সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে তোলা। আজ আবার বাংলার সংস্কৃতি অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
কবীর-লালনের চিন্তা ও দর্শনকে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে।’
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি মাঠে লালন বিশ্বসংঘ আয়োজিত আট বিভাগব্যাপী ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ফকির লালন শাহের বাণী—‘ভক্ত কবীর জাতে জোলা প্রেমভক্তিতে মাতোয়ালা, ধরেছে সে ব্রজের কালা দিয়ে সর্বস্ব ধন তাই’—কে উৎসবের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল ও রংপুর বিভাগে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়েজিত এ উৎসবে বিশেষ অতিথি ছিলেন–বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের প্রতিনিধি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মিজানুর রহমান।
মো. ফজলুর রহমান বলেন, বাংলার সংস্কৃতি আজ অন্ধকারে ডুবে গেছে। পদ্মা মেঘনা যমুনা, সুরমা কুশিয়ারাসহ শত শত নদীর তীরে হাজার বছর ধরে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তার বিপরীতে কবীর-লালনের এই ভাবসংগীত উৎসব এক আলোক প্রদীপ।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ সব জাতি সম্প্রদায় নিয়ে এক ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক দেশ।
তিনি বলেন, আজকে তরুণদের উদ্দেশে বলব, মুক্তিযুদ্ধ যেন বৃথা না যায়। আজকে কবীর-লালনের চিন্তা ও দর্শনকে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পুনরুজ্জীবিত করতে। মৃত্যু এলেও এই আলো জ্বালানোর পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। জীবন দিয়ে হলেও এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ড. আহসানুল হাদী বলেন, ‘কবীর এবং লালন কেবল নন, বাংলাদেশের নানা প্রান্তে এবং সারা পৃথিবীতেই যারা সুফি সাধনা করেছেন তারা সবাই গানের সঙ্গে কবিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু আজকে বাংলাদেশের কিছু মাওলানা লালন সাইঁয়ের গানের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সুফিদের সংগীত সাধনায় বাধা দিচ্ছেন, মাজারে গানের চরচা বাধাগ্রস্ত করছেন। আমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমাদের মহানবী (সা.) নিজে কবিতা ও সংগীত পছন্দ করতেন। কবীর ও লালন উভয়েই একেশ্বরবাদী এবং তারা অমর প্রেমের বাণী, সব মানুষের জন্য সব জীবের জন্য মহান স্রষ্টার জন্য প্রেমের সাধনা করতে বলে গেছেন।’
বিশিষ্ট উচ্চাঙ্গিক কণ্ঠশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রিয়াঙ্কা গোপ, বলেন, ‘সন্তু কবীর বলে গেছেন, জীবিত অবস্থাতেই মৃতের মতো বাঁচতে হবে, অর্থাৎ লোভ-হিংসা-দ্বেষ-কাম-ক্রোধ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। এই দর্শন বুঝতে পারলে আমাদের মধ্যে এত বিভেদ থাকার কথা নয়।’
তিনি বলেন, ‘সন্তু কবীর, লালন সাইঁজি বা কাজী নজরুল ইসলাম যার যার মতো পদ রচনা করলেও সবার ভাবসাধনার সূত্রটি আসলে একই সূত্রে গাঁথা।’
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘লালনকে একময় বাংলাদেশে লোক সংগীত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান সরকার লালন সাইঁজিকে জাতীয় পর্যায়ে উদযাপন করছে এবং লালনের সংগীত ও দর্শনকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে কবীর-লালন বিষয়ে নানামাত্রিক বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিশিষ্ট উচ্চাঙ্গিক কণ্ঠশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রিয়াঙ্কা গোপ, বিশিষ্ট সুফি গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ড. আহসানুল হাদী, লালনপন্থী ফকিরদের পক্ষে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর আখড়ার বিশিষ্ট লালনপন্থী সাধক ফকির আবুল হোসেন শাহ, শ্রীমঙ্গল থেকে আসা কবীরপন্থী সাধক নিঝুম পাইনকা, গুরুদুয়ারা নানকশাহী, ঢাকার পক্ষে ডা. এম কে রায়, গবেষক ও কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত ভাষণ দেন–লালন বিশ্বসংঘের প্রধান নির্বাহী ও কবীর-লালন গবেষক আবদেল মাননান। তিনি বলেন, সন্ত কবীর ও লালন সাঁই দুজন একই নদীর দুই তীর, তাদের দর্শন আমাদের এই দুঃসময়েও অকুতোভয় সাহস যোগাচ্ছে। কবীর-লালন ভাবসংগীতের এই উৎসব বাংলাদেশের বিশিষ্ট সুফি সাধক সৈয়দ সদর উদ্দিন আহমেদ চিশতীকে।
সভাপতিত্ব করেন গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য ও লালন বিশ্বসংঘের চেয়ারম্যান দর্শনাচার্য প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান।
উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে কবীর-লালনের সংগীত নিবেদন করেন মৌলভিবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থেকে আসা কবীরপন্থী সম্প্রদায়, ঢাকার রবিদাসপন্থী সম্প্রদায়, নানকপন্থী শিখ সম্প্রদায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগ এবং কবীর-লালন মিউজিক্যাল মিশনের শিল্পীরা।
আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বরিশাল বিভাগীয় উৎসব উদ্বোধন করবেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশীদ; ১৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উৎসব উদ্বোধন করবেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম; ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উৎসব উদ্বোধন করবেন প্রবীণ বাউলশিল্পী তারা মিয়া বাউল; ২ অক্টোবর, শুক্রবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উৎসব উদ্বোধন করবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক ড. মাসুদ চৌধুরী; ৪ঠা অক্টোবর, শুক্রবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উৎসব উদ্বোধন করবেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আনিসুর রহমান; ২৩ অক্টোবর, শুক্রবার, বিকেল সাড়ে ৫টায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে উৎসব উদ্বোধন করবেন বিশিষ্ট বংশীবাদক ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম এবং ৩০ শে অক্টোবর, বিকেল সাড়ে ৫টায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সিলেট ব
িভাগীয় উৎসব উদ্বোধন করবেন বিশিষ্ট লেখক-গবেষক অধ্যাপক ড. নৃপেন্দ্রলাল দাশ।
আট বিভাগব্যাপী এই উৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























