চাহিদা বাড়ছে চা গাছের চারার। আর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে জেলায় গড়ে উঠেছে চা নার্সারির নতুন ব্যবসা। জেলার সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের লইপাড়া, বিরাজোত, পাতিপাড়া ও বন্দিপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক চা নার্সারি।

এসব নার্সারিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষিশ্রমিক, পাথর-বালুশ্রমিক ও বেকার যুবকদের পাশাপাশি অবসর সময়ে চারা উৎপাদন ও বিক্রির কাজে যুক্ত হয়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। চা চাষের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হয়ে উঠছে এই নার্সারি ব্যবসা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই-তিন বছর আগেও পঞ্চগড়ে চায়ের কাঁচা পাতার কেজি বিক্রি হতো ৮ থেকে ১২ টাকায়। বর্তমানে তা ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাতার ভালো দাম পাওয়ায় পুরোনো বাগানের পাশাপাশি নতুন বাগান তৈরিতেও আগ্রহী হচ্ছেন অনেকে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উন্নতমানের চারার চাহিদা। জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বাইরে থেকে উদ্যোক্তারা চারা কিনতে সাতমেরায় আসছেন।

তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় চায়ের নার্সারি করতে বাঁশ এবং খড় দিয়ে বিশেষভাবে বেড়া দিয়ে উপরেও অল্প ফাঁকা করে বেড়া বা বাঁশের ছাদ দেওয়া হয়েছে। উন্নতমানের চা এবং চায়ের চারা উৎপাদনে এমন আলো-আধারি পরিবেশ তৈরি জরুরি।

এসব বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারলেও প্রচণ্ড রোদ এবং তাপ থেকে রক্ষা করে। ফলে চা চারার গুণগতমান ঠিক থাকে। তবে এসব এলাকায় চায়ের চারা উৎপাদন এখন শুধু কৃষি কাজের সহায়ক কার্যক্রম নয়, স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে নার্সারি ব্যবসা।

একটি চারা উৎপাদন ও পরিচর্যায় খরচ হয় প্রায় ৩ থেকে ৫ টাকা। বছরজুড়ে পরিচর্যার পর সেই চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। অর্থাৎ বিক্রয়মূল্য ও উৎপাদন খরচের ব্যবধান প্রতি চারায় ১৫ থেকে ২২ টাকা। তবে জমি, শ্রম, পরিবহন, অবিক্রীত চারা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়েই প্রকৃত লাভের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

জানা গেছে, পঞ্চগড় পাথর এবং বালু সমৃদ্ধ এলাকা এখানকার বিশ হাজারের বেশি শ্রমিক পাথর এবং বালু উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে সমতল ভূমি থেকে পাথর উত্তোলনে প্রশাসনের বিধি-নিষেধের কারণে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। চায়ের নার্সারিতে চারা উৎপাদনের এই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এসব শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের।

আগে কৃষিকাজ কিংবা পাথর-বালু সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন শ্রমিকদের অনেকেই এখন চা নার্সারি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। ক্ষুদ্র কৃষকরা নিজের উদ্যোগে চারা উৎপাদন করছেন। আবার বেকার যুবকদের কেউ কেউ নার্সারিতে কাজ করে ভাল আয় করছেন। শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে কাজ করে পরিবারের খরচে সহায়তা করতে পারছেন।

সাতমেরা ইউনিয়নের লইপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিদিন কলেজ যেতে হয় না। বাসাতেই টুকটাক কাজ করছিলাম। এখন নার্সারি হওয়াতে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে। আমরা নার্সারিতে চুক্তিভিত্তিক কাজ করি। সব মিলিয়ে দিন শেষে আমরা পাঁচ থেকে সাতশ টাকা পর্যন্ত আয় করি। যারা সারাদিন কাজ করেন, তারা আরও বেশি টাকা পান।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় চা নার্সারির বিস্তার স্থানীয় শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চারা উৎপাদন, পরিচর্যা, বিক্রির প্রস্তুতি ও পরিবহনের মতো কাজে শ্রমের প্রয়োজন হয়। এতে নার্সারি মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকরা কাজ করে ভাল আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে চারা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা নতুন বাগানের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তবে নার্সারি ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা থাকলেও এর সঙ্গে রয়েছে পরিচর্যা, চারা নষ্ট হওয়া, বিক্রির সময় ও বাজারের চাহিদার মতো বিষয়। উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত চারা তৈরি করতে না পারলে প্রত্যাশিত লাভ হয় না।

তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র কৃষক জয়নুল হক বলেন, আমার ছোট একটা চা বাগান ছিল। যখন ৮ টাকা ১০ টাকা কেজিতেও চা বিক্রি হচ্ছিল না, তখন দুই বিঘার চা বাগান তুলে ফেলেছিলাম। বর্তমানে সেই চায়ের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। এখন আমি আবার নতুন করে ওই দুই বিঘাসহ চার বিঘা জমিতে চা শুরু করছি। এজন্য ভালো চারার খোঁজ করছি।

এদিকে নতুন বাগানের জন্য চারা কিনতে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বাইরের উদ্যোক্তারা আসেন সাতমেরায় উৎপাদিত চারা দেখতে। নতুন বাগান করার জন্য চারা সংগ্রহ করতে আসা এসব ক্রেতা নার্সারি ব্যবসার বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছেন। তবে চাহিদা কতটা বেড়েছে, প্রতি মৌসুমে কত চারা বিক্রি হয়, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি চা বোর্ড।

তাদের দাবি, চায়ের কাচা পাতা মূল্যবৃদ্ধির ফলে এখন নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। নতুন করে মানুষ চা বাগান সম্প্রসারণ করছেন।

বাংলাদেশ চা বোর্ড এর পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড সূত্র জানায়, পঞ্চগড়ে চা চাষের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালের উৎপাদন মৌসুমে জেলায় ৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর জমিতে চা চাষ হয়। এ সময়ে ১ হাজার ৫২৮টি নিবন্ধিতসহ ছোট-বড় মোট ৭ হাজার ৩৪৮টি বাগান থেকে ৮ কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ দশমিক ৮৭ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদিত হয়।

জেলার চালু ৩০টি চা কারখানায় উৎপাদিত হয় ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৬ কেজি তৈরি চা। চা চাষের এই বিস্তার নার্সারি ব্যবসার জন্য বড় বাজার তৈরি করছে। নতুন বাগান করতে প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক চারা। আবার মানসম্মত চারা না হলে বাগানের উৎপাদন ও দীর্ঘমেয়াদি ফলনও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না। ফলে চা চাষের সঙ্গে নার্সারি খাতের সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত। বাগানের সংখ্যা ও আবাদি জমি বাড়লে চারার চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে জানায় পঞ্চগড় চা বোর্ড।

বিরাজত এলাকায় চায়ের চারা কিনতে আসা পঞ্চগড় উপজেলা সদরের অমরখানা ইউনিয়নের কাজিরহাট এলাকার মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, আমার আশেপাশের অনেক কৃষক চা বাগান করে বেশ লাভবান হচ্ছেন। অন্য ফসলের তুলনায় বর্তমানে চা চাষ অনেক বেশি লাভজনক। আমি আগে চা বাগান না করে ভুল করেছি। এজন্য নতুন বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছি। জমি প্রায় প্রস্তুত হয়েছে। এখন চায়ের চারা কিনতে এসেছি।

সাতমেরা ইউনিয়নের লইপাড়া এলাকার ক্ষুদ্র কৃষক মোশারফ রহমান বলেন, আমার দশ শতকের দুইটা জায়গায় দুই লাখের বেশি চারা করেছি। এই চারা উৎপাদনে যদিও দুই থেকে তিন টাকা খরচ হয়, কিন্তু পরিচর্যা করতে অপেক্ষা করতে লাগে এক বছর। চায়ের চারা দেখতে ভালো হলে ২২ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত প্রতি পিস বিক্রি হয়।

