ঢাকা ০২:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি নিয়ে বিতর্ক, সাইনবোর্ড ভাঙলেন এনসিপি নেতারা

কুমিল্লায় ভাষাসৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবন সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দাবিতে বাড়িটির সামনে জমির মালিকানা দাবি করে স্থাপন করা একটি সাইনবোর্ড ভেঙে দিয়েছেন দলটির মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা।

শুক্রবার (৭ নভেম্বর) রাতে এ ঘটনা ঘটে। এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সাইনবোর্ড ভাঙার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত। তিনি এটিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরের ধর্মসাগরপাড়ে অবস্থিত বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন মহল থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরই মধ্যে সম্প্রতি বাড়িটির সামনে সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড স্থাপন করেন আরমা দত্ত।

সাইনবোর্ডে নিজেকে ওয়ারিশ সূত্রে জমিটির প্রকৃত মালিক উল্লেখ করেন তিনি। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’

এনসিপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এর পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের দাবি, স্থাপনাটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ ঠেকানোর অংশ হিসেবেই সাইনবোর্ডটি অপসারণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়িটির সামনে জড়ো হন। সেখানে তারা স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে মালিকানা দাবির সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন।

এ ঘটনার পর রাতে এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সাধারণ কোনো স্থাপনা নয়; ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। তাই এটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করার কথাও জানায় দলটি।

রাত ১০টার দিকে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার সমকালকে বলেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাবো। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।

অন্যদিকে আরমা দত্ত বলেন, এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করবো, রাখবো না বিক্রি করবো, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করবো।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, সাইনবোর্ড ভাঙার বিষয়ে এখনো কেউ তাকে অবহিত করেননি। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। তার নাতনি আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

এআই খাতের স্বর্ণযুগ কি শেষ?

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি নিয়ে বিতর্ক, সাইনবোর্ড ভাঙলেন এনসিপি নেতারা

আপডেট সময় ১০:৩০:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

কুমিল্লায় ভাষাসৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবন সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দাবিতে বাড়িটির সামনে জমির মালিকানা দাবি করে স্থাপন করা একটি সাইনবোর্ড ভেঙে দিয়েছেন দলটির মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা।

শুক্রবার (৭ নভেম্বর) রাতে এ ঘটনা ঘটে। এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

সাইনবোর্ড ভাঙার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত। তিনি এটিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা নগরের ধর্মসাগরপাড়ে অবস্থিত বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন মহল থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরই মধ্যে সম্প্রতি বাড়িটির সামনে সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড স্থাপন করেন আরমা দত্ত।

সাইনবোর্ডে নিজেকে ওয়ারিশ সূত্রে জমিটির প্রকৃত মালিক উল্লেখ করেন তিনি। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’

এনসিপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এর পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের দাবি, স্থাপনাটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ ঠেকানোর অংশ হিসেবেই সাইনবোর্ডটি অপসারণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়িটির সামনে জড়ো হন। সেখানে তারা স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে মালিকানা দাবির সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন।

এ ঘটনার পর রাতে এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সাধারণ কোনো স্থাপনা নয়; ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। তাই এটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করার কথাও জানায় দলটি।

রাত ১০টার দিকে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার সমকালকে বলেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাবো। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।

অন্যদিকে আরমা দত্ত বলেন, এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করবো, রাখবো না বিক্রি করবো, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করবো।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, সাইনবোর্ড ভাঙার বিষয়ে এখনো কেউ তাকে অবহিত করেননি। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। তার নাতনি আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।

বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