কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় বদলে যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি। শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাজ করতে চ্যাটজিপিটি ও অন্যান্য এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছে।
এ কারণে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, লেখার দক্ষতা ও বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা যাচাইয়ে নতুন কৌশল নিচ্ছেন শিক্ষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাড়িতে করার কাজ কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে হাতে লিখে কাজ করা, আলোচনা ও মৌখিক পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। শুধু সঠিক উত্তর নয়, শিক্ষার্থীরা কীভাবে চিন্তা করে এবং কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তা যাচাই করাই এখন তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।
সান ফ্রান্সিসকোর ষষ্ঠ শ্রেণির মানবিক বিভাগের শিক্ষক ট্রিস্টেন চ্যাং গত বছর থেকে বাড়িতে লিখে জমা দেওয়ার প্রবন্ধের পরিবর্তে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া শুরু করেছেন।
এসব পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের গল্পের চরিত্র, কাহিনি, মূলভাব ও রূপক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।
শিক্ষকদের মতে, বাড়িতে কাজ করার সময় শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর নির্ভর করছে। এ প্রবণতা কমাতে শ্রেণিকক্ষেই লেখালেখি ও অনুশীলনের সময় বাড়ানো হচ্ছে।
নিউইয়র্কের গণিত শিক্ষক ববসন ওং বাড়ির কাজের প্রশ্ন কমিয়ে শ্রেণিকক্ষে অনুশীলনের সুযোগ বাড়িয়েছেন। এতে শিক্ষার্থীরা কীভাবে অঙ্ক সমাধান করছে, তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এআইয়ের প্রভাব মোকাবিলায় কেউ কেউ প্রচলিত প্রশ্নের ধরনও বদলে দিচ্ছেন। কারণ, চ্যাটবটগুলো সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা বা নিজস্ব বিশ্লেষণ চাওয়া হলে সব সময় সমান দক্ষতা দেখাতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের নিজস্ব যুক্তি ও চিন্তাশক্তি প্রকাশের সুযোগ তৈরি করছেন শিক্ষকেরা।
শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও নতুন করে ভাবছেন অনেকে। শিকাগোর উপকণ্ঠের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক রেক্স ওভালে শিক্ষার্থীদের খাতায় হাতে লিখতে উৎসাহিত করেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষে ক্রোমবুক ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। তাঁর মতে, ল্যাপটপ সরিয়ে রাখলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও মনোযোগ আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।
অন্যদিকে, কিছু শিক্ষক পাঠদানের সহায়ক হিসেবেও এআই ব্যবহার করছেন। শিক্ষার্থীদের পড়ার স্তর অনুযায়ী ঐতিহাসিক নথির ভাষা সহজ করা, দীর্ঘ লেখা সংক্ষিপ্ত করা, নির্দিষ্ট বিষয়ের উপকরণ খুঁজে বের করা এবং উপস্থাপনার জন্য ছবি তৈরিতে এআই তাঁদের সাহায্য করছে।
নিউইয়র্কের উপকণ্ঠের শিক্ষক মাইকেল জাগারি শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজ শুরু করতে এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করেন। তাঁর মতে, এআই কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা শেখার মধ্য দিয়েও শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা গড়ে উঠতে পারে।
তবে এআই ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। কেউ শ্রেণিকক্ষে এর ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে, আবার কেউ এর ওপর নির্ভরতা সীমিত রাখতে চান। শিক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে এর দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো জরুরি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের র্যান্ড জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এবং ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা পড়াশোনার কাজে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় এআইয়ের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তা, সৃজনশীলতা ও শেখার দক্ষতা নিশ্চিত করা। এ কারণে এআইয়ের যুগে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























