ঢাকা ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo জনতার পাশে সেনাবাহিনীর অবস্থান: শাসকগোষ্ঠীর শেষ হিংস্রতা Logo এমবাপ্পেকে আনার গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী Logo জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে রাজধানীতে দুই মেগা কনসার্ট Logo বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: আহত অন্তত ২০ Logo ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে শুটিংয়ের আগে কেমন প্রস্তুতি প্রয়োজন— জানালেন অভিনেত্রী Logo ১৫ মাস পর দেশে ফিরলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, চাইলেন দোয়া Logo যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সতর্কবার্তা Logo পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৮ কর্মকর্তাকে বদলি Logo ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল Logo এবার বাংলাদেশ সফরে আসছেন মার্কিন নৌ কমান্ডার
ফিরে দেখা ৩ আগস্ট ২০২৪

‘যেকোনো মূল্যে পিসে ফেলো’: শাসকের শেষ হিংস্রতা

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট—ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে যা ‘৩৪ জুলাই’ নামে এক মহাকাব্যিক রক্তাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। শ্রাবণের মেঘলা আকাশ আর বারুদগন্ধী থমথমে বাতাসের বুকে সেদিন থরথর করে কাঁপছিল এক পরাক্রমশালী স্বৈরাচারের শক্ত ভিত। অগণিত শহীদের রক্তে ভেজা রাজপথ থেকে সেদিন আর কোনো ছোটখাটো সংস্কার কিংবা আপসের ধ্বনি ওঠেনি, ওঠেনি শাসকের ছুড়ে দেওয়া আলোচনার বিষাক্ত টোপে পা দেওয়ার আকুতিও। হাজারো টিয়ার শেল, তাজা বুলেট, ডিবি কার্যালয়ের ভয়াল নির্যাতন আর গণগ্রেপ্তারের ফাঁদ উপহাস করে কোটি জনতা এক মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো জনতার সমুদ্র থেকে একসূত্রে উচ্চারিত হয়েছিল একটিমাত্র চূড়ান্ত ফয়সালা—শেখ হাসিনা সরকারের নিঃশর্ত পদত্যাগ। গণভবনের অবরুদ্ধ ঘরে বসে শাসকের শেষ হুমকি, আমলাদের বাঁচবার মরিয়া চক্রান্ত, পুলিশ-র্যাবের নির্মম বুলেটের তাণ্ডব এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্বজনহারাদের বুকফাটা আহাজারিকে ছাপিয়ে সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশ। কিন্তু কীভাবে শহীদ মিনারের সেই ‘এক দফা’র বজ্রনির্ঘোষ কেঁপে তুলেছিল গণভবনের সিংহাসন? কীভাবে রাজপথের অদম্য রক্তস্নাত ছাত্র-জনতা স্তব্ধ করে দিয়েছিল স্বৈরাচারের শেষ প্রতিরোধ? চলুন ফিরে দেখি সেই রুদ্ধশ্বাস, রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক ৩ আগস্টের পুরো ঘটনাপ্রবাহ…

‘এক দফা’ ও দ্রোহের দাবানল

৩ আগস্টের সূর্য ওঠার পর থেকেই ঢাকার অলিগলি, ক্যাম্পাস আর রাজপথ বেয়ে অগণিত প্রাণ ছুটে চলেছিল একই মোহনায়—কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

ঐতিহাসিক জনসমুদ্র: ভয়, বুলেট, টিয়ার শেল আর গ্রেপ্তারের ফাঁদ তুচ্ছ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষের সুদৃঢ় পদভারে কেঁপে ওঠে চারপাশ। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয় এক মহাসমুদ্রে।

এক দফা দাবি ঘোষণা: রক্তস্নাত শহীদ বেদিতে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা উচ্চারণ করেন কোটি জনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা: “শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগের এক দফা দাবি।”

সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক: গণভবনের আলোচনার বিষাক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের পক্ষ থেকে পরদিন ৪ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’-এর ডাক দেওয়া হয়।

গণভবনে ষড়যন্ত্র ও শেখ হাসিনার ধমকি

বাইরে যখন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে কোটি কণ্ঠের গর্জন, গণভবনের বন্ধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে তখন চলছিল ক্ষমতা আকড়ে রাখার অন্ধ নীলকণশা।

পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার যে টোপ ফেলেছিলেন, ছাত্র-জনতা ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে।

আলোচনা ভেস্তে যেতেই ফ্যাসিস্ট মেজাজে ফিরে আসে স্বৈরাচারী শাসক। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রশাসন ও বাহিনীর প্রধানদের প্রতি নির্দেশ যায়—যেকোনো মূল্যে, যেকোনো মূল্যে এই আন্দোলন পিষে ফেলতে হবে।

সরকারের অনুগত শীর্ষ আমলারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন কীভাবে ভুয়া ন্যারেটিভ তৈরি করে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চাপ সামলানো যায়।

আওয়ামী গুন্ডামি ও বাহিনীর তাণ্ডবলীলা

রাজপথে জনগণের শান্তিপূর্ণ কণ্ঠস্তব্ধ করতে রাষ্ট্রযন্ত্র তার সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকাসহ সারা দেশে মিছিল লক্ষ্য করে ছররা গুলি, তাজা বুলেট, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বর্ষণ করে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির একটি অংশ। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে বারুদ আর পোড়া চামড়ার গন্ধে।

রাজপথে সাধারণ মানুষের মিছিল দেখলেই লেলিয়ে দেওয়া হয় শাসকদলের সাঙ্গপাঙ্গদের। রামদা, পিস্তল আর লাঠিসোটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয় তারা।

রক্তক্ষয়ী এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালাতে অনীহা প্রকাশ করতে শুরু করে। জওয়ানদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে জনতার দাবির প্রতি নীরব সমর্থন, যা গণভবনের শাসককে তীব্র শঙ্কায় ফেলে দেয়।

হাসপাতাল ও আদালত প্রাঙ্গণের হাহাকার

৩ আগস্টের সংঘাতে আহত ও নিহতের খবরে দেশের হাসপাতালগুলোর বারান্দায় নেমে আসে এক বিভীষিকাময় স্তব্ধতা। ঢাকা মেডিকেল থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ছিল কাতরাতে থাকা গুলিবিদ্ধ তরুণদের দীর্ঘ সারি। স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

অন্যদিকে, গণগ্রেপ্তারের বিষাক্ত থাবায় প্রতিদিন শত শত নিষ্পাপ শিক্ষার্থীকে হাতকড়া পরিয়ে আনা হচ্ছিল আদালতে। প্রিজন ভ্যানের লোহার গাদাগাদি গরাদের ওপাশ থেকে সন্তানের কান্নার আওয়াজ আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের বুকফাটা আহাজারিতে ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ প্রতিদিন এক নরককুণ্ডে পরিণত হচ্ছিল।

সারাদেশে নিহত, আহত ও গ্রেফতার

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট (৩৪ জুলাই) যখন ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে, ততক্ষণে পুরো দেশ পরিণত হয়েছে এক রক্তস্নাত জনপদে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ফ্যাসিবাদের পতনমুখী আন্দোলনে ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট—এই অল্প কদিনে রাজপথে ঝরেছে শত শত তাজা প্রাণ।

তৎকালীন সরকার ও জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ২০০ পার হয়ে ২২০ জনের কোঠায় গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধান ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ৩ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৩১১ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

ছররা গুলি, রাবার বুলেট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভারী মারণাস্ত্রের তাজা বুলেটে আহত হয়ে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন ২০ হাজারের বেশি মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো গুলিবিদ্ধ ছাত্র-জনতার ভিড়ে উপচে পড়েছিল। পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় হাজার হাজার তরুণকে।

আন্দোলন দমাতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী ‘ব্লক রেইড’ এবং গণগ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করে। ৩ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ সারা দেশে কড়া দমন-পীড়নের মাধ্যমে ১৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

দেশের বিভিন্ন থানায় হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা আসামির নামে গায়েবি মামলা দায়ের করে ছাত্র, তরুণ ও বিরোধীদের ঢালাওভাবে হাতকড়া পরানো হতে থাকে। প্রতিদিন ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সারা দেশের আদালত প্রাঙ্গণে স্বজনদের বুকফাটা হাহাকার ও কান্নার রোল এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির রূপ নেয়।

উপসংহার

৩ আগস্ট (৩৪ জুলাই) কেবল ইতিহাসের পাতায় একটি তারিখের পরিসংখ্যান ছিল না; এটি ছিল মুক্তিকামী মানুষের শেকল ভাঙার ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। শহীদের রক্ত, আহতদের যন্ত্রণা, স্বজনহারাদের চোখের জল এবং ১৬ হাজারেরও বেশি বন্দির আত্মত্যাগ কোনো কিছুই শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শৃঙ্খলকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। শহীদ মিনারের সেই ঐতিহাসিক বেদিতে দাঁড়িয়ে লাখো জনতার এক কণ্ঠে দেওয়া ‘এক দফা’র বজ্রনির্ঘোষ গণভবনের অলিন্দে যে কম্পন সৃষ্টি করেছিল—তা ৪ ও ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মহাসমুদ্রে রূপ নেয়। স্বৈরাচারের বন্দুকের নল ও শেষ রক্তচক্ষুকে তুচ্ছ করে রাজপথের অদম্য ছাত্র-জনতাই সেদিন প্রমাণ করেছিল—রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিলেও স্বাধীনতার আকুতিকে কখনো বুলেটে স্তব্ধ করা যায় না। ৩ আগস্টের সেই রক্তস্নাত শপথের ওপর দাঁড়িয়েই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি

Tag :

জনতার পাশে সেনাবাহিনীর অবস্থান: শাসকগোষ্ঠীর শেষ হিংস্রতা

ফিরে দেখা ৩ আগস্ট ২০২৪

‘যেকোনো মূল্যে পিসে ফেলো’: শাসকের শেষ হিংস্রতা

আপডেট সময় ০৫:০০:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট—ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে যা ‘৩৪ জুলাই’ নামে এক মহাকাব্যিক রক্তাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। শ্রাবণের মেঘলা আকাশ আর বারুদগন্ধী থমথমে বাতাসের বুকে সেদিন থরথর করে কাঁপছিল এক পরাক্রমশালী স্বৈরাচারের শক্ত ভিত। অগণিত শহীদের রক্তে ভেজা রাজপথ থেকে সেদিন আর কোনো ছোটখাটো সংস্কার কিংবা আপসের ধ্বনি ওঠেনি, ওঠেনি শাসকের ছুড়ে দেওয়া আলোচনার বিষাক্ত টোপে পা দেওয়ার আকুতিও। হাজারো টিয়ার শেল, তাজা বুলেট, ডিবি কার্যালয়ের ভয়াল নির্যাতন আর গণগ্রেপ্তারের ফাঁদ উপহাস করে কোটি জনতা এক মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো জনতার সমুদ্র থেকে একসূত্রে উচ্চারিত হয়েছিল একটিমাত্র চূড়ান্ত ফয়সালা—শেখ হাসিনা সরকারের নিঃশর্ত পদত্যাগ। গণভবনের অবরুদ্ধ ঘরে বসে শাসকের শেষ হুমকি, আমলাদের বাঁচবার মরিয়া চক্রান্ত, পুলিশ-র্যাবের নির্মম বুলেটের তাণ্ডব এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্বজনহারাদের বুকফাটা আহাজারিকে ছাপিয়ে সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশ। কিন্তু কীভাবে শহীদ মিনারের সেই ‘এক দফা’র বজ্রনির্ঘোষ কেঁপে তুলেছিল গণভবনের সিংহাসন? কীভাবে রাজপথের অদম্য রক্তস্নাত ছাত্র-জনতা স্তব্ধ করে দিয়েছিল স্বৈরাচারের শেষ প্রতিরোধ? চলুন ফিরে দেখি সেই রুদ্ধশ্বাস, রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক ৩ আগস্টের পুরো ঘটনাপ্রবাহ…

‘এক দফা’ ও দ্রোহের দাবানল

৩ আগস্টের সূর্য ওঠার পর থেকেই ঢাকার অলিগলি, ক্যাম্পাস আর রাজপথ বেয়ে অগণিত প্রাণ ছুটে চলেছিল একই মোহনায়—কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

ঐতিহাসিক জনসমুদ্র: ভয়, বুলেট, টিয়ার শেল আর গ্রেপ্তারের ফাঁদ তুচ্ছ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষের সুদৃঢ় পদভারে কেঁপে ওঠে চারপাশ। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয় এক মহাসমুদ্রে।

এক দফা দাবি ঘোষণা: রক্তস্নাত শহীদ বেদিতে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা উচ্চারণ করেন কোটি জনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা: “শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগের এক দফা দাবি।”

সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক: গণভবনের আলোচনার বিষাক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের পক্ষ থেকে পরদিন ৪ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’-এর ডাক দেওয়া হয়।

গণভবনে ষড়যন্ত্র ও শেখ হাসিনার ধমকি

বাইরে যখন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে কোটি কণ্ঠের গর্জন, গণভবনের বন্ধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে তখন চলছিল ক্ষমতা আকড়ে রাখার অন্ধ নীলকণশা।

পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার যে টোপ ফেলেছিলেন, ছাত্র-জনতা ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে।

আলোচনা ভেস্তে যেতেই ফ্যাসিস্ট মেজাজে ফিরে আসে স্বৈরাচারী শাসক। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রশাসন ও বাহিনীর প্রধানদের প্রতি নির্দেশ যায়—যেকোনো মূল্যে, যেকোনো মূল্যে এই আন্দোলন পিষে ফেলতে হবে।

সরকারের অনুগত শীর্ষ আমলারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন কীভাবে ভুয়া ন্যারেটিভ তৈরি করে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চাপ সামলানো যায়।

