কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ কিংবা ধুপধাপ শব্দ—বিষয়টি অনেকের কাছেই হয়তো সামান্য অস্বস্তির বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই শব্দ যদি হৃৎস্পন্দন সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করে, তাহলে সেটিকে নিছক কানের সমস্যা হিসেবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কারণ কখনো কখনো কানের এই শব্দের নেপথ্যে থাকতে পারে মস্তিষ্কের রক্তনালির গুরুতর সমস্যা।
গাইবান্ধার রবিউল ইসলামের ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে হৃৎস্পন্দন সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানে শোঁ শোঁ শব্দ শুনছিলেন তিনি। চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় হয়েছে কয়েক লাখ টাকা।
তবু সমস্যার সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত জানা গেল, সমস্যাটি কানে নয়—মস্তিষ্কের রক্তনালির একটি অংশ ভেনাস সাইনাসে সংকোচন বা ব্লক রয়েছে। ক্যাথেটারের মাধ্যমে সেখানে স্টেন্ট বসিয়ে সংকুচিত অংশ খুলে দেওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় তার কানের শব্দ।
ঘটনাটি শুধু একজন রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বার্তাও রয়েছে।
নিউরোইন্টারভেনশনের মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির ব্যবহার দেশে বাড়ছে। বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই ক্যাথেটারের মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে রোগীর কষ্ট কমছে, সুস্থ হওয়ার সময়ও কমছে। একই সঙ্গে দেশে জটিল স্নায়ু ও রক্তনালিজনিত রোগের আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো রোগ নির্ণয়।
পালসেটাইল টিনিটাসের অনেক কারণ কানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সব ক্ষেত্রে যে সমস্যার উৎস কান—তা নয়। মস্তিষ্কের রক্তনালির অস্বাভাবিকতা থেকেও এ ধরনের শব্দ হতে পারে। অথচ এই সম্ভাবনা সম্পর্কে রোগী তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মধ্যেও যথেষ্ট সচেতনতা না থাকায় রোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এক চিকিৎসকের কাছ থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে ঘুরতে থাকেন।
ফলে হৃৎস্পন্দন সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কানে নিয়মিত শব্দ শোনা গেলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে শব্দটি যদি নাড়ির স্পন্দনের সঙ্গে ওঠানামা করে, তাহলে রক্তনালিজনিত কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যার উৎস শনাক্ত করতে হবে। রোগীকে শুধু উপসর্গ কমানোর চিকিৎসা দিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যাবে না।
এখানে চিকিৎসকদের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কান, নাক ও গলা বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং নিউরোইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় থাকলে এ ধরনের জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যেও এ বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকা দরকার, যাতে প্রয়োজন হলে রোগীকে দ্রুত উপযুক্ত কেন্দ্রে পাঠানো যায়।
রবিউলের চিকিৎসায় সাফল্য তাই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একজন রোগীর চিকিৎসা সফল হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এই সাফল্যকে বৃহত্তর চিকিৎসাসেবায় ছড়িয়ে দিতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসার বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছেও যেন এ ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে, সেই উদ্যোগ নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শরীরের কোনো অস্বাভাবিক সংকেতকে অবহেলা না করা। কানে শোনা একটি শব্দও কখনো কখনো শরীরের ভেতরের বড় সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। রবিউলের ক্ষেত্রে কানের শব্দ শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কের রক্তনালির সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছিল। আধুনিক চিকিৎসা সেই সংকেতের ভাষা বুঝেছে, ব্লক খুলেছে এবং তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি অবশ্যই স্বস্তির। এখন প্রয়োজন, এমন সাফল্য যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না থাকে। দেশে আধুনিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ুক, চিকিৎসকদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ুক এবং রোগীরা যেন বছরের পর বছর অজানা সমস্যার বোঝা নিয়ে ঘুরে না বেড়ান—এটাই প্রত্যাশা।
বাংলা৭১নিউজ/আরএইচ




























