সেপ্টেম্বরের এই চেনা বাতাসে আজও যেন মিশে রয়েছে এক দূরুচ্ছ্বাসের প্রতিধ্বনি। ১৮৬০ সালের এই বিশেষ দিনে (৬ সেপ্টেম্বর) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সেডারভিল নামক ছোট্ট এক জনপদে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক নারী, যিনি কেবল নিজের যুগের গণ্ডিই পেরোননি, বরং আগামী শতকের সমাজভাবনাকেও বদলে দিয়েছিলেন আমূল। তিনি আর কেউ নন—বিংশ শতাব্দীর সমাজকল্যাণ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, প্রথম মার্কিন নারী হিসেবে নোবেল শান্তি জয়ী মহীয়সী জেন অ্যাডামস। তিনিই প্রথম মার্কিন নারী যিনি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সমৃদ্ধ শিকড় ও পারিবারিক পরিমণ্ডল
এক বর্নাঢ্য ও সমৃদ্ধশালী সুখের পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন জেন। পিতা জন এইচ. অ্যাডামস ছিলেন সেকালের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব—যিনি একদিকে যেমন ‘দ্য সেকেন্ড ন্যাশনাল ব্যাংক অব ফ্রিপোর্ট’-এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন, অন্যদিকে ইলিনয় স্টেট সিনেটর এবং আব্রাহাম লিংকনের আদর্শে গড়া রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
আট ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এই কন্যার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই যক্ষ্মার সঙ্গে লড়াই করে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নেন তাঁর মা সারাহ উইবার অ্যাডামস। পরবর্তীতে আট বছর বয়সে জেন পান নতুন মায়ের স্নেহ। পিতার উৎসাহ ও প্রখর বুদ্ধিমত্তার ছায়ায় তাঁর মননশীলতার গোড়াপত্তন হয়েছিল শৈশবেই।
শিক্ষাজীবন ও ইউরোপের হাতছানি
পিতার অনুপ্রেরণায় উচ্চশিক্ষার পথে পা বাড়ানো জেন রকফোর্ড ফিমেল সেমিনারি (তৎকালীন রকফোর্ড কলেজ) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার তাগিদে ফিলাডেলফিয়ার উইমেন’স মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেও শারীরিক জটিলতা ও নিয়তির অন্য কোনো টানে সেখানে পড়াশোনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরই মধ্যে পিতার আকস্মিক প্রয়াণ তাঁর জীবনে এনে দেয় এক বিরাট শূন্যতা এবং উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি পান ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
১৮৮৫ সালে সৎমায়ের সঙ্গে প্রথমবার ইউরোপ ভ্রমণে যান তিনি। কিন্তু দেশে ফিরে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার রূঢ় একঘেয়েমি আর সমসাময়িক নারীদের গতানুগতিক জীবনের ছক তাঁকে হাঁপিয়ে তুলছিল; বিয়ের চিরাচরিত ধারণার প্রতি তাঁর ছিল স্পষ্ট অনীহা। মেরুদণ্ডের জটিল চিকিৎসার পর ১৮৮৭ সালে জীবনের অন্যতম মোড় ঘোরানো দ্বিতীয় ইউরোপ সফরে যান তিনি, যেখানে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সহচরী ও শিক্ষিকা এলেন স্টার হয়ে ওঠেন তাঁর আজীবনের সঙ্গী।
হুল হাউজ: মানবতার এক নতুন ঠিকানা
১৮৮৯ সাল। শিকাগোর মাটিতে পা রেখে জেন ও তাঁর বন্ধু এলেন স্টার গড়ে তুললেন আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম সেটেলমেন্ট হাউজ—বিখ্যাত ‘হুল হাউজ’। ১৮৫৬ সালে নির্মিত চার্লস হুলের নামানুসারে তৈরি এই হুল হাউজের পেছনে জেন তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই পুরো ৫০ হাজার মার্কিন ডলার উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। বিত্তবান রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হেলেন কালভারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই আশ্রয়কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে অভিবাসী ও বঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ঠিকানায় পরিণত হয়।
সংগ্রাম, শান্তিবাদ ও বৈশ্বিক ঝড়
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে জেনের শান্তিবাদী অবস্থান এবং অভিবাসীদের নাগরিক অধিকার রক্ষার সোচ্চার কণ্ঠস্বর তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল তীব্র বিতর্কের মুখে। তৎকালীন আমেরিকা যখন নৈরাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের ভয়ে আতঙ্কিত, ঠিক তখন কার্নেগি হলে দেওয়া তাঁর শান্তিবাদী ভাষণকে গণমাধ্যম ভুলভাবে উপস্থাপন করে এবং তাঁকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে—যা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকার সময়। তবুও শত প্রতিকূলতা হুল হাউজের অগ্রযাত্রাকে এক মুহূর্তের জন্যও থমকে দিতে পারেনি। ১৯১২ সালে থিওডোর রুজভেল্টের প্রেসিডেনশিয়াল ক্যাম্পেইনেও তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
শান্তির নোবেল ও অমর উত্তরাধিকার
যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর আজীবন সাধনা মূর্ত হয়ে উঠেছিল ‘উইমেন’স ইন্টারন্যাশনাল লীগ ফর পিস অ্যান্ড ফ্রিডম’-এর প্রেসিডেনসিয়াল দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। কূটনীতিবিদদের সঙ্গে নিরলস বৈঠক আর শান্তি আন্দোলনের বার্তা নিয়ে তিনি ছুটেছেন ইউরোপ থেকে এশিয়ায়।
তাঁর এই মহৎ ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩১ সালে তাঁকে নিকোলাস মারি বাটলারের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়—যার মাধ্যমে প্রথম কোনো মার্কিন নারী হিসেবে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ এই সম্মান অর্জন করেন জেন অ্যাডামস।
১৯৩৫ সালের ২১ মে শিকাগোর মাটিতে চিরদিনের মতো তাঁর চোখ বুজে যায়। কিন্তু জন্মদিনের এই পঙক্তিমালা লিখতে বসে আজ স্পষ্ট অনুভব করা যায়, জেন অ্যাডামস কেবল একটি নাম নন; তিনি মানবতা, নারীবাদী সংগ্রাম ও বিশ্বজনীন শান্তির এমন এক চিরন্তন প্রদীপ, যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে যুগ যুগ ধরে পথ দেখাবে মানবসভ্যতাকে।
বাংলা৭১নিউজ/ এসএইচবি


