আমাদের লইপাড়া, বিরাজত, পাতিপারা বন্দি মপাড়া এলাকায় আড়াই থেকে ৩০০ মানুষ এই নার্সারি করেই চারা উৎপাদন করছেন। এখন আসলে নতুন নতুন বাগান হচ্ছে। যেহেতু চায়ের দাম বেশি এজন্যই আমাদের চায়ের চারার চাহিদাও বাড়ছে।

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমির হোসেন বলেন, তিন বছর আগেও পঞ্চগড়ে চায়ের কাঁচা পাতার দাম ৮ থেকে ১০ টাকা ছিল। মূলত অকশন মার্কেটে চায়ের দামের উপর নির্ভর করেই পঞ্চগড়ের কারখানা মালিকরা চায়ের কাঁচা পাতার দাম নির্ধারণ করেন। বর্তমানে অকশন মার্কেটে ভালো দাম পাওয়ায় ক্ষুদ্র চা চাষিরাও চায়ের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। এ কারণে উত্তরাঞ্চল চা চাষ প্রকল্পের আওতায় চা চাষের সম্প্রসারণ হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়ের চা শিল্প এখন শুধু বাগানে পাতা উৎপাদন ও কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চারা উৎপাদন ও বিক্রিকে ঘিরেও তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সাতমেরা ইউনিয়নের বিরাজত লইপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে নার্সারিগুলো সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি মানসম্মত চারা উৎপাদন, বাজার সম্প্রসারণ ও দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে গুরুত্ব দিতে পারেন, তাহলে এই খাতে আরও কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি পঞ্চগড়ের চা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

বাংলা৭১নিউজ/হোসেন

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

‘আমার বিবেক আমাকে বিচারকের আসনে থাকতে দিচ্ছে না’

উত্তরের চা নার্সারিতে নতুন কর্মসংস্থান, আয় করছেন শিক্ষার্থীরাও

আপডেট সময় ০১:২৭:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

চায়ের কাঁচা পাতার ভালো দাম, আর সেই সম্ভাবনাকে ঘিরেই পঞ্চগড়ে বাড়ছে চা চাষের পরিধি। নতুন নতুন বাগান গড়ে ওঠায় চাহিদা বাড়ছে চা গাছের চারার। আর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে জেলায় গড়ে উঠেছে চা নার্সারির নতুন ব্যবসা। জেলার সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের লইপাড়া, বিরাজোত, পাতিপাড়া ও বন্দিপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক চা নার্সারি।

এসব নার্সারিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষিশ্রমিক, পাথর-বালুশ্রমিক ও বেকার যুবকদের পাশাপাশি অবসর সময়ে চারা উৎপাদন ও বিক্রির কাজে যুক্ত হয়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। চা চাষের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হয়ে উঠছে এই নার্সারি ব্যবসা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই-তিন বছর আগেও পঞ্চগড়ে চায়ের কাঁচা পাতার কেজি বিক্রি হতো ৮ থেকে ১২ টাকায়। বর্তমানে তা ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাতার ভালো দাম পাওয়ায় পুরোনো বাগানের পাশাপাশি নতুন বাগান তৈরিতেও আগ্রহী হচ্ছেন অনেকে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উন্নতমানের চারার চাহিদা। জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বাইরে থেকে উদ্যোক্তারা চারা কিনতে সাতমেরায় আসছেন।

তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় চায়ের নার্সারি করতে বাঁশ এবং খড় দিয়ে বিশেষভাবে বেড়া দিয়ে উপরেও অল্প ফাঁকা করে বেড়া বা বাঁশের ছাদ দেওয়া হয়েছে। উন্নতমানের চা এবং চায়ের চারা উৎপাদনে এমন আলো-আধারি পরিবেশ তৈরি জরুরি।

এসব বেড়ার ফাঁক দিয়ে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারলেও প্রচণ্ড রোদ এবং তাপ থেকে রক্ষা করে। ফলে চা চারার গুণগতমান ঠিক থাকে। তবে এসব এলাকায় চায়ের চারা উৎপাদন এখন শুধু কৃষি কাজের সহায়ক কার্যক্রম নয়, স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবেও জায়গা করে নিচ্ছে নার্সারি ব্যবসা।

