গত ১৬ বছরের বেশি সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সাড়ে চার হাজারের বেশি সহযোদ্ধাকে ক্রসফায়ারে এবং সাত শতাধিক সহযোদ্ধাকে গুমের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা এ দেশের সমস্ত খুনের বিচার করতে চাই।
জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, বাংলাদেশের মাটিতে সব অন্যায়-অবিচারের বিচার করতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা বদ্ধপরিকর।’
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা আইনজীবী সমিতি আয়োজিত নবীন আইনজীবীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, যে রক্তাক্ত পথ ধরে তারা এসেছেন, সেই পথ ছিল অনেক পিচ্ছিল।
গত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তারা বহু সহযোদ্ধাকে হারিয়েছেন। তাদের স্বজনেরা এখনো নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে কাঁদেন, কখন তাদের স্বজনেরা ফিরে আসবেন, সেই অপেক্ষায় থাকেন।
তিনি বলেন, ৬০ লাখের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা করা হয়েছিল। তাদের অনেকেই মামলার ঘটনার ২০ বছর আগেই মারা গেছেন।
এসব অন্যায়-অবিচারের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার।
আইনজীবীদের উদ্দেশে আসাদুজ্জামান বলেন, একটি সোনার বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি তৈরি করে যেতে চান তারা। এমন একটি পথ তৈরি করতে চান, যে পথে বাংলাদেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এ যাত্রায় আইনজীবীদেরও পাশে চান তারা।
আইনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি কোম্পানিতে হিসাব নিরীক্ষার জন্য বাধ্যতামূলক অডিটর থাকেন।
একইভাবে প্রতিটি কোম্পানিতে একজন করে আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ জন্য কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, আইনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি তাদের নিজেদের জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য দেশের ৮০ হাজার আইনজীবীর প্রশিক্ষণে চলতি বছর ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, ছোট বারান্দার আইনজীবী হওয়ার চেষ্টা করা যাবে না, সব সময় বড় বারান্দার আইনজীবী হতে হবে। ছোট বারান্দা বলতে তিনি বিচারকদের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেনের প্রবণতাকে বুঝিয়েছেন। বিচারকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেনে না জড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার আইনজীবীদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সব অন্ধগলি বন্ধ করতে চায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা গঠন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
নবীন আইনজীবীদের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তারা আইনজীবী হয়েছেন। তাদের উত্তীর্ণ হওয়ার পেছনে কোনো তদবির কাজ করেনি। নিজেদের পরিশ্রম ও যোগ্যতায় তারা এ পর্যায়ে এসেছেন। আগামী প্রজন্মের জন্য তারা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
দেশে আইনজীবীর সংখ্যা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা আইনজীবী সমিতিতেই আছেন প্রায় ৩৫ হাজার। ২০ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে আইন পেশার মর্যাদা ও অবস্থান আরো উন্নত করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনজীবী হওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। বিসিএস পরীক্ষার চেয়েও কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনেকে আইনজীবী হচ্ছেন। অথচ সামাজিকভাবে, বিশেষ করে বিয়ের ক্ষেত্রে আইনজীবীরা সেনা কর্মকর্তা, বিসিএস কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকেন। এই অবস্থার পরিবর্তন চান তারা।
আদালত অঙ্গনে দলীয় প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, এখনো কিছু আইনজীবী আদালতে গিয়ে দলীয় আধিপত্য ও ক্ষমতার দম্ভ দেখান। তারা চান, এই পরিস্থিতির অবসান হোক। প্রত্যেক আইনজীবী যেন আদালতে গিয়ে ক্ষমতার নয়, আইনের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে আইনজীবীরা আইনজীবী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানালে আইনমন্ত্রী বলেন, আইনজীবীদের সুরক্ষা আইন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর আগে বার কাউন্সিলের আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালগুলো আরো গতিশীল করতে হবে। কয়েকজন আইনজীবীর অসদাচরণের কারণে পুরো আইনজীবী সমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এ বিষয়ে আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, ঢাকার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. শাহজাহান কবির, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন, ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমান, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. ইকবাল হোসেন, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মো. ওমর ফারুক ফারুকী এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কালাম খান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমিতির সিনিয়র সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইলতুৎমিশ সওদাগর (এ্যানী)। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন অফিস সেক্রেটারি মো. আবজাল হোসাইন মৃধা।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ























