ঢাকা ০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গাপূজা শেষে কেন দেবীর প্রতিমা পানিতে ভাসানো হয়?

আজ বিজয়া দশমী। পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের শেষ দিনে সিঁদুর খেলা, দেবীবরণ, প্রার্থনা আর বিষণ্ন বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন ভক্তরা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যে সন্তানদের নিয়ে কয়েক দিন কাটিয়ে দেবী ফিরে যান স্বামী মহাদেবের আবাস কৈলাসে। পঞ্জিকা অনুসারে, এ বছর দেবীর আগমন ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়-এমন উল্লেখও রয়েছে। তবে উৎসবের এই বিদায়পর্বে একটি প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে: দেবীকে কেন পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়? এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

দেবীর বিদায়, কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাস
বাংলার দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গাকে শুধু অসুরদলনী শক্তির প্রতীক হিসেবে নয়, ঘরের মেয়ের মতো করেও কল্পনা করা হয়। শরৎকালে তার আগমন যেন বাপের বাড়িতে মেয়ের ফিরে আসা। কয়েক দিন ধরে পূজা, ভোগ, আনন্দ-উৎসব ও নানা আচার পালনের পর দশমীতে তাকে বিদায় জানান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এই আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবীর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাস।

বিজয়া দশমীর দিন পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বের করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে নদী, পুকুর বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রথাকে বলা হয় বিসর্জন বা নিরঞ্জন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও দুর্গাপূজার সমাপ্তি ও দেবীর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

পানিতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার তাৎপর্য কী?
বিসর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো সৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক এবং সবকিছুর পরিবর্তনশীলতা। মাটি দিয়ে তৈরি প্রতিমায় দেবীর রূপ কল্পনা করে পূজা করা হয়। উৎসবের শেষে সেই প্রতিমাকে পানিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে বোঝানো হয়, দৃশ্যমান রূপের সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তের মনে দেবীর প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থেকে যায়।

প্রতিমা নির্মাণে মাটির ব্যবহারও এই ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। মাটি প্রকৃতি থেকে নেওয়া হয়, শিল্পীর হাতে তা দেবীমূর্তির রূপ পায়, আর বিসর্জনের মাধ্যমে সেই রূপ আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়। তবে এই ব্যাখ্যাকে বিসর্জনের একমাত্র ধর্মীয় কারণ বলা ঠিক হবে না। অঞ্চল, পারিবারিক রীতি ও পূজার প্রচলন অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।

বিসর্জনের আগে হয় দর্পণ বিসর্জন
প্রতিমা পানিতে নামানোর আগেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার পালন করা হয় দর্পণ বিসর্জন। এই প্রথায় আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্বের মাধ্যমে প্রতীকী বিসর্জন সম্পন্ন করা হয়। অর্থাৎ প্রতিমাকে জলাশয়ে নিয়ে যাওয়ার আগেই পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্ব শেষ হয়। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপের দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

দেবীকে পানিতে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
দেবীকে পানিতে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
দশমীতে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার মতো রীতিও পালিত হয়। বিবাহিত নারীরা দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে মিষ্টি নিবেদন করেন, তারপর একে অপরকে সিঁদুর মাখিয়ে শুভকামনা জানান। তবে এসব রীতির প্রচলন পরিবার ও অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে।

বিসর্জনেও রয়েছে পরিবেশের কথা
ঐতিহ্যগতভাবে মাটির প্রতিমা পানিতে বিসর্জন দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। প্লাস্টার অব প্যারিস, রাসায়নিক রং, প্লাস্টিক ও অন্যান্য অবিয়োজ্য উপকরণ জলাশয়ের দূষণ বাড়াতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব প্রতিমা তৈরি এবং বিসর্জনের পর জলাশয় থেকে বাঁশ, কাপড়, প্লাস্টিক ও অন্যান্য সাজসজ্জার সামগ্রী তুলে ফেলা জরুরি। আসামের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের পরিবেশবান্ধব দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত নির্দেশিকায় প্রাকৃতিক মাটি ব্যবহার, বিষাক্ত রাসায়নিক রং এড়িয়ে চলা এবং অবিয়োজ্য সাজসজ্জার সামগ্রী ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিদায় মানেই শেষ নয়
দুর্গাপূজার বিসর্জন একদিকে ধর্মীয় আচার, অন্যদিকে বাঙালির আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিমা পানিতে মিশে গেলেও উৎসবের স্মৃতি, পারস্পরিক শুভেচ্ছা এবং পরের বছর আবার দেবীর আগমনের অপেক্ষা থেকে যায়। তাই বিসর্জনের সময় আনন্দের পাশাপাশি মন খারাপও দেখা যায়। ‘আসছে বছর আবার হবে’ এই প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই শেষ হয় দুর্গোৎসবের একটি পর্ব, শুরু হয় পরের বছরের অপেক্ষা।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস

Tag :

দুর্গাপূজা শেষে কেন দেবীর প্রতিমা পানিতে ভাসানো হয়?