একটি চারা উৎপাদন ও পরিচর্যায় খরচ হয় প্রায় ৩ থেকে ৫ টাকা। বছরজুড়ে পরিচর্যার পর সেই চারা বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। অর্থাৎ বিক্রয়মূল্য ও উৎপাদন খরচের ব্যবধান প্রতি চারায় ১৫ থেকে ২২ টাকা। তবে জমি, শ্রম, পরিবহন, অবিক্রীত চারা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়েই প্রকৃত লাভের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

জানা গেছে, পঞ্চগড় পাথর এবং বালু সমৃদ্ধ এলাকা এখানকার বিশ হাজারের বেশি শ্রমিক পাথর এবং বালু উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে সমতল ভূমি থেকে পাথর উত্তোলনে প্রশাসনের বিধি-নিষেধের কারণে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। চায়ের নার্সারিতে চারা উৎপাদনের এই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এসব শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের।

আগে কৃষিকাজ কিংবা পাথর-বালু সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন শ্রমিকদের অনেকেই এখন চা নার্সারি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। ক্ষুদ্র কৃষকরা নিজের উদ্যোগে চারা উৎপাদন করছেন। আবার বেকার যুবকদের কেউ কেউ নার্সারিতে কাজ করে ভাল আয় করছেন। শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে কাজ করে পরিবারের খরচে সহায়তা করতে পারছেন।

সাতমেরা ইউনিয়নের লইপাড়া গ্রামের কলেজ শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিদিন কলেজ যেতে হয় না। বাসাতেই টুকটাক কাজ করছিলাম। এখন নার্সারি হওয়াতে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে। আমরা নার্সারিতে চুক্তিভিত্তিক কাজ করি। সব মিলিয়ে দিন শেষে আমরা পাঁচ থেকে সাতশ টাকা পর্যন্ত আয় করি। যারা সারাদিন কাজ করেন, তারা আরও বেশি টাকা পান।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় চা নার্সারির বিস্তার স্থানীয় শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চারা উৎপাদন, পরিচর্যা, বিক্রির প্রস্তুতি ও পরিবহনের মতো কাজে শ্রমের প্রয়োজন হয়। এতে নার্সারি মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিকরা কাজ করে ভাল আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে চারা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা নতুন বাগানের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তবে নার্সারি ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা থাকলেও এর সঙ্গে রয়েছে পরিচর্যা, চারা নষ্ট হওয়া, বিক্রির সময় ও বাজারের চাহিদার মতো বিষয়। উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত চারা তৈরি করতে না পারলে প্রত্যাশিত লাভ হয় না।

তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র কৃষক জয়নুল হক বলেন, আমার ছোট একটা চা বাগান ছিল। যখন ৮ টাকা ১০ টাকা কেজিতেও চা বিক্রি হচ্ছিল না, তখন দুই বিঘার চা বাগান তুলে ফেলেছিলাম। বর্তমানে সেই চায়ের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। এখন আমি আবার নতুন করে ওই দুই বিঘাসহ চার বিঘা জমিতে চা শুরু করছি। এজন্য ভালো চারার খোঁজ করছি।

এদিকে নতুন বাগানের জন্য চারা কিনতে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বাইরের উদ্যোক্তারা আসেন সাতমেরায় উৎপাদিত চারা দেখতে। নতুন বাগান করার জন্য চারা সংগ্রহ করতে আসা এসব ক্রেতা নার্সারি ব্যবসার বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছেন। তবে চাহিদা কতটা বেড়েছে, প্রতি মৌসুমে কত চারা বিক্রি হয়, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি চা বোর্ড।

তাদের দাবি, চায়ের কাচা পাতা মূল্যবৃদ্ধির ফলে এখন নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। নতুন করে মানুষ চা বাগান সম্প্রসারণ করছেন।

