খাবারের স্বাদে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। তবে বাঙালির রসনাবিলাসের গল্প শুধু স্বাদ আর ঘ্রাণে সীমাবদ্ধ নয়, খাবারের নামেও আছে বৈচিত্র্য।
কোনো খাবারের নাম শুনে কৌতূহল জাগে, কোনোটি আবার নামের কারণেই মনে গেঁথে যায়। খেতাপুড়ি, কানমুচড়ি, ছ্যাঁচড়া কিংবা আউড়-বাউড়—এমন সব নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলার আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতির নানা গল্প।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে খাবারের অভ্যাস। শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের হাট, মেলা কিংবা পারিবারিক আয়োজন—দেশি খাবারের জায়গা অনেক ক্ষেত্রেই দখল করেছে বার্গার, পিৎজা ও নানা বিদেশি পদ।
তবু বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ ও নামের বৈচিত্র্য আজও আলাদা আকর্ষণ ধরে রেখেছে। এসব খাবারের কোনোটি ঝাল, কোনোটি মিষ্টি, আবার কোনোটি তৈরি হয় ঘরে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়েই।
নাম শুনে অবাক হওয়ার পাশাপাশি এসব খাবারের উপকরণ, তৈরির ধরন ও খাওয়ার রীতিও বেশ মজার। চলুন, পরিচিত-অপরিচিত এমন কয়েকটি খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।
খেতাপুড়ি
নাম শুনে সাধারণ পুরির কথা মনে হলেও খেতাপুড়ি তৈরির ধরন ও পুরের বৈচিত্র্য একে আলাদা করে তোলে। ময়দার খামিরে ডাল বা মাংসের মশলাদার পুর দিয়ে তৈরি করা হয় এই খাবার। এরপর বড় করে বেলে ভাঁজ করে গরম তেলে ভাজা হয়। মচমচে খেতাপুড়ি ঝাল আলুর দম কিংবা চাটনির সঙ্গে খেতে বেশ জমে।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকান কিংবা ময়মনসিংহ অঞ্চলে এ ধরনের খাবারের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে।
তবে এর প্রচলন ও প্রস্তুতপ্রণালি এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে।
ছ্যাঁচড়া
নামটি শুনলে একটু অদ্ভুত লাগলেও ছ্যাঁচড়া বাঙালির পরিচিত ঐতিহ্যবাহী রান্নার একটি। মাছের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে নানা ধরনের শাকসবজি মিশিয়ে রান্না করা হয় এ পদ। মাছের মাথা, লেজ বা অন্যান্য অংশের সঙ্গে কচুর লতি, লাউ কিংবা কুমড়োর মতো সবজি ব্যবহার করা হয় অনেক রেসিপিতে।
মসলা দিয়ে কষিয়ে রান্না করলে তৈরি হয় মাখামাখা পদটি। গরম ভাতের সঙ্গে ছ্যাঁচড়া খাওয়ার চল রয়েছে বাঙালির ঘরোয়া রান্নায়। মাছ ও সবজি একসঙ্গে কাজে লাগানোর এই রীতিতে খাবারের অপচয় কমানোর ঐতিহ্যও ফুটে ওঠে।
আউড়-বাউড়
নামটির মধ্যেই রয়েছে ছন্দের খেলা। আউড়-বাউড় নামে পরিচিত খাবারটির উপকরণ ও প্রস্তুতপ্রণালি অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। গ্রামীণ বাংলার নানা ধরনের মুড়ি, খৈ, গুড় ও নারকেল দিয়ে তৈরি মিষ্টি নাশতার সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়।
গুড়ের সঙ্গে খৈ বা মুড়ি মিশিয়ে, কখনো নারকেল ও তিল যোগ করে ছোট ছোট আকারে তৈরি করা হয় এ ধরনের খাবার। শীতের বিকেল, গ্রামীণ মেলা কিংবা চায়ের আড্ডায় এমন মিষ্টি নাশতার আলাদা আবেদন রয়েছে।
কানমুচড়ি বা কানমোচড়া
নাম শুনেই মনে হতে পারে, খাবারটির আকৃতির সঙ্গে কানের কোনো সম্পর্ক রয়েছে। কানমুচড়ি বা কানমোচড়া নামে পরিচিত খাবারের আঞ্চলিক ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত। তবে বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ময়দা বা বেসনের খামির দিয়ে পেঁচানো, ভাঁজ করা কিংবা বিশেষ আকৃতির মচমচে নাশতা তৈরির প্রচলন রয়েছে।
এ ধরনের খাবার ভেজে নোনতা মসলা কিংবা মিষ্টি রসের সঙ্গে পরিবেশন করা হতে পারে। নামের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি এর আকৃতি ও স্বাদও খাবারটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
সেঁউড় বা সেউ
বিকেলের নাশতায় মুড়ির সঙ্গে মচমচে কিছু থাকলে মন্দ হয় না। সেঁউড় বা সেউ নামে পরিচিত খাবারটি সেই ধরনের নাশতার কথা মনে করিয়ে দেয়। বেসন বা অনুরূপ উপকরণ দিয়ে তৈরি মিশ্রণ বিশেষ ছাঁচের সাহায্যে গরম তেলে ভেজে নেওয়া হয়। এতে তৈরি হয় ঝুরঝুরে, মচমচে নাশতা।
লবণ ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি এ ধরনের খাবার মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা চায়ের সঙ্গে খাওয়া যায়। তবে সেঁউড়ের উপকরণ ও নামের ব্যবহার অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে।
লেডি কেনি
বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির তালিকায় রয়েছে লেডি কেনি। নামটি যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস। কথিত আছে, ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংয়ের স্ত্রী শার্লট ক্যানিংয়ের নাম থেকেই মিষ্টিটির নাম হয়েছে লেডি কেনি।
ছানা, ময়দা বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি ছোট গোল কিংবা ডিম্বাকৃতির মিষ্টি তেলে ভেজে চিনির রসে ডোবানো হয়। তবে রেসিপি ও আকৃতিতে মিষ্টির দোকানভেদে পার্থক্য থাকতে পারে। উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা মিষ্টিমুখের আয়োজনে এ ধরনের মিষ্টির কদর রয়েছে।
বালুশাই
বালুশাই বাংলার পরিচিত মিষ্টিগুলোর একটি। ময়দা, ঘি ও দই দিয়ে তৈরি খামির থেকে গোল চাকতির মতো আকৃতি বানিয়ে মাঝখানে সামান্য গর্ত করা হয়। এরপর ধীরে ভেজে চিনির রসে ডোবানো হয়।
বাইরের অংশে হালকা খসখসে ভাব এবং ভেতরে নরম, স্তরযুক্ত গঠন—এই বৈশিষ্ট্য বালুশাইকে অন্য মিষ্টি থেকে আলাদা করে। চায়ের সঙ্গে কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এটি পরিবেশন করা হয়।
পান্তুয়া
পান্তুয়া নামটিও বাঙালির মিষ্টির জগতে বেশ পরিচিত। ছানা, সুজি বা মিষ্টি তৈরির উপযোগী অন্যান্য উপকরণ মেখে ছোট গোল আকার তৈরি করা হয়। এরপর ডুবো তেলে ভেজে চিনির রসে ডুবিয়ে রাখা হয়।
ভাজার সময় মিষ্টিটির গায়ে লালচে বা বাদামি রং আসে। রস শুষে নেওয়ার পর ভেতরটা হয় নরম ও মিষ্টি। বাংলার নানা অঞ্চলের মিষ্টির দোকান ও উৎসবের আয়োজনে পান্তুয়ার দেখা মেলে।
নামের বৈচিত্র্যেই বাংলার খাদ্যসংস্কৃতির গল্প
বাংলার খাবারের জগৎ শুধু পরিচিত ভাত, মাছ, ডাল কিংবা মিষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়। অঞ্চলভেদে উপকরণ, রান্নার পদ্ধতি ও ভাষার পার্থক্যে তৈরি হয়েছে নানা খাবার। কোনো নাম এসেছে খাবারের আকৃতি থেকে, কোনোটি স্থানীয় উচ্চারণ বা প্রচলিত শব্দ থেকে; আবার কিছু খাবারের নামের পেছনে রয়েছে ইতিহাস।
বিদেশি খাবারের জনপ্রিয়তার মধ্যেও দেশি খাবারের এই বৈচিত্র্য ধরে রাখা জরুরি। কারণ, একটি খাবার কেবল ক্ষুধা মেটায় না—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, এলাকার পরিচয় ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা ঐতিহ্য।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ





