আপডেট সময় ১১:৫০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

আজ বিজয়া দশমী। পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের শেষ দিনে সিঁদুর খেলা, দেবীবরণ, প্রার্থনা আর বিষণ্ন বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাচ্ছেন ভক্তরা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যে সন্তানদের নিয়ে কয়েক দিন কাটিয়ে দেবী ফিরে যান স্বামী মহাদেবের আবাস কৈলাসে। পঞ্জিকা অনুসারে, এ বছর দেবীর আগমন ঘোড়ায় এবং গমন নৌকায়-এমন উল্লেখও রয়েছে। তবে উৎসবের এই বিদায়পর্বে একটি প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে: দেবীকে কেন পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়? এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

দেবীর বিদায়, কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাস
বাংলার দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গাকে শুধু অসুরদলনী শক্তির প্রতীক হিসেবে নয়, ঘরের মেয়ের মতো করেও কল্পনা করা হয়। শরৎকালে তার আগমন যেন বাপের বাড়িতে মেয়ের ফিরে আসা। কয়েক দিন ধরে পূজা, ভোগ, আনন্দ-উৎসব ও নানা আচার পালনের পর দশমীতে তাকে বিদায় জানান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এই আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবীর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাস।

বিজয়া দশমীর দিন পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর প্রতিমা মণ্ডপ থেকে বের করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে নদী, পুকুর বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রথাকে বলা হয় বিসর্জন বা নিরঞ্জন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও দুর্গাপূজার সমাপ্তি ও দেবীর কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিমা বিসর্জনের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।

পানিতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার তাৎপর্য কী?
বিসর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো সৃষ্টির সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক এবং সবকিছুর পরিবর্তনশীলতা। মাটি দিয়ে তৈরি প্রতিমায় দেবীর রূপ কল্পনা করে পূজা করা হয়। উৎসবের শেষে সেই প্রতিমাকে পানিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে বোঝানো হয়, দৃশ্যমান রূপের সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তের মনে দেবীর প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থেকে যায়।

প্রতিমা নির্মাণে মাটির ব্যবহারও এই ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। মাটি প্রকৃতি থেকে নেওয়া হয়, শিল্পীর হাতে তা দেবীমূর্তির রূপ পায়, আর বিসর্জনের মাধ্যমে সেই রূপ আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়। তবে এই ব্যাখ্যাকে বিসর্জনের একমাত্র ধর্মীয় কারণ বলা ঠিক হবে না। অঞ্চল, পারিবারিক রীতি ও পূজার প্রচলন অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।

বিসর্জনের আগে হয় দর্পণ বিসর্জন
প্রতিমা পানিতে নামানোর আগেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার পালন করা হয় দর্পণ বিসর্জন। এই প্রথায় আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্বের মাধ্যমে প্রতীকী বিসর্জন সম্পন্ন করা হয়। অর্থাৎ প্রতিমাকে জলাশয়ে নিয়ে যাওয়ার আগেই পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্ব শেষ হয়। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপের দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

দেবীকে পানিতে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
দেবীকে পানিতে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
দশমীতে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার মতো রীতিও পালিত হয়। বিবাহিত নারীরা দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে মিষ্টি নিবেদন করেন, তারপর একে অপরকে সিঁদুর মাখিয়ে শুভকামনা জানান। তবে এসব রীতির প্রচলন পরিবার ও অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে।

বিসর্জনেও রয়েছে পরিবেশের কথা
ঐতিহ্যগতভাবে মাটির প্রতিমা পানিতে বিসর্জন দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। প্লাস্টার অব প্যারিস, রাসায়নিক রং, প্লাস্টিক ও অন্যান্য অবিয়োজ্য উপকরণ জলাশয়ের দূষণ বাড়াতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব প্রতিমা তৈরি এবং বিসর্জনের পর জলাশয় থেকে বাঁশ, কাপড়, প্লাস্টিক ও অন্যান্য সাজসজ্জার সামগ্রী তুলে ফেলা জরুরি। আসামের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের পরিবেশবান্ধব দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত নির্দেশিকায় প্রাকৃতিক মাটি ব্যবহার, বিষাক্ত রাসায়নিক রং এড়িয়ে চলা এবং অবিয়োজ্য সাজসজ্জার সামগ্রী ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিদায় মানেই শেষ নয়
দুর্গাপূজার বিসর্জন একদিকে ধর্মীয় আচার, অন্যদিকে বাঙালির আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিমা পানিতে মিশে গেলেও উৎসবের স্মৃতি, পারস্পরিক শুভেচ্ছা এবং পরের বছর আবার দেবীর আগমনের অপেক্ষা থেকে যায়। তাই বিসর্জনের সময় আনন্দের পাশাপাশি মন খারাপও দেখা যায়। ‘আসছে বছর আবার হবে’ এই প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই শেষ হয় দুর্গোৎসবের একটি পর্ব, শুরু হয় পরের বছরের অপেক্ষা।

বাংলা৭১নিউজ/জেএস