বাংলাদেশ চা বোর্ড এর পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড সূত্র জানায়, পঞ্চগড়ে চা চাষের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালের উৎপাদন মৌসুমে জেলায় ৯ হাজার ৮১৯ দশমিক ৭৩ একর জমিতে চা চাষ হয়। এ সময়ে ১ হাজার ৫২৮টি নিবন্ধিতসহ ছোট-বড় মোট ৭ হাজার ৩৪৮টি বাগান থেকে ৮ কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ দশমিক ৮৭ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদিত হয়।

জেলার চালু ৩০টি চা কারখানায় উৎপাদিত হয় ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৬ কেজি তৈরি চা। চা চাষের এই বিস্তার নার্সারি ব্যবসার জন্য বড় বাজার তৈরি করছে। নতুন বাগান করতে প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক চারা। আবার মানসম্মত চারা না হলে বাগানের উৎপাদন ও দীর্ঘমেয়াদি ফলনও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না। ফলে চা চাষের সঙ্গে নার্সারি খাতের সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত। বাগানের সংখ্যা ও আবাদি জমি বাড়লে চারার চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে জানায় পঞ্চগড় চা বোর্ড।

বিরাজত এলাকায় চায়ের চারা কিনতে আসা পঞ্চগড় উপজেলা সদরের অমরখানা ইউনিয়নের কাজিরহাট এলাকার মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, আমার আশেপাশের অনেক কৃষক চা বাগান করে বেশ লাভবান হচ্ছেন। অন্য ফসলের তুলনায় বর্তমানে চা চাষ অনেক বেশি লাভজনক। আমি আগে চা বাগান না করে ভুল করেছি। এজন্য নতুন বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছি। জমি প্রায় প্রস্তুত হয়েছে। এখন চায়ের চারা কিনতে এসেছি।

সাতমেরা ইউনিয়নের লইপাড়া এলাকার ক্ষুদ্র কৃষক মোশারফ রহমান বলেন, আমার দশ শতকের দুইটা জায়গায় দুই লাখের বেশি চারা করেছি। এই চারা উৎপাদনে যদিও দুই থেকে তিন টাকা খরচ হয়, কিন্তু পরিচর্যা করতে অপেক্ষা করতে লাগে এক বছর। চায়ের চারা দেখতে ভালো হলে ২২ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত প্রতি পিস বিক্রি হয়।

আমাদের লইপাড়া, বিরাজত, পাতিপারা বন্দি মপাড়া এলাকায় আড়াই থেকে ৩০০ মানুষ এই নার্সারি করেই চারা উৎপাদন করছেন। এখন আসলে নতুন নতুন বাগান হচ্ছে। যেহেতু চায়ের দাম বেশি এজন্যই আমাদের চায়ের চারার চাহিদাও বাড়ছে।

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমির হোসেন বলেন, তিন বছর আগেও পঞ্চগড়ে চায়ের কাঁচা পাতার দাম ৮ থেকে ১০ টাকা ছিল। মূলত অকশন মার্কেটে চায়ের দামের উপর নির্ভর করেই পঞ্চগড়ের কারখানা মালিকরা চায়ের কাঁচা পাতার দাম নির্ধারণ করেন। বর্তমানে অকশন মার্কেটে ভালো দাম পাওয়ায় ক্ষুদ্র চা চাষিরাও চায়ের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। এ কারণে উত্তরাঞ্চল চা চাষ প্রকল্পের আওতায় চা চাষের সম্প্রসারণ হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে।

তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়ের চা শিল্প এখন শুধু বাগানে পাতা উৎপাদন ও কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চারা উৎপাদন ও বিক্রিকে ঘিরেও তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সাতমেরা ইউনিয়নের বিরাজত লইপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে নার্সারিগুলো সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি মানসম্মত চারা উৎপাদন, বাজার সম্প্রসারণ ও দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে গুরুত্ব দিতে পারেন, তাহলে এই খাতে আরও কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি পঞ্চগড়ের চা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

বাংলা৭১নিউজ/হোসেন