দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিলের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে লেবানন। দেশটির আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিশনটি সরিয়ে নেওয়া হলে দক্ষিণ লেবাননে বড় ধরনের নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
লেবাননের ভাষ্য, গত ২ মার্চের পর দেশটির সীমান্ত এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তাই এই নতুন বাস্তবতায় ইউনিফিলের কার্যক্রম শেষ করার সিদ্ধান্ত আবারও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো গত ২৬ আগস্টের একটি চিঠিতে এ অবস্থান তুলে ধরেছে লেবানন। চিঠিটি দ্য ন্যাশনালের হাতে এসেছে।
এতে জাতিসংঘে লেবাননের রাষ্ট্রদূত আহমাদ আরাফা বলেন, ২ মার্চের পর পরিস্থিতির বড় পরিবর্তনের কারণে এখনই ইউনিফিলের কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া সময়োপযোগী নয়। তিনি বলেন, লেবানন, সীমান্তের নীল রেখা এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ২ মার্চের পর ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। এই অবস্থায় ইউনিফিল বন্ধের সিদ্ধান্ত সতর্কতার সঙ্গে আবার বিবেচনা করা দরকার।
আহমাদ আরাফার মতে, ইউনিফিল সরিয়ে নেওয়া হলে এমন একটি নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা লেবানন সরকারের নিরাপত্তা প্রচেষ্টাকে দুর্বল করবে।
একই সঙ্গে অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করা অন্যান্য পক্ষের প্রচেষ্টার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরো বাড়ার মধ্যে গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে আবারও লড়াই শুরু হয়। এর ফলে দক্ষিণ লেবাননে ইউনিফিল যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করে, তা অনেকটাই বদলে যায়। এরপর ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। ইসরায়েলের দাবি, উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলোকে হিজবুল্লাহর হামলা থেকে রক্ষা করতে ওই এলাকায় একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী রাখা প্রয়োজন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। লেবানন বলেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০০৬ সালে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর যুদ্ধ শেষ করার কাঠামো হিসেবে এই প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। বৈরুত আরো জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নেও তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একইভাবে গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সই হওয়া ত্রিপক্ষীয় কাঠামোও বাস্তবায়ন করতে চায় তারা। লেবাননের মতে, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
ইউনিফিলের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতিসংঘ যে কয়েকটি বিকল্প পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, সেগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে লেবানন। লেবাননের রাষ্ট্রদূত আহমাদ আরাফা বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের গত ১ জুনের প্রতিবেদনে যে বিকল্পগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো তৈরি করা হয়েছিল মার্চের সংঘাত এবং ২৬ জুনের ত্রিপক্ষীয় কাঠামো সইয়ের আগের পরিস্থিতি ও আলোচনার ভিত্তিতে। তার মতে, এরপর পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে ওই বিকল্পগুলো বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই নাও হতে পারে। এই অবস্থায় ইউনিফিলের মেয়াদ সীমিত সময়ের জন্য বাড়ানোকে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বলে মনে করছে লেবানন।
আহমাদ আরাফা বলেন, ইউনিফিলের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা, এর সরবরাহ ও পরিচালনার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণ ও লেবানন সরকারের কাছে মিশনটির গ্রহণযোগ্যতা- সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে মেয়াদ বাড়ানোই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। লেবানন সরকার বলেছে, দক্ষিণাঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইউনিফিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মিশনটি লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে দক্ষিণ লেবাননে কাজ করছে ইউনিফিল। মিশনটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সেখানে সংঘর্ষ বন্ধ থাকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা। পাশাপাশি ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তের নীল রেখা বরাবর নিরাপত্তা বজায় রাখতে লেবাননের সেনাবাহিনীকে সহায়তা করা। বর্তমানে ইউনিফিলে ৭ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে।
তবে ইউনিফিলের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান ভিন্ন। গত সপ্তাহে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইউনিফিলের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বাহিনী রাখার যেকোনো উদ্যোগের তারা বিরোধিতা করবে। ইসরায়েলের যুক্তি, সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্ব লেবাননের সেনাবাহিনীকেই নিতে হবে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত ড্যানি ডানন বলেন, ইউনিফিলের মেয়াদ বছরের শেষ নাগাদ শেষ করার বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিই মেনে চলা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পর ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইউনিফিলের কার্যক্রম শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইউনিফিলের কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা। এর মাধ্যমে ১৯৭৮ সাল থেকে দক্ষিণ লেবাননে চলা প্রায় পাঁচ দশকের এই শান্তিরক্ষা মিশনের সমাপ্তি ঘটবে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























