ঢাকা ১১:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কূটনীতির মোড়কে প্রচ্ছন্ন চাপ: বাংলাদেশ কোনো দেশের অঙ্গরাজ্য নয় Logo ঝুঁকিপূর্ণ লিবিয়া-গ্রিস রুট: প্রাণ হাতে ইউরোপের পথে বাংলাদেশি ও সুদানিরা Logo ঈদে মিলাদুন্নবীতে আজ দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকবে নানা আয়োজন Logo আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে সীমান্ত Logo পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ Logo প্রতিটি বিভাগে মডেল খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার Logo ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে প্রজ্ঞাপন Logo যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ ভিসা বাতিলের মুখে: ঝুঁকিতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা Logo স্রষ্টার করুণা যখন মানবরূপে: নিঃস্বদের আশ্রয়দাত্রী মাদার তেরেসা Logo একাকিত্ব নয়, আধুনিক জীবনধারার নতুন ব্যাকরণ নির্জনতা
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও দিল্লির পুরনো চশমা

কূটনীতির মোড়কে প্রচ্ছন্ন চাপ: বাংলাদেশ কোনো দেশের অঙ্গরাজ্য নয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী

কূটনীতির টেবিলে যখন বন্ধুত্বের মোড়কে প্রভুত্ব ফলানোর সুক্ষ্ম সূঁচের ফোঁড় দেওয়া হয়, তখন তা পারস্পরিক বিশ্বাসের আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে তোলে। ভারতের সাবেক আমলাদের  কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহিভূত মনোভাব কেবল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মৈত্রীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক আস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান এবং সমতার স্বীকৃতি ছাড়া কোনো কূটনৈতিক চাপই আর বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ী হতে পারে না।

ভারতের এসব সাবেক আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের মাথায় রাখতে হবে যে, তারা যদি এখনো পুরনো  চশমা দিয়ে বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতে চায় এবং অতীতের মতো নিয়ন্ত্রণের নীতি বজায় রাখতে চায়, তবে তা দুই দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদী দূরত্বের কারণ হবে। পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনই কেবল এই কৃত্রিম চাপ ও উত্তেজনার বরফ গলাতে পারে।

বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য নয়

বাংলাদেশ ভারতের কোন অঙ্গরাজ্য নয়। এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এই দেশের প্রধানমন্ত্রী কখন, কার আমন্ত্রণে এবং কী শর্তে বিদেশ সফর করবেন—তা সম্পূর্ণ দেশটির নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভারতীয় সাবেক আমলা বা নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ যখন এর সাথে রাজনৈতিক শর্ত বা বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেন, তখন তা দুই দেশের সমতার নীতির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করেছে। দিল্লির সাবেক আমলাদের একাংশের পুরোনো শাসনব্যবস্থা বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও জনগণের রায়ের প্রতি একধরনের অসম্মান।

বীণা সিক্রির ঔদ্ধত্য

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি  বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল করে কথা বলেছেন তা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিবর্জিত। তিনি মন্তব্য করেছেন- বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের আচরণ ‘অত্যন্ত রুক্ষ’ ও ‘অহংকারমূলক’। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ দাবির সঙ্গে যুক্ত করাকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও অ-কূটনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের দাবি তোলার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও তিনি মত দেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও বীনা সিক্রি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে খোলা চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিতে ভারতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, আমলা, রাষ্ট্রদূত ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে মোট ৬৮৫ জন স্বাক্ষর করেন। ওই চিঠিতে তারা উল্লেখ ছিল- ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেবল ছাত্র আন্দোলন না বলে এটিকে একটি সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত ‘রেজিম চেঞ্জ অপারেশন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য) এবং উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং একে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও নৈরাজ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়।

