বিশ্বকাপে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর আগমন ছিল পুরো নাটকীয়তায়, বর্ণিল এবং এমন কিছু কাহিনী যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। বিশ্বকাপের এই যাত্রার পদে পদে ছিল হয়রানি, রোমাঞ্চ।
বিশ্বকাপের শুরুতেই, কঙ্গোর ফুটবলাররা বিমান থেকে এমন অদ্ভুত পোশাকে নেমেছিল যা সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে শোরগোল ফেলে দেয়। চিতাবাঘের-প্রিন্টের কারুকাজ করা ঝকঝকে স্যুট, যা ছিল তাদের ডাকনাম ‘দ্য লেপার্ডস’-এর প্রতি এক সাহসী ইঙ্গিত। নিজ দেশের এই ডাকনামকে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল এবং ঠিক এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
কিন্তু আসল বিস্ময় আসে তাদের এই সফরকে ঘিরে থাকা কঠোর স্বাস্থ্যবিধি থেকে। ডিআর কঙ্গো এবং উগান্ডার কিছু অংশে ‘ইবোলা’ বিশেষ করে ‘বুন্দিবুগিও স্ট্রেইন’ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে, সম্প্রতি কঙ্গোতে থাকা প্রত্যেক খেলোয়াড় বা স্টাফ সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার আগে ২১ দিনের কোয়ারেন্টাইন সম্পন্ন করতে হয়েছিল। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র ২২ দিন আগে এই প্রাদুর্ভাবটি সনাক্ত হয় এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এর মধ্যেই ১৩৫ জনের মৃত্যু ও ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে।
এই প্রাদুর্ভাবের কারণে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এবং ফিফাকে অবিলম্বে সতর্ক করা হয়েছিল এবং সংক্রমণের ঝুঁকি রোধ করতে মার্কিন সরকার কঠোর প্রবেশবিধি আরোপ করে। যদিও ডিআর কঙ্গোর বেশিরভাগ খেলোয়াড় ইউরোপে থাকেন, তাই কয়েকজন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। ফলে, ডিফেন্ডার বুশিরিকে দল থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল এবং তার পরিবর্তে চিবোলাকে নেওয়া হয়।
ফেডারেশনের বেশ কয়েকজন কর্মচারী এবং কর্মীকেও বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য কঙ্গোলীয় ফেডারেশন কিনশাসায় পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের প্রথম পর্ব বাতিল করে দেয়। যার মধ্যে ভক্তদের সাথে একটি আবেগঘন বিদায় অনুষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পুরো ক্যাম্পটি বেলজিয়ামে সরিয়ে নেয়। তারা স্পেনের কাদিজে চিলির বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচও বাতিল করে দেয়।
তাদের জন্য আরেকটি বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো কিংবদন্তি সমর্থককে তারা বিশ্বকাপে পাচ্ছে না। তিনি হলেন সবচেয়ে আইকনিক সমর্থক মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা যিনি ‘লুমুম্বা’ নামে পরিচিত। তিনি ম্যাচ চলাকালীন পুরো সময়ে মূর্তির মতো সম্পূর্ণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকার জন্য বিখ্যাত। কোয়ারেন্টাইন নিয়মের কারণে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি।
ডিআর কঙ্গোর জন্য এই বিশ্বকাপটি ঐতিহাসিক। ১৯৭৪ সালের পর এটিই তাদের প্রথম অংশগ্রহণ যেখানে তারা ‘জায়ার’ নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। টুর্নামেন্টে তাদের পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। অবশেষে, ৪ দিন আগে তারা প্যারিস থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণ করেই তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই সতর্কবাণী দেওয়া হয়, ‘যারা সম্পূর্ণ কোয়ারেন্টাইন শেষ করবে না, তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’ সৌভাগ্যবশত, প্রতিনিধিদলের প্রত্যেক সদস্যই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেন এবং একটি জমকালো অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের পর দলটি তাদের হোটেলে প্রবেশ করে।
তারা এখন পর্তুগালের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম হট ফেবারিট ধরা হচ্ছে পর্তুগালকে, যাদের দলে প্রায় অনেকেই বিশ্বমানের ফুটবলার।
কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাবে মুহূর্তটির সারসংক্ষেপ করেছেন: ‘অনেক দিন পর মানুষ এই দলটিকে বিশ্বকাপে দেখল। যোগ্যতা অর্জন করাটা সম্মানের। এখন ভালো খেলার দায়িত্ব আমাদের।’
বিশ্বকাপের স্থান নিশ্চিত করা সর্বশেষ দল ছিল কঙ্গো। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতার কথা বিবেচনা করলে, বিশ্বমঞ্চে তাদের উপস্থিতি কেবল একটি ফুয়বল দল নয়। এটি জাতির জন্য এক বিরল সুসংবাদ, যা বর্তমানে তাদের জন্য খুব প্রয়োজন।
বাংলা৭১নিউজ/এসএএইচ