গিটারের তারে আজও বাজে তার স্মৃতি, গানে গানে ফিরে আসে চেনা সেই কণ্ঠ। সময়ের নিয়মে আট বছর আগে থেমে গেছে তার জীবন, কিন্তু থামেনি সংগীতের পথচলা।
বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু নেই, অথচ তার গান আজও ছুঁয়ে যায় শ্রোতাদের হৃদয়। আজ ১৮ অক্টোবর, এই রক কিংবদন্তির অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই সংগীতশিল্পী।
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আইয়ুব বাচ্চু।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর সংগীতের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল ছোটবেলাতেই। কিশোর বয়সে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘গোল্ডেন বয়েজ’ নামের একটি ব্যান্ড। পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আগলি বয়েজ’। সেই ব্যান্ডে গিটার বাজাতেন আইয়ুব বাচ্চু, আর কণ্ঠশিল্পী ছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ।
পরবর্তী সময়ে ‘সোলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংগীতজগতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন তিনি। এরপর ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ বা ‘এলআরবি’। এই ব্যান্ডের হাত ধরেই বাংলা রকসংগীতে তৈরি করেন নিজস্ব ধারা। গায়ক হিসেবে যেমন পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়তা, তেমনি গিটারবাদক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনন্য উচ্চতায়।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় গান ও অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু।
তার একক অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘রক্ত গোলাপ’, ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘প্রেম তুমি কী’, ‘পথের গান’, ‘জীবন’ ও ‘জীবনের গল্প’। অন্যদিকে, এলআরবির সঙ্গে তাঁর উল্লেখযোগ্য অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘স্বপ্ন’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘অচেনা জীবন’ ও ‘স্পর্শ’।
‘সেই তুমি’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘মেয়ে’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’ কিংবা ‘এক আকাশের তারা’—তার গাওয়া এমন অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। প্রেম, বিরহ, একাকিত্ব আর জীবনের নানা অনুভূতি তাঁর গানে এমনভাবে ধরা দিয়েছে, যা শ্রোতাদের সঙ্গে তৈরি করেছে গভীর এক আবেগের সম্পর্ক। সময় বদলেছে, বদলেছে শ্রোতাদের রুচি; কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর গানের প্রতি ভালোবাসা রয়ে গেছে আগের মতোই।
শুধু কণ্ঠের জাদুতে নয়, গিটারের তারেও তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক জগৎ। রক ও ব্লুজ সংগীতে তার দক্ষতা বাংলা ব্যান্ডসংগীতকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। মঞ্চে গিটার হাতে তার উপস্থিতি, দীর্ঘ গিটার সোলো আর প্রাণবন্ত পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। তাঁর গিটার বাজানোর সেই অনন্য ভঙ্গি আজও সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন।
আইয়ুব বাচ্চুর চলে যাওয়ার আট বছর পরও রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংগীত আয়োজনে নিয়মিত বাজে তার গান। নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করছেন বাংলা রকসংগীতের এক সমৃদ্ধ অধ্যায়। তাঁর গান কখনো হয়ে ওঠে পুরোনো দিনের স্মৃতি, কখনো মনের গোপন কষ্টের সঙ্গী, আবার কখনো নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা।
রুপালি গিটার হাতে সেই মানুষটি আর কোনো দিন মঞ্চে ফিরবেন না। নতুন কোনো গান নিয়ে মাতাবেন না কনসার্টের মঞ্চ। তবু তার সুর থেমে নেই, থেমে নেই গিটারের অনুরণন। অসংখ্য কালজয়ী গান আর ভক্তদের অফুরন্ত ভালোবাসায় আইয়ুব বাচ্চু আজও বাংলা সংগীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মৃত্যু তাকে দূরে সরিয়ে দিলেও সংগীতের ভুবনে তিনি চিরকাল অমর।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