অভিভাবকসুলভ মানসিকতা

বাংলাদেশ কাকে কোন শর্তে প্রত্যর্পণ চাইবে এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের এজেন্ডা কী হবে, তা নির্ধারণ করা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের একচ্ছত্র এখতিয়ার। বীনা সিক্রি র মতো একজন সাবেক রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অবস্থানকে “অশিষ্ট” বলা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্যবহারেরও চরম ব্যত্যয়।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত প্রায়শই “অভিভাবকসুলভ” মনোভাব বজায় রাখতে চায় বলে যে সমালোচনা রয়েছে, বীণা সিক্রির তীব্র ও আক্রমণাত্মক ভাষায় সেই মনোভাবই পুনঃপ্রকাশ পেয়েছে।

কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনোই একপাক্ষিক চাপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। প্রাক্তন কূটনীতিকদের মাধ্যমে এ ধরনের কড়া বা অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগ সম্পর্কের বরফ গলানোর চেয়ে দূরত্ব বাড়াতেই বেশি ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ ন্যায়বিচারের চাহিদাকে সম্মান জানিয়েই কেবল দু’দেশের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ও সুষম সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

বিদ্যা ভূষণ সোনি

অন্যদিকে ভারতের সাবেক কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  যদি  ভারত সফরে না আসেন, তাহলে সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য যোগাযোগের চ্যানেল খোলা থাকবে না। এই সুযোগ তারা যেমন হারাতে চায় না, আমরাও চাই না এটি হাতছাড়া হোক।

ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আমলাদের একাংশের এমন মন্তব্য ও অবস্থান  দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাদের এই ধরনের মনোভাব এবং বয়ানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও কূটনীতিতে একধরনের অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশকে কেন এই চাপ

ভারতের সাবেক আমলা ও থিংক ট্যাংকদের এমন বক্তব্যের  মূল সুরটি আসলে তাদের  নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। ভারতের কাছে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির যেকোনো সমীকরণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর সে কারণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে তারা  “টাইম-সেন্সিটিভ ডিপ্লোমেসি” নীতির আওতায় ফেলতে চাচ্ছে। এটি আসলে কৌশলে একটি দেশের উপর মনোস্তাত্ত্বিক চাপ ও বল প্রয়োগের নীতি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,  এই চাপের মূলে রয়েছে- অতীতের ভূরাজনীতি।  ভারতের একটি প্রভাবশালী মহল এবং নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডল বরাবরই আওয়ামী লীগকে  তাদের  ‘সবচেয়ে আস্থার প্রতীক‘ হিসেবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি নয়াদিল্লির সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দীর্ঘদিনের। বিগত দশকগুলোতে ভারতের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা লবিতে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, বিএনপির শেকড় ইসলামপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে রয়েছে এবং তাদের ক্ষমতায় থাকা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।  এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের বশবর্তী হয়ে অতীতে ভারতীয় কূটনীতি ও অদৃশ্য হস্তক্ষেপে বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে এবং একপক্ষীয় রাজনৈতিক ধারা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন কৌশলগত খেলা খেলেছে দিল্লি। বারবার ভারত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী নীতিকে সমর্থন জুগিয়েছে।

শুধু তাই নয়- ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের বর্তমান উদ্বেগের মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক সখ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থ। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, ট্রানজিট এবং চীনপ্রবণ ভূ-রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব সুবিধা ভোগ করেছে; তা বর্তমান বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব ও ভারতের উদ্বেগ

চীন বাংলাদেশে বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও আধুনিক সার্ভিস ওরিয়েন্টেড হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং চট্টগ্রামে চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালুর বিষয়ে প্রত্যক্ষ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিশেষ করে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন নিজস্ব কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়ে কাজ ত্বরান্বিত করার আশ্বাস দিয়েছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা জোরদারকরণ, চিনে উচ্চশিক্ষা সহজীকরণ, চীনের চিকিৎসা খাত বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সুগম করা এবং পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং।

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রথমবারের মতো ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে ‘২+২’ ডায়ালগ বা স্ট্র্যাটেজিক সংলাপ চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর অধীনে সামরিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নিয়মিত যৌথ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা হবে।

বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে চীন থেকে জেন-১০ সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেটের চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ- এর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে সামরিক ড্রোন তৈরির যৌথ উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে।