আওয়ামী গুন্ডামি ও বাহিনীর তাণ্ডবলীলা

রাজপথে জনগণের শান্তিপূর্ণ কণ্ঠস্তব্ধ করতে রাষ্ট্রযন্ত্র তার সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকাসহ সারা দেশে মিছিল লক্ষ্য করে ছররা গুলি, তাজা বুলেট, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বর্ষণ করে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির একটি অংশ। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে বারুদ আর পোড়া চামড়ার গন্ধে।

রাজপথে সাধারণ মানুষের মিছিল দেখলেই লেলিয়ে দেওয়া হয় শাসকদলের সাঙ্গপাঙ্গদের। রামদা, পিস্তল আর লাঠিসোটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয় তারা।

রক্তক্ষয়ী এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালাতে অনীহা প্রকাশ করতে শুরু করে। জওয়ানদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে জনতার দাবির প্রতি নীরব সমর্থন, যা গণভবনের শাসককে তীব্র শঙ্কায় ফেলে দেয়।

হাসপাতাল ও আদালত প্রাঙ্গণের হাহাকার

৩ আগস্টের সংঘাতে আহত ও নিহতের খবরে দেশের হাসপাতালগুলোর বারান্দায় নেমে আসে এক বিভীষিকাময় স্তব্ধতা। ঢাকা মেডিকেল থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ছিল কাতরাতে থাকা গুলিবিদ্ধ তরুণদের দীর্ঘ সারি। স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

অন্যদিকে, গণগ্রেপ্তারের বিষাক্ত থাবায় প্রতিদিন শত শত নিষ্পাপ শিক্ষার্থীকে হাতকড়া পরিয়ে আনা হচ্ছিল আদালতে। প্রিজন ভ্যানের লোহার গাদাগাদি গরাদের ওপাশ থেকে সন্তানের কান্নার আওয়াজ আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের বুকফাটা আহাজারিতে ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ প্রতিদিন এক নরককুণ্ডে পরিণত হচ্ছিল।

সারাদেশে নিহত, আহত ও গ্রেফতার

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট (৩৪ জুলাই) যখন ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে, ততক্ষণে পুরো দেশ পরিণত হয়েছে এক রক্তস্নাত জনপদে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ফ্যাসিবাদের পতনমুখী আন্দোলনে ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট—এই অল্প কদিনে রাজপথে ঝরেছে শত শত তাজা প্রাণ।

তৎকালীন সরকার ও জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ২০০ পার হয়ে ২২০ জনের কোঠায় গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধান ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ৩ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৩১১ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

ছররা গুলি, রাবার বুলেট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভারী মারণাস্ত্রের তাজা বুলেটে আহত হয়ে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন ২০ হাজারের বেশি মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো গুলিবিদ্ধ ছাত্র-জনতার ভিড়ে উপচে পড়েছিল। পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় হাজার হাজার তরুণকে।

আন্দোলন দমাতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী ‘ব্লক রেইড’ এবং গণগ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করে। ৩ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ সারা দেশে কড়া দমন-পীড়নের মাধ্যমে ১৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

দেশের বিভিন্ন থানায় হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা আসামির নামে গায়েবি মামলা দায়ের করে ছাত্র, তরুণ ও বিরোধীদের ঢালাওভাবে হাতকড়া পরানো হতে থাকে। প্রতিদিন ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সারা দেশের আদালত প্রাঙ্গণে স্বজনদের বুকফাটা হাহাকার ও কান্নার রোল এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির রূপ নেয়।

উপসংহার

৩ আগস্ট (৩৪ জুলাই) কেবল ইতিহাসের পাতায় একটি তারিখের পরিসংখ্যান ছিল না; এটি ছিল মুক্তিকামী মানুষের শেকল ভাঙার ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। শহীদের রক্ত, আহতদের যন্ত্রণা, স্বজনহারাদের চোখের জল এবং ১৬ হাজারেরও বেশি বন্দির আত্মত্যাগ কোনো কিছুই শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শৃঙ্খলকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। শহীদ মিনারের সেই ঐতিহাসিক বেদিতে দাঁড়িয়ে লাখো জনতার এক কণ্ঠে দেওয়া ‘এক দফা’র বজ্রনির্ঘোষ গণভবনের অলিন্দে যে কম্পন সৃষ্টি করেছিল—তা ৪ ও ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মহাসমুদ্রে রূপ নেয়। স্বৈরাচারের বন্দুকের নল ও শেষ রক্তচক্ষুকে তুচ্ছ করে রাজপথের অদম্য ছাত্র-জনতাই সেদিন প্রমাণ করেছিল—রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিলেও স্বাধীনতার আকুতিকে কখনো বুলেটে স্তব্ধ করা যায় না। ৩ আগস্টের সেই রক্তস্নাত শপথের ওপর দাঁড়িয়েই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ।

বাংলা৭১নিউজ/এসএইচবি