সঙ্গীর খোঁজে আফ্রিকান বন্য কুকুরের একটি দল পাড়ি দিয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার। কখনো জঙ্গল, কখনো মানুষের বসতি, আবার কখনো বড় শহর এড়িয়ে তারা এগিয়ে গেছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
জাম্বিয়ার ভেতর দিয়ে তাদের এই যাত্রার দূরত্ব প্রায় ২ হাজার ৪৮৫ মাইল—অর্থাৎ প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। আফ্রিকান বন্য কুকুরের জন্য এটিই এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা বলে জানায় বিবিসি।
গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু বন্য কুকুরের অসাধারণ অভিযাত্রার গল্প নয়। মানুষের বসতি, রাস্তা ও শিল্পাঞ্চল ক্রমেই বাড়তে থাকা আফ্রিকায়ও বন্য প্রাণীরা যে বিশাল এলাকা পাড়ি দিতে পারে, এই ঘটনা তার আশার দিকটিও দেখাচ্ছে।
আফ্রিকান বন্য কুকুর খুব সামাজিক প্রাণী। তারা দলবদ্ধভাবে থাকে, একসঙ্গে শিকার করে এবং নিজেদের দলের সদস্যদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে তাদের জীবনের একটি পর্যায়ে দল ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। কারণ, যে দলে তাদের জন্ম, সেই দলের সদস্যদের সঙ্গে তারা সাধারণত প্রজনন করে না।
তাই নতুন সঙ্গী খুঁজতে অনেক বন্য কুকুর দুই থেকে তিন বছর বয়সে নিজের দল ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যায়। এই তিন বন্য কুকুরও ঠিক সেটিই করেছিল। তারা জাম্বিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দিকে এগিয়ে যায়। সরলরেখায় তাদের যাত্রার দূরত্ব ছিল প্রায় ২৬০ মাইল বা ৪২০ কিলোমিটার।
কিন্তু বাস্তবে পথটা এতটা সহজ ছিল না।
ভূপ্রকৃতি ছিল বিচ্ছিন্ন ও ভাঙাচোরা। মানুষের বসতি, শহর, রাস্তা ও শিল্পাঞ্চলও ছিল পথে। এসব এড়িয়ে ঘুরে ঘুরে তাদের প্রায় ১০ গুণ বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। পুরো যাত্রায় সময় লেগেছে প্রায় আট মাস। বন্য প্রাণীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে এই যাত্রাকে সাধারণ পরিযান বলা হচ্ছে না। পরিযানের সময় অনেক প্রাণী খাবার, পানি বা উপযুক্ত পরিবেশের খোঁজে নির্দিষ্ট মৌসুমে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায়। পরে আবার আগের এলাকায় ফিরে আসে। তবে বন্য কুকুরদের এই যাত্রা ছিল ভিন্ন।
তারা পুরনো দল ছেড়ে নতুন এলাকা ও সঙ্গীর খোঁজে বের হয়েছিল। প্রাণীবিজ্ঞানে এ ধরনের আচরণকে বলা হয় ‘ডিসপার্সাল’, অর্থাৎ জন্মস্থান থেকে বেরিয়ে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া। আফ্রিকান বন্য কুকুর আফ্রিকার সবচেয়ে বিরল শিকারি প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। বন্য পরিবেশে এখন প্রায় ৬ হাজার বন্য কুকুর টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। তারা দলবদ্ধভাবে শিকার করে এবং নিজেদের মধ্যে শক্ত সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে। একটি দলের সদস্যরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই একটি দলের টিকে থাকার জন্য অন্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নতুন সঙ্গী পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই তাদের চলাচলের জন্য বড় এলাকা দরকার।
তিন বন্য কুকুরের যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো তারা কতটা পথ পাড়ি দিয়েছে, সেটি নয়। বরং তারা কোন পথ দিয়ে গেছে, সেটিই গবেষকদের বেশি ভাবাচ্ছে। বন্য কুকুরগুলো একটি বন্যপ্রাণী অধ্যুষিত এলাকা থেকে আরেকটিতে পৌঁছেছে। পথে তারা রাজধানী লুসাকাসহ মানুষের তৈরি বড় বাধাগুলো এড়িয়ে গেছে। শিল্পাঞ্চল ও মানুষের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন হওয়া এলাকাও তারা এড়িয়ে চলেছে। এতে গবেষকরা মনে করছেন, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন বন্য কুকুরের দল হয়তো ধারণার চেয়েও বেশি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্কট ক্রিল ১৯৯১ সাল থেকে আফ্রিকান বন্য কুকুর নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, এই