সারাদিন ভালো কাটানোর জন্য সুন্দর একটি সকালের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই যদি মন খারাপ লাগে, শরীরে ক্লান্তি থাকে কিংবা মাথায় ঘুরতে থাকে একরাশ দুশ্চিন্তা, তাহলে দিনের শুরুটাই হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তিকর। এর প্রভাব পড়তে পারে সারাদিনের কাজ, মনোযোগ ও মানসিক অবস্থার ওপরও।
অনেকেই মনে করেন, সকালটা সুন্দর করতে হলে সকালের রুটিনে পরিবর্তন আনতে হবে। কিন্তু দিনের শুরু ভালো করার প্রস্তুতি নেওয়া যায় আগের রাত থেকেই। রাতে ঘুমানোর আগে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে মানসিক চাপ কমাতে, ঘুমের প্রস্তুতি নিতে এবং সকালে সতেজ অনুভব করতে সাহায্য হতে পারে।
জেনে নেওয়া যাক সকালে মেজাজ ভালো রাখতে রাতে কোন অভ্যাস গড়ে তুলবেন-
সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হোন
সারাদিন কাজের ব্যস্ততায় শরীর ও মন দুটিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দিনের শেষে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলে সেই ক্লান্তি ও মানসিক চাপ সামলাতে সুবিধা হতে পারে। রাতের খাবারের পর নিজের সুবিধামতো কিছুক্ষণ হেঁটে আসুন। চাইলে সন্ধ্যায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
নিয়মিত হাঁটাহাঁটি শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি মেজাজ ভালো রাখতে এবং মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে। হাঁটার সময় দিনের নানা ঘটনা নিয়ে ভাবতে পারেন, পরের দিনের কাজের পরিকল্পনা করতে পারেন কিংবা পরিচিত পরিবেশ থেকে কিছুটা সময় দূরে থেকে নিজের মতো থাকতে পারেন। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব জোরে ব্যায়াম না করাই ভালো, বিশেষ করে যদি তাতে ঘুম আসতে দেরি হয়।
ঘুমানোর আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন
বিছানায় শুয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু ফোনের আলো, উত্তেজক কনটেন্ট এবং অনবরত নোটিফিকেশন ঘুমের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে ঘুমাতে দেরি হতে পারে, ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে।
তাই ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটার ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে ফোনটি বিছানা থেকে দূরে রাখুন। অ্যালার্মের জন্য ফোন ব্যবহার করার পরিবর্তে সাধারণ অ্যালার্ম ঘড়ি রাখতে পারেন। এতে ঘুমানোর আগে অকারণে ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতাও কমবে।
এই সময়টুকু বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করে কাটাতে পারেন। ঘুমের আগে এমন শান্ত পরিবেশ তৈরি করলে মন ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
দিন শেষে উষ্ণ পানি দিয়ে গোসল করুন
সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে উষ্ণ পানি দিয়ে গোসল করতে পারেন। দিনের শেষে এটি শরীরকে আরাম দিতে পারে এবং ঘুমের প্রস্তুতিতেও সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর আগে উষ্ণ পানিতে গোসল বা স্নান করলে ঘুম আসতে সুবিধা হতে পারে। তবে এর প্রভাব ব্যক্তি ও গোসলের সময়ের ওপর নির্ভর করে।
ঘুমানোর প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে কুসুম গরম পানিতে গোসল করে দেখতে পারেন। খুব গরম পানি ব্যবহার না করাই ভালো। গোসলের পর আরামদায়ক পোশাক পরে আলো কমিয়ে শান্ত পরিবেশে কিছুক্ষণ সময় কাটান।
প্রতিদিন রাতে গোসল করা সম্ভব না হলে হালকা গরম পানিতে হাত-পা ও মুখ ধুয়ে নিতে পারেন। পরিচ্ছন্নতা ও আরামের এই ছোট অভ্যাস দিনের ব্যস্ততা থেকে রাতের বিশ্রামে প্রবেশ করতে সাহায্য করতে পারে।
বডি স্ক্যান অনুশীলন করুন
সারাদিনের ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা ও নানা চিন্তার কারণে অনেক সময় বিছানায় শুয়েও মন শান্ত হতে চায় না। এ ক্ষেত্রে বডি স্ক্যান বা শরীরের বিভিন্ন অংশের অনুভূতির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার অনুশীলন কাজে আসতে পারে। এটি মনোযোগ ও সচেতনতা বাড়ানোর একটি সহজ পদ্ধতি।
বিছানায় আরাম করে শুয়ে চোখ বন্ধ করুন। প্রথমে মাথা ও মুখের দিকে মনোযোগ দিন। এরপর ধীরে ধীরে ঘাড়, কাঁধ, হাত, বুক, পেট, কোমর, পা ও পায়ের আঙুলের অনুভূতি খেয়াল করুন। কোথাও টান, অস্বস্তি কিংবা চাপ অনুভব করলে সেটি পরিবর্তন করার জন্য জোর করবেন না। শুধু অনুভূতিটি লক্ষ করুন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন।
প্রতিদিন রাতে পাঁচ থেকে দশ মিনিট এই অনুশীলন করতে পারেন।
নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস বা সচেতন মনোযোগের চর্চা মানসিক চাপ কমাতে এবং ঘুমের সমস্যায় কিছু মানুষের উপকার করতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দিনের ছোট অর্জনগুলোকে স্বীকৃতি দিন
দিন শেষে শুধু কী কী কাজ বাকি রয়ে গেল, তা নিয়ে ভাবলে দুশ্চিন্তা আরও বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে দিনের ইতিবাচক দিকগুলোও মনে করার চেষ্টা করুন। কোন কাজটি শেষ করতে পেরেছেন, কোন সমস্যার সমাধান করেছেন কিংবা নতুন কী শিখেছেন-এসব বিষয় নিয়ে কয়েক মিনিট ভাবুন।
চাইলে একটি ডায়েরিতে প্রতিদিন তিনটি ভালো লাগার ঘটনা লিখে রাখতে পারেন। যেমন, প্রিয় মানুষের সঙ্গে সুন্দর একটি কথোপকথন, সহকর্মীর কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতা কিংবা নিজের পছন্দের এক কাপ চা পান করার মুহূর্ত। ছোট ঘটনা হলেও সেগুলোকে গুরুত্ব দিন।
সকালে খালি পেটে জিরা ভেজানো পানি পান করলে কী হয়?
সকালে সতেজ ও প্রফুল্ল অনুভব করার জন্য রাতের অভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠা, ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা এবং রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে মন ভালো থাকবেই, এমন নয়। তবে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে ঘুমের মান ও দৈনন্দিন সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড, হিন্দুস্তান টাইমস
বাংলা৭১নিউজ/জেএস



























