সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট একটি দুর্গ। আয়তন এতটাই কম যে তুলনা করা হয় প্রায় দু’টি টেনিস কোর্টের সঙ্গে। অথচ এই জায়গাটির রয়েছে নিজস্ব পতাকা, সংবিধান, মুদ্রা, পাসপোর্ট, রাজপরিবার এমনকি ‘জাতীয় পরিচয়’ও। নাম প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ড। তবে এর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় শুধু আয়তন নয় একসময় যেখানে ২৭ জন বাসিন্দা ছিল, তবে বর্তমানে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন মাত্র একজন।
সিল্যান্ড ইংল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে উত্তর সাগরের একটি পুরোনো সমুদ্র দুর্গের ওপর অবস্থিত। জায়গাটি দেখতে অনেকটা সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ধাতব কাঠামোর মতো। তবে এটি কোনো দ্বীপ বা প্রাকৃতিক ভূখণ্ড নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী এই দুর্গ তৈরি করেছিল।
যুদ্ধের সময় তৈরি হয়েছিল দুর্গটি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বিমান হামলা ও সমুদ্রপথে আক্রমণ ঠেকাতে ব্রিটেন উত্তর সাগরে বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক দুর্গ তৈরি করে। তারই একটি ছিল রাফস টাওয়ার। যুদ্ধের সময় এখানে শতাধিক নৌসেনা অবস্থান করতেন।
প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ডযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দুর্গটির সামরিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। ১৯৫০-এর দশকে ব্রিটিশ বাহিনী সেটি ছেড়ে দেয়। দীর্ঘদিন সমুদ্রের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল কাঠামোটি। পরে সেটিই হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত ‘দেশ’-এর কেন্দ্র।
১৯৬৭ সালে বদলে গেল ইতিহাস
১৯৬৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ নাগরিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর প্যাডি রয় বেটস রাফস টাওয়ার দখল করেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি পাইরেট রেডিও স্টেশন চালানো। কিন্তু পরে তিনি আরও বড় সিদ্ধান্ত নেন। রয় বেটস ঘোষণা করেন, এই দুর্গ আর ব্রিটেনের অংশ নয়। তিনি এর নাম দেন প্রিন্সিপালিটি অব সিল্যান্ড এবং নিজেকে এর শাসক ঘোষণা করেন।
এরপর ধীরে ধীরে সিল্যান্ডের জন্য তৈরি করা হয় পতাকা, সংবিধান, জাতীয় সংগীত, পাসপোর্ট, ডাকটিকিট ও নিজস্ব মুদ্রা। বেটস পরিবারের হাতেই থেকে যায় এর শাসনব্যবস্থা।
একসময় ২৭ জন, এখন মাত্র ১
সিল্যান্ডের জনসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংখ্যা প্রচলিত হয়েছে। পুরনো কিছু তথ্যসূত্রে একসময় সেখানে ২৭ জন বাসিন্দা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই সংখ্যা থেকেই সিল্যান্ডকে ‘২৭ জনের দেশ’ হিসেবেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে ছবিটা একেবারেই আলাদা। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সিল্যান্ডে স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র একজন। অর্থাৎ একসময় ২৭ জনের কথা বলা হলেও এখন নিয়মিতভাবে সেখানে বসবাস করেন একজনই। সিবিএসয়ের প্রতিবেদনে এই একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে সিল্যান্ডের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজও করতে দেখা গেছে।
বর্তমানে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন মাত্র একজনতবে এর অর্থ এই নয় যে সিল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা একজন। সিল্যান্ডের নিজস্ব দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের নাগরিক ও সমর্থকদের একটি বড় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রয়েছে। কিন্তু দুর্গটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের বিষয়টি আলাদা।
নিজের মুদ্রা, রাজা-রানিও আছে!
সিল্যান্ডের নিজস্ব মুদ্রার নাম সিল্যান্ড ডলার। তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত কোনো মুদ্রা নয়। প্রতীকী ব্যবহারের পাশাপাশি সংগ্রহযোগ্য হিসেবেও এর গুরুত্ব রয়েছে। এখানে রয়েছে নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সংগীত। বেটস পরিবার বংশানুক্রমিকভাবে সিল্যান্ডের রাজপরিবারের ভূমিকা পালন করে আসছে। রয় বেটসের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাইকেল বেটস শাসনভার গ্রহণ করেন। সিল্যান্ডের সরকারি ওয়েবসাইটেও নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং সেখানে পতাকা, সংবিধান, মুদ্রা, পাসপোর্ট ও রাজপরিবারসহ একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে।
সত্যিই কি সিল্যান্ড একটি দেশ?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সিল্যান্ড নিজেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশ নয়। জাতিসংঘের সদস্যও নয় এবং বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সিল্যান্ডকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রচলিত সংজ্ঞায় একে স্বাধীন রাষ্ট্রের বদলে সাধারণত ‘মাইক্রোনেশন’ বা স্বঘোষিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসত্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে সিল্যান্ডের ইতিহাসে আইনি ঘটনাও কম আকর্ষণীয় নয়। ১৯৬৮ সালে সিল্যান্ডের কাছাকাছি একটি ঘটনায় ব্রিটিশ আদালত দুর্গটির ওপর নিজেদের এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেনি। সিল্যান্ডের সমর্থকেরা ঘটনাটিকে তাদের দাবির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তবে এটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ধরা হয় না।
১৯৭৮ সালে হয়েছিল ‘অভ্যুত্থান’
সিল্যান্ডের ইতিহাসে ১৯৭৮ সালের ঘটনাটিও বেশ নাটকীয়। একদল জার্মান ও ডাচ ভাড়াটে যোদ্ধা দুর্গটি দখল করে নেয় এবং মাইকেল বেটসকে জিম্মি করে। পরে রয় বেটসের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে দুর্গটি পুনর্দখল করা হয়। এই ঘটনার পর সিল্যান্ডের ‘দেশ’ হিসেবে পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সেখানে আগুন লাগা থেকে শুরু করে ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসার উদ্যোগ বিভিন্ন ঘটনাও ঘটেছে।
আজও উত্তর সাগরের সেই ছোট্ট দুর্গটি সিল্যান্ডের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়তন ক্ষুদ্র, স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র একজন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও নেই তবু নিজস্ব পতাকা, মুদ্রা, রাজপরিবার ও দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে সিল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত স্বঘোষিত মাইক্রোনেশনগুলোর একটি।
সূত্র: সিবিএস নিউজ
বাংলা৭১নিউজ/জেএস




























