আজ ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু দিন রয়েছে, যা নিছক একটি তারিখ নয়, বরং এক একটি মাইলফলক।
এসব দিন আমাদের জাতীয় গতিপথকে প্রভাবিত করেছে। ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জাতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এর মধ্যেই ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় একটি পাল্টা অভ্যুত্থান, যার নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ।
তার ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা বা ‘চেইন অব কমান্ড’ ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এই অভ্যুত্থান দেশকে আরো গভীর সংকটে নিমজ্জিত করে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। এই সরকারবিহীন অবস্থায় জনমনে চরম দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও শঙ্কা দানা বাঁধে।
এরকম একটি প্রেক্ষাপটে জাতির ত্রাতা হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিরা অভ্যুত্থান ঘটান। তাঁদের প্রথম কাজটি ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা, যাঁকে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর বন্দি করা হয়েছিল।
এরপর সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। তাঁদের স্লোগানে প্রকম্পিত হয় ঢাকার রাজপথ-‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিন্দাবাদ’।
হাজার হাজার সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসে সিপাহিদের অভিনন্দিত করে, ট্যাংকের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। পুরো জাতি যেন এক বিশাল বিপদ থেকে মুক্তির আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি, জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে রক্ষা করেছিলেন। তিনি সেনাপ্রধানের পদে পুনর্বহাল হন এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকলেও ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছিল যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহাকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা গেলেও অনন্তকালের জন্য দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে এটি ছিল একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য জনগণের আকুতির এক বলিষ্ঠ প্রকাশ। সার্বিকভাবে ৭ নভেম্বর ছিল আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষার এক সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনা যদি না ঘটত, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ ভিন্ন হতে পারত। ৭ নভেম্বরের আরেকটি বড় অবদান হলো, এটি তৎকালীন রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করেছিল। ৭ নভেম্বরের পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হ
য়, রাজনৈতিক দলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয় এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হয়। এভাবেই ৭ নভেম্বর রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে দেশে রাজনীতির নবযাত্রা শুরু করে।
এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। একজন সামরিক শাসক হয়েও তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন, নির্বাচন দিয়েছেন এবং জনগণের ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়েছেন। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে তিনি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন। তাঁর দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি এবং পোশাক শিল্পের গোড়াপত্তন। তাঁর গৃহীত নীতির ফলেই আজ বাংলাদেশ রেমিট্যান্স ও পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। এ ছাড়া ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ এবং কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
৭ নভেম্বর তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবের দিন। আর এই গৌরবের নায়ক জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের নব জাগরণের অগ্রদূত তিনি। সংকটে জাতির পথপ্রদর্শক।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেমন দেশের সংকটে হাল ধরেছিলেন, পথহারা বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন পথের দিশা। ঠিক তেমনি বেগম খালেদা জিয়াও বিপর্যস্ত দেশকে রক্ষার জন্য আপসহীন নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, বেগম খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেত না।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বিচারপতি সাত্তারকে অপসারণ করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে যে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এরশাদ সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে সেই গণতন্ত্র ধ্বংস করেন। তিনি মানুষের অধিকার হরণ করেন। দুর্নীতি আর নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। এই অবস্থায় জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে সামনে এগিয়ে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। তিনি ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। দলে দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাতদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত এবং এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কয়েকবার আটক করে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার। সে সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদ সরকারের হাতে বেশ
কশেকজন শহীদ হন। আন্দোলন দিনে দিনে বেগবান হতে শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দূরদর্শিতায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ৩২১টির মধ্যে ২৭০টি ছাত্র সংসদে বিজয় লাভ করে, যা গণআন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্র প্রশ্নে লড়াই-সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন। বেগম জিয়ার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন।
২০০৭ এ সেনা সমর্থিত এক-এগারো সরকারের মাধ্যমে আবার জনগণের অধিকার হরণ করা হয়। একটি ষড়যন্ত্রের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি ও লুটপাট। তারা দেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে। আইনের শাসন ও মানবাধিকারকে নির্বাসনে পাঠায়। গুম খুনের মাধ্যমে বিরোধী মতকে দমন করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তারেক রহমান। পিতা ও মায়ের মতোই তারেক রহমানও এদেশের মানুষের মুক্তির জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ ১৭ বছর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফ?্যাসিবাদ মুক্ত হয়। ২৪ এর আন্দোলন একদিনে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ লড়াই এবং সংগ্রামের মাধ্যমে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট জুড়ে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন তারেক রহমান।তিনি ছাত্র-জনতাকে অধিকার আদায়ের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছেন। আওয়ামী সরকারের দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়ানো যুবসমাজকে ভিডিও মেসেজ দিয়ে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর প্রত্যয়দীপ্ত বক্তব্য প্রচারিত হওয়ায় স্বৈরাচারের স্বরূপ উদ্ঘাটনের ইতিহাস বুনন মুগ্ধ করেছে ছাত্র-জনতাকে। ফলে অতিদ্রুত ঐক্য
বদ্ধ হয়েছে দেশের সমগ্র মানুষ। কেবল দেশ নয়, বিদেশের মাটিতে গণ অভ্যুত্থানের বীর সেনানিদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দূরকে নিকট করেছে, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো পৃথিবীকে নাড়িয়ে বিজয় এনে দিয়েছে বিপ্লবের স্বপ্নসারথিদের। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৫০টিরও বেশি মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। তাঁর নির্বাসিত জীবনে বাকস্বাধীনতা হরণের পাশাপাশি অবৈধভাবে চাকরিচ্যুত করা হয় তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমানকেও। একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ার পরও ড. জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় পাতানো সাজা ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক জীবন যে চ্যালেঞ্জের হয়, তারেক রহমান তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।
এজন্য কখনো নিজে হতাশ হননি। বরং দুঃসময়ে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে উঠেছেন দলের জন্য। ২০১১ সালে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বাতিল হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে এসেছেন তারেক রহমান। জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে সুদূর লন্ডনে নির্বাসিত থেকেও প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি সংকটের মুক্তির পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে জিয়া পরিবার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে এদেশের জনগণ যখন দিশাহারা ঠিক তখনই স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন শহীদ জিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ তাঁর এই ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়, সাহসী হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় এবং রক্ষায় জিয়া পরিবার কাজ করছে অতন্দ্র প্রহরীর মতো। যখনই দেশ বিপর্যস্ত হয়, যখনই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে তখনই জিয়া পরিবার এগিয়ে আসে। তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ান। দেশের জন্য সবকিছু উজাড় করে দেন। তাই আজ ঐতিহাসিক সাত নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবসে আমরা যেমন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করব শ্রদ্ধাভরে। ঠিক তেমনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জিয়া পরিবারের অবদানকেও স্মরণ করব। জিয়া পরিবার বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার সজাগ, চির জাগরূক। বাংলাদেশের অস্তিত্ব যখনই সংকটে তখনই জিয়া পরিবার জনগণের পাশে।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ

























