মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেন যাঁরা যুগপৎ সৃষ্টি এবং ধ্বংসের চাবিকাঠি হাতে নিয়ে হাঁটেন। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ছিলেন তেমনই এক ধ্রুপদী চরিত্র। যিনি একাধারে ছিলেন যন্ত্রকৌশলী, সফল শিল্পপতি এবং ৩৫৫টি পেটেন্টের অধিকারী এক অনন্য উদ্ভাবক। তাঁর তৈরি ডিনামাইট পাহাড় কেটে রাস্তা বা সুড়ঙ্গ বানানোর মতো জনকল্যাণমূলক কাজকে যতটা সহজ করেছিল, তেমনি মানুষের হীন মানসিকতার কারণে তা যুদ্ধের ময়দানে হয়ে উঠেছিল ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই এক অদ্ভুত মোড় নেয় তাঁর জীবন—যেখান থেকে জন্ম নেয় মানবতার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ‘নোবেল পুরস্কার’।
জন্ম, ছেলেবেলা ও শিক্ষা
আলফ্রেড বের্নহার্ড নোবেল ২১ অক্টোবর ১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন প্রতিভাবান প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক এবং মাতা আন্দ্রিয়েট আহলসেল। মা-বাবার আট সন্তানের মধ্যে আলফ্রেড ছিলেন চতুর্থ, তবে ভাইবোনদের মধ্যে কেবল আলফ্রেডসহ চারজন ভাই (রবার্ট, লুদভিগ, আলফ্রেড ও এমিল) প্রাপ্তবয়স্ক বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
আলফ্রেডের শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও অসুস্থতার মধ্য দিয়ে। তাঁর জন্মের বছরই তাঁর বাবা ব্যবসায়িকভাবে দেউলিয়া হয়ে যান। আলফ্রেড শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল ও অসুস্থ ছিলেন যে তাঁর বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় ছিল। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তাঁর পিতা ১৮৩৭ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে চলে যান এবং সেখানে খনি ও সামরিক অস্ত্র তৈরির ব্যবসা শুরু করে সফল হন। ১৮৪২ সালে পুরো পরিবার রাশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। আর্থিক সচ্ছলতা আসায় আলফ্রেড ও তাঁর ভাইয়েরা প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের বদলে গৃহশিক্ষকদের কাছে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আলফ্রেড রসায়ন শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং সুইডিশের পাশাপাশি ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও রুশ ভাষায় সাবলীল দক্ষতা অর্জন করেন।
সংগ্রামী জীবন ও ডিনামাইট গবেষণা
তরুণ বয়সে আলফ্রেডকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিস ও আমেরিকায় পাঠানো হয়। প্যারিসে থাকাকালীন তাঁর পরিচয় হয় ইতালীয় রসায়নবিদ আসকানিও সোব্রেরোর সাথে, যিনি অত্যন্ত বিপজ্জনক তরল বিস্ফোরক ‘নাইট্রোগ্লিসারিন’ আবিষ্কার করেছিলেন। আলফ্রেড এই বিস্ফোরককে কীভাবে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য উপায়ে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
১৮৫৯ সালে ক্রিলিয়ার যুদ্ধের পর তাঁর বাবার ব্যবসা আবার লাটে ওঠে এবং তাঁরা সুইডেনে ফিরে আসেন। সেখানে আলফ্রেড একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করে নাইট্রোগ্লিসারিন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু ১৮৬৪ সালে এক ভয়াবহ গবেষণাগার বিস্ফোরণে আলফ্রেডের ছোট ভাই এমিল নোবেলসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান। এই ট্র্যাজেডিতে স্টকহোম শহর কর্তৃপক্ষ শহরের মধ্যে বিস্ফোরক তৈরি নিষিদ্ধ করে দেয়।
ব্যর্থতা ও শোক সত্ত্বেও আলফ্রেড দমে যাননি। তিনি একটি লেকের ওপর নৌকায় ভাসমান ল্যাবরেটরি তৈরি করে গবেষণা চালিয়ে যান। অবশেষে ১৮৬৬ সালে তিনি নাইট্রোগ্লিসারিনের সাথে ‘কিসেলগুড়’ (এক ধরনের নরম ছিদ্রযুক্ত মাটি) মিশিয়ে একে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ রূপ দিতে সক্ষম হন, যার নাম দেওয়া হয় ডিনামাইট। ১৮৬৭ সালে তিনি এর পেটেন্ট লাভ করেন।
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন
ব্যবসায়িক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য পেলেও আলফ্রেড নোবেলের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত একাকী এবং দুঃখজনক। তিনি আজীবন অবিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। তিনি কবি ও লেখক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাবার ইচ্ছায় বিজ্ঞানী হন। ভাইদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক থাকলেও কর্মব্যস্ততার কারণে তিনি অধিকাংশ সময় বিভিন্ন দেশে একা একা ঘুরে বেড়াতেন। একবার তিনি তাঁর ভাইয়ের স্ত্রীকে চিঠিতে লিখেছিলেন:
“আমি জীবনের সমুদ্রে কম্পাসহীন এক ধ্বংসাবশেষ, যাকে আনন্দ দেওয়ার মতো কোনো স্মৃতি নেই…”
তাঁর জীবনে অস্ট্রিয়ান শান্তিকামী নারী বের্থা ফন সুটনার-এর ব্যাপক প্রভাব ছিল, যিনি কিছুদিন তাঁর সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর আজীবন বন্ধু ছিলেন।
মৃত্যুর সওদাগর মৃত ও নোবেল পুরস্কারের উইল
পৃথিবীর ২০টিরও বেশি দেশে আলফ্রেড নোবেলের প্রায় ৯০ থেকে ১০০টি বিস্ফোরক ও অস্ত্রের কারখানা ছিল এবং তাঁর নামে ৩৫৫টি পেটেন্ট ছিল। এর মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পত্তির মালিক হন। ১৮৮৮ সালে তাঁর বড় ভাই লুদভিগ নোবেল ফ্রান্সে মারা যান। কিন্তু একটি ফরাসি সংবাদপত্র ভুলবশত আলফ্রেড নোবেল মারা গেছেন ভেবে শিরোনাম ছাপে—”মৃত্যুর সওদাগর মৃত”। সংবাদপত্রে নিজের এই কুখ্যাতি দেখে আলফ্রেড স্তম্ভিত ও মর্মাহত হন। তিনি ভাবলেন, ডিনামাইট তিনি পাহাড় কেটে রাস্তা ও খনি খননের মতো মানবকল্যাণের জন্য তৈরি করেছিলেন, কিন্তু মানুষ একে যুদ্ধের মরণাস্ত্র হিসেবে দেখছে।
মৃত্যুর পর মানুষ যেন তাঁকে ঘৃণায় স্মরণ না করে, সেজন্য তিনি তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি তাঁর শেষ উইল সই করেন। উইলে তিনি তাঁর মোট সম্পত্তির ৯৪ শতাংশ (যা তৎকালীন সময়ে প্রায় ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা ছিল) একটি ফান্ডে দান করে যান। সিদ্ধান্ত হয়, এই ফান্ডের লভ্যাংশ থেকে প্রতি বছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং শান্তিতে মানবজাতির কল্যাণে অনন্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হবে।
মৃত্যু
১০ ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে ইতালির সান রেমোতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক) জনিত কারণে ৬৩ বছর বয়সে এই মহান বিজ্ঞানী ও দানবীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯০১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বখ্যাত নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়।


