গবেষণার ফল কিছুটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে আশঙ্কাও কম নয়। গবেষণায় জিপিএস কলার পরানো আরো কয়েকটি বন্য কুকুরের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকটি অবৈধ ফাঁদে পড়ে মারা যায়। তিনটি স্ত্রী বন্য কুকুরও প্রায় একই রকম দীর্ঘ যাত্রা করেছিল। কিন্তু তাদের একজন ফাঁদে আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনটি স্ত্রী কুকুরের মধ্যে দুটিই মারা যায়। অর্থাৎ নতুন সঙ্গী ও নতুন এলাকার সন্ধানে যত দূরেই যাক না কেন, বন্য কুকুরগুলোর জন্য মানুষের তৈরি বিপদ বড় হুমকি হয়ে থাকছে। গবেষকরা এমন একটি আচরণও লক্ষ্য করেছেন, যেখানে কোনো দলের সদস্য মারা গেলে বেঁচে থাকা কুকুরগুলো বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে। হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীর প্রতি তাদের সামাজিক বন্ধনের গভীরতাও এতে বোঝা যায়।
গবেষণাটি পরিবেশবিষয়ক সাময়িকী ইকোলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, শুধু সংরক্ষিত এলাকার ভেতর বন্য প্রাণী রক্ষা করলেই হবে না। এসব এলাকার মধ্যে প্রাকৃতিক যোগাযোগও থাকতে হবে। কারণ, রাস্তা, শহর, কৃষিজমি ও শিল্পাঞ্চলের কারণে অনেক বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অংশে ভাগ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাণীদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার জন্য নিরাপদ প্রাকৃতিক পথ তৈরি করা জরুরি। এ ধরনের পথকে বন্যপ্রাণীর ‘করিডর’ বলা হয়। গবেষণার সহলেখক ও দ্য নেচার কনজারভেন্সির কাফুয়ে সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক ব্রুস এলেন্ডার মনে করেন, বন্য কুকুর ও হাতির মতো বড় এলাকায় চলাচল করা প্রাণীদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে এই সংযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, সংরক্ষিত এলাকাগুলোকে আলাদা আলাদা ‘দ্বীপ’ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং বড় একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এগুলোকে দেখতে হবে।
বিশ্বের নানা প্রাণীই খাবার, পানি কিংবা প্রজননের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। তানজানিয়া ও কেনিয়ার মধ্যে ওয়াইল্ডবিস্টের চলাচল আফ্রিকার অন্যতম পরিচিত দীর্ঘ পরিযান ।জাতিসংঘের পরিযায়ী প্রাণী সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী, খাবার ও পানির খোঁজে তারা ঋতু অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে। এই পথের দৈর্ঘ্য ৪০০ মাইলেরও বেশি। আবার স্থলভাগে একবারে সবচেয়ে দীর্ঘ পরিযানের উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যারিবুর পরিযান। ক্যারিবু হলো উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে পাওয়া এক প্রজাতির বৃহৎ আকৃতির বল্গা হরিণ। উত্তর আমেরিকা ও সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে বসবাসকারী এই বন্য রেইনডিয়ার বা বল্গা হরিণগুলো খাবারের সন্ধান, বংশবৃদ্ধি এবং প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে বাঁচতে প্রতি বছর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। তারা যাওয়া-আসা মিলিয়ে ৮৩৯ মাইল পথ পাড়ি দেয়। ধূসর নেকড়েকেও এক বছরে ৪ হাজার ৩৫০ মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিতে দেখা গেছে।
তবে আফ্রিকান বন্য কুকুরের এই যাত্রার বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। তারা কোনো মৌসুমি খাবারের পেছনে ছুটছিল না। ছুটছিল নতুন জীবন ও সঙ্গীর সন্ধানে। মানুষের তৈরি অসংখ্য বাধা পেরিয়েও তারা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ খুঁজে নিয়েছে। তাই এই তিন বন্য কুকুরের গল্প শুধু রেকর্ড গড়ার গল্প নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, বন্য প্রাণীর পৃথিবী আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড়।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ






