ভারতের দীর্ঘদিনের অনাগ্রহের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম/ঢাকা পর্যন্ত সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো) বাস্তবায়নের স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরসফরকালে চীন নতুন করে পুনরায় এই করিডোর চালুর প্রস্তাব দিয়েছে।

চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহর থেকে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত হলে বঙ্গোপসাগরে চীনের সরাসরি প্রবেশাধিকার তৈরি হবে। একইসাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ বহুগুণ সহজ হবে।  চীন চায় বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগ বা কানেক্টিভিটিকে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় শক্তিশালী রূপ দিতে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের এই বন্ধুত্ব ও দ্বিপাক্ষীক সহযোগিতা ভারতের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সে কারণেই কখনো কৌশলে আবার কখনো চাপ প্রয়োগ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিশ্চিত করতে চাচ্ছে দিল্লী।

বাংলাদেশের সুস্পষ্ট অবস্থান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। ইতোমধ্যেই  ঢাকা  জানিয়ে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে না দেওয়া বা তার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ না হলে এবং ওসমান হাদীর হত্যাকারিকে ফেরত না দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে।

এরই অংশ হিসাবে তারা  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের দিনক্ষণ নিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চেয়ে একধরনের প্রচ্ছন্ন হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা প্রকাশ করছে। যা বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের আত্মমর্যাদার প্রতি একধরনের অদৃশ্য আঘাত।

একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করার পরও দিল্লির সাবেক আমলাদের একাংশের পুরোনো শাসনব্যবস্থা বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও জনগণের রায়ের প্রতি একধরনের অসম্মান।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে তার রাজনৈতিক উস্কানিমূলক তৎপরতা বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং এবিষয়ে ভারতের সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাশ্ববর্তী দেশ ভারত সফরে যাবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এক্ষেত্রে  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে হবে “এজেন্ডা ভিত্তিক”। এসব এজেন্ডায় থাকতে হবে- গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কোন ধরণের আপত্তি না তোলা (শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের আপত্তির কারণে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ কাজ স্থগিত করা হয়ে), তিস্তাসহ অভিন্ন সকল নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সমতার ভিত্তিতে চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন নাটক বন্ধ করা। এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা যাবেনা এবং বড় ভাই সুলভ নীতি পরিহার করতে হবে।

পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান এবং সমতার স্বীকৃতি ছাড়া কোনো কূটনৈতিক চাপই আর বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ী হতে পারে না।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

কূটনীতির মোড়কে প্রচ্ছন্ন চাপ: বাংলাদেশ কোনো দেশের অঙ্গরাজ্য নয়

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও দিল্লির পুরনো চশমা

কূটনীতির মোড়কে প্রচ্ছন্ন চাপ: বাংলাদেশ কোনো দেশের অঙ্গরাজ্য নয়

আপডেট সময় ১০:৫৬:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

কূটনীতির টেবিলে যখন বন্ধুত্বের মোড়কে প্রভুত্ব ফলানোর সুক্ষ্ম সূঁচের ফোঁড় দেওয়া হয়, তখন তা পারস্পরিক বিশ্বাসের আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে তোলে। ভারতের সাবেক আমলাদের  কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহিভূত মনোভাব কেবল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মৈত্রীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক আস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান এবং সমতার স্বীকৃতি ছাড়া কোনো কূটনৈতিক চাপই আর বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ী হতে পারে না।

ভারতের এসব সাবেক আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের মাথায় রাখতে হবে যে, তারা যদি এখনো পুরনো  চশমা দিয়ে বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতে চায় এবং অতীতের মতো নিয়ন্ত্রণের নীতি বজায় রাখতে চায়, তবে তা দুই দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদী দূরত্বের কারণ হবে। পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনই কেবল এই কৃত্রিম চাপ ও উত্তেজনার বরফ গলাতে পারে।

বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য নয়

বাংলাদেশ ভারতের কোন অঙ্গরাজ্য নয়। এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এই দেশের প্রধানমন্ত্রী কখন, কার আমন্ত্রণে এবং কী শর্তে বিদেশ সফর করবেন—তা সম্পূর্ণ দেশটির নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভারতীয় সাবেক আমলা বা নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ যখন এর সাথে রাজনৈতিক শর্ত বা বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেন, তখন তা দুই দেশের সমতার নীতির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করেছে। দিল্লির সাবেক আমলাদের একাংশের পুরোনো শাসনব্যবস্থা বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও জনগণের রায়ের প্রতি একধরনের অসম্মান।

বীণা সিক্রির ঔদ্ধত্য

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি  বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল করে কথা বলেছেন তা কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিবর্জিত। তিনি মন্তব্য করেছেন- বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের আচরণ ‘অত্যন্ত রুক্ষ’ ও ‘অহংকারমূলক’। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ দাবির সঙ্গে যুক্ত করাকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও অ-কূটনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের দাবি তোলার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও তিনি মত দেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও বীনা সিক্রি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে খোলা চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিতে ভারতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, আমলা, রাষ্ট্রদূত ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে মোট ৬৮৫ জন স্বাক্ষর করেন। ওই চিঠিতে তারা উল্লেখ ছিল- ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেবল ছাত্র আন্দোলন না বলে এটিকে একটি সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত ‘রেজিম চেঞ্জ অপারেশন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য) এবং উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং একে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও নৈরাজ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়।

অভিভাবকসুলভ মানসিকতা

বাংলাদেশ কাকে কোন শর্তে প্রত্যর্পণ চাইবে এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের এজেন্ডা কী হবে, তা নির্ধারণ করা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের একচ্ছত্র এখতিয়ার। বীনা সিক্রি র মতো একজন সাবেক রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অবস্থানকে “অশিষ্ট” বলা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্যবহারেরও চরম ব্যত্যয়।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত প্রায়শই “অভিভাবকসুলভ” মনোভাব বজায় রাখতে চায় বলে যে সমালোচনা রয়েছে, বীণা সিক্রির তীব্র ও আক্রমণাত্মক ভাষায় সেই মনোভাবই পুনঃপ্রকাশ পেয়েছে।

কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনোই একপাক্ষিক চাপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। প্রাক্তন কূটনীতিকদের মাধ্যমে এ ধরনের কড়া বা অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগ সম্পর্কের বরফ গলানোর চেয়ে দূরত্ব বাড়াতেই বেশি ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ ন্যায়বিচারের চাহিদাকে সম্মান জানিয়েই কেবল দু’দেশের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ও সুষম সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

বিদ্যা ভূষণ সোনি

অন্যদিকে ভারতের সাবেক কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  যদি  ভারত সফরে না আসেন, তাহলে সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য যোগাযোগের চ্যানেল খোলা থাকবে না। এই সুযোগ তারা যেমন হারাতে চায় না, আমরাও চাই না এটি হাতছাড়া হোক।

ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের সাবেক কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আমলাদের একাংশের এমন মন্তব্য ও অবস্থান  দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাদের এই ধরনের মনোভাব এবং বয়ানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও কূটনীতিতে একধরনের অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশকে কেন এই চাপ

ভারতের সাবেক আমলা ও থিংক ট্যাংকদের এমন বক্তব্যের  মূল সুরটি আসলে তাদের  নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। ভারতের কাছে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির যেকোনো সমীকরণের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর সে কারণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে তারা  “টাইম-সেন্সিটিভ ডিপ্লোমেসি” নীতির আওতায় ফেলতে চাচ্ছে। এটি আসলে কৌশলে একটি দেশের উপর মনোস্তাত্ত্বিক চাপ ও বল প্রয়োগের নীতি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,  এই চাপের মূলে রয়েছে- অতীতের ভূরাজনীতি।  ভারতের একটি প্রভাবশালী মহল এবং নীতিনির্ধারণী পরিমণ্ডল বরাবরই আওয়ামী লীগকে  তাদের  ‘সবচেয়ে আস্থার প্রতীক‘ হিসেবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি নয়াদিল্লির সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দীর্ঘদিনের। বিগত দশকগুলোতে ভারতের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা লবিতে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, বিএনপির শেকড় ইসলামপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে রয়েছে এবং তাদের ক্ষমতায় থাকা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।  এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের বশবর্তী হয়ে অতীতে ভারতীয় কূটনীতি ও অদৃশ্য হস্তক্ষেপে বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে এবং একপক্ষীয় রাজনৈতিক ধারা টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন কৌশলগত খেলা খেলেছে দিল্লি। বারবার ভারত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী নীতিকে সমর্থন জুগিয়েছে।

শুধু তাই নয়- ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের বর্তমান উদ্বেগের মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক সখ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থ। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, ট্রানজিট এবং চীনপ্রবণ ভূ-রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব সুবিধা ভোগ করেছে; তা বর্তমান বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব ও ভারতের উদ্বেগ

চীন বাংলাদেশে বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও আধুনিক সার্ভিস ওরিয়েন্টেড হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং চট্টগ্রামে চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালুর বিষয়ে প্রত্যক্ষ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিশেষ করে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন নিজস্ব কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়ে কাজ ত্বরান্বিত করার আশ্বাস দিয়েছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা জোরদারকরণ, চিনে উচ্চশিক্ষা সহজীকরণ, চীনের চিকিৎসা খাত বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য সহজ করতে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সুগম করা এবং পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং।

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রথমবারের মতো ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে ‘২+২’ ডায়ালগ বা স্ট্র্যাটেজিক সংলাপ চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর অধীনে সামরিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নিয়মিত যৌথ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা হবে।

বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে চীন থেকে জেন-১০ সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেটের চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ- এর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে সামরিক ড্রোন তৈরির যৌথ উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে।

ভারতের দীর্ঘদিনের অনাগ্রহের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম/ঢাকা পর্যন্ত সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো) বাস্তবায়নের স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরসফরকালে চীন নতুন করে পুনরায় এই করিডোর চালুর প্রস্তাব দিয়েছে।

চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহর থেকে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত হলে বঙ্গোপসাগরে চীনের সরাসরি প্রবেশাধিকার তৈরি হবে। একইসাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ বহুগুণ সহজ হবে।  চীন চায় বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগ বা কানেক্টিভিটিকে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় শক্তিশালী রূপ দিতে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের এই বন্ধুত্ব ও দ্বিপাক্ষীক সহযোগিতা ভারতের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সে কারণেই কখনো কৌশলে আবার কখনো চাপ প্রয়োগ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিশ্চিত করতে চাচ্ছে দিল্লী।

বাংলাদেশের সুস্পষ্ট অবস্থান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। ইতোমধ্যেই  ঢাকা  জানিয়ে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে না দেওয়া বা তার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ না হলে এবং ওসমান হাদীর হত্যাকারিকে ফেরত না দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে।

এরই অংশ হিসাবে তারা  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের দিনক্ষণ নিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চেয়ে একধরনের প্রচ্ছন্ন হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা প্রকাশ করছে। যা বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের আত্মমর্যাদার প্রতি একধরনের অদৃশ্য আঘাত।

একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করার পরও দিল্লির সাবেক আমলাদের একাংশের পুরোনো শাসনব্যবস্থা বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও জনগণের রায়ের প্রতি একধরনের অসম্মান।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে তার রাজনৈতিক উস্কানিমূলক তৎপরতা বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং এবিষয়ে ভারতের সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পাশ্ববর্তী দেশ ভারত সফরে যাবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এক্ষেত্রে  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে হবে “এজেন্ডা ভিত্তিক”। এসব এজেন্ডায় থাকতে হবে- গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কোন ধরণের আপত্তি না তোলা (শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের আপত্তির কারণে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ কাজ স্থগিত করা হয়ে), তিস্তাসহ অভিন্ন সকল নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সমতার ভিত্তিতে চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন নাটক বন্ধ করা। এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা যাবেনা এবং বড় ভাই সুলভ নীতি পরিহার করতে হবে।

পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান এবং সমতার স্বীকৃতি ছাড়া কোনো কূটনৈতিক চাপই আর বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ী হতে পারে না।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি